সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পূর্ণা রায় ভৌমিক, লড়ছেন জাতীয় পর্যায়ে

প্রকাশিত: ৩:৫২ অপরাহ্ণ, জুন ১৪, ২০২৬

সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক পূর্ণা রায় ভৌমিক, লড়ছেন জাতীয় পর্যায়ে

Manual6 Ad Code
  • তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে অনন্য অবদান

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ১৪ জুন ২০২৬ : জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬ এর আওতায় সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন মৌলভীবাজারের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ পূর্ণা রায় ভৌমিক।

Manual6 Ad Code

দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষার্থীবান্ধব শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তোলা, উদ্ভাবনী শিক্ষাকর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং দক্ষ নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এ সম্মাননা অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করছেন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এ অর্জনকে মৌলভীবাজার তথা সিলেট বিভাগের জন্য গৌরবজনক হিসেবে দেখা হচ্ছে। শিক্ষা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, একজন শিক্ষক হিসেবে তাঁর নিষ্ঠা, কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীল উদ্যোগ বহু বছর ধরে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব রেখে চলেছে।

বর্তমানে পূর্ণা রায় ভৌমিক মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দান ক্লাস্টারের আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর নেতৃত্বে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণমূলক শিক্ষা কার্যক্রম, সহশিক্ষা কার্যক্রমের বিস্তার, পাঠদানের আধুনিক পদ্ধতি এবং বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

দীর্ঘ ৩৩ বছরের বর্ণাঢ্য শিক্ষকতা জীবন

পূর্ণা রায় ভৌমিক ২২ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করেন। তাঁর প্রথম কর্মস্থল ছিল ত্রৈলোক্যবিজয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পরবর্তীতে তিনি নওয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

৩১ জানুয়ারি ২০০২ সালে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পেয়ে টিলাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি টানা ১৬ বছর কর্মরত থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনেন। ২০১৮ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে তিনি আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শিক্ষাজীবনে তিনি এমএসএস, সি-ইন-এড এবং বি.এড ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রায় ৩৩ বছরের শিক্ষকতা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি প্রায় ২৫ বছর ধরে ইংরেজি বিষয়ের প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন।

ইংরেজি শিক্ষায় দক্ষ প্রশিক্ষক

শুধু বিদ্যালয় পরিচালনাই নয়, শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন পূর্ণা রায় ভৌমিক। তিনি ছয় বছর ধরে ইংলিশ ইন অ্যাকশন কর্মসূচির হেড টিচার ফ্যাসিলিটেটর (HTF) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০২২ সালে তিনি ট্রেনিং অব মাস্টার ট্রেইনার ইন ইংলিশ (TMTE) সম্পন্ন করেন। এর মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষার আধুনিক ও কার্যকর পদ্ধতি শিক্ষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন।

শিক্ষাক্ষেত্রে পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের লক্ষ্যে তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগন পরিচালিত “Fostering Students’ Motivation and Engagement” শীর্ষক ৬৪ ঘণ্টার অনলাইন প্রশিক্ষণ সফলভাবে সম্পন্ন করেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক শিক্ষা প্ল্যাটফর্ম OPEN (Online Professional English Network)-এর কমিউনিটি অব প্র্যাকটিস কার্যক্রমে নেতৃত্ব প্রদানের স্বীকৃতিও অর্জন করেছেন।

উদ্ভাবনী শিক্ষা কার্যক্রমে বিশেষ অবদান

শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের পাঠাভ্যাস উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা কার্যক্রম, শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন এবং বিদ্যালয়কে একটি কার্যকর শিক্ষাকেন্দ্রে রূপান্তরের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে।

তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে সৃজনশীলতা বিকাশ, মূল্যবোধ শিক্ষা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং আনন্দঘন শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেছেন। বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছে।

Manual7 Ad Code

দ্বিতীয়বারের মতো বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ

এটি প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালেও সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন পূর্ণা রায় ভৌমিক। ধারাবাহিকভাবে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য ও নেতৃত্বের কারণে আবারও একই সম্মান অর্জন করলেন তিনি।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বিভাগীয় পর্যায়ে দ্বিতীয়বারের মতো শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়া তাঁর দীর্ঘদিনের নিরলস পরিশ্রম, সততা ও পেশাগত দক্ষতারই স্বীকৃতি।

সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও সমান সক্রিয়

শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত রয়েছেন পূর্ণা রায় ভৌমিক। কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, রম্যরচনা ও সম্পাদনা কার্যক্রমে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে।

তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘প্রৈতি’ ২০১৬ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এছাড়া গান, অভিনয়, চিত্রাঙ্কন ও কারুকলার প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমন্বিত চর্চা তাঁকে একজন বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে।

পরিবার থেকে পেয়েছেন অনুপ্রেরণা

Manual5 Ad Code

ব্যক্তিগত জীবনে পূর্ণা রায় ভৌমিক এক ছেলে ও এক মেয়ের জননী। তাঁর স্বামী রানু কুমার তালুকদার একজন কলেজ শিক্ষক।

পূর্ণা রায় ভৌমিক জানান, দীর্ঘ কর্মজীবনে পরিবারের সহযোগিতা বিশেষ করে তাঁর স্বামীর উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তাঁকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।

‘শিশুদের নিয়ে কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ’

বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় পূর্ণা রায় ভৌমিক বলেন, “শিশুদের নিয়ে কাজ করাই আমার সবচেয়ে বড় আনন্দ। একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের বিকাশ, তাদের স্বপ্নপূরণ এবং সুন্দর মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা দেখতে পারাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যতদিন বেঁচে থাকব, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করে যেতে চাই। এই সম্মাননা আমাকে আরও দায়িত্বশীলভাবে কাজ করার অনুপ্রেরণা দেবে।”

তিনি জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায়ও সাফল্যের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সংশ্লিষ্ট সবার দোয়া, আশীর্বাদ ও সহযোগিতা কামনা করেন।

শিক্ষা অঙ্গনের গর্ব

Manual1 Ad Code

মৌলভীবাজার ও সিলেট অঞ্চলের শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, পূর্ণা রায় ভৌমিকের এই অর্জন শুধু ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, বরং সমগ্র অঞ্চলের শিক্ষা অঙ্গনের জন্য একটি অনুপ্রেরণামূলক ঘটনা। তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, পেশাগত দক্ষতা, মানবিক নেতৃত্ব এবং শিক্ষার প্রতি গভীর অঙ্গীকার আগামী প্রজন্মের শিক্ষকদের জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচনের প্রতিযোগিতায় তাঁর অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। সবার প্রত্যাশা, বিভাগীয় পর্যায়ের এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় জাতীয় পর্যায়েও তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখবেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ