বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেতনায় শ্রীমঙ্গলে ১৭১তম সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালিত

প্রকাশিত: ৬:২০ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০২৬

বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের চেতনায় শ্রীমঙ্গলে ১৭১তম সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস পালিত

Manual6 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ৩০ জুন ২০২৬ : ‘হুল হুল হুলে হুল, ত্রিশে জুন হুলে হুল’—এই ঐতিহাসিক স্লোগানে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে ১৭১তম মহান সাঁওতাল বিদ্রোহ (হুল দিবস)।

মঙ্গলবার (৩০ জুন ২০২৬) দিবসটি উপলক্ষে শহরের শ্রীমঙ্গল অডিটরিয়াম কাম মাল্টিপারপাস হলে আলোচনা সভা, শোভাযাত্রা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে মৌলভীবাজার জেলা সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদ।

Manual3 Ad Code

অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে সিলেট বিভাগীয় সাঁওতাল জনগোষ্ঠী।

দিবসের শুরুতে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর অডিটরিয়াম প্রাঙ্গণে স্থাপিত সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। পরে একটি বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।

Manual1 Ad Code

আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিয়াউর রহমান।

বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জয় বণিক, মৌলভীবাজার চা জনগোষ্ঠী আদিবাসী ফ্রন্টের নেতা পরিমল সিং বাড়াইক, কবি লুৎফর রহমান এবং সাংবাদিক বিকুল চক্রবর্তী ও ইসমাইল মাহমুদ।

সাঁওতাল সমাজ কল্যাণ পরিষদের সভাপতি সুজিত সাঁওতালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন সুমন সাঁওতাল, জবা সাঁওতাল, রনজিত সাঁওতাল, সমর সাঁওতাল, দয়ামনি সাঁওতাল, নরেশ সাঁওতাল, প্রদীপ সাঁওতাল, কমল সাঁওতাল, রাঙাচরণ সাঁওতাল, শ্যামল সাঁওতাল ও বিষ্ণু সাঁওতাল। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দুলাল সাঁওতাল ও স্বপন মুর্মু।

Manual2 Ad Code

বক্তারা ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং জমিদার-মহাজনদের শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

Manual4 Ad Code

তারা বিদ্রোহের নেতা সিধু মুর্মু, কানু মুর্মু, চাঁদ মুর্মু, ভৈরব মুর্মু এবং নারী নেত্রী ফুলমনি ও ঝানুর আত্মত্যাগ ও অবদানের কথা স্মরণ করেন। বক্তারা বলেন, শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে সাঁওতালদের এই সংগ্রাম আজও ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগায়।
আলোচনা সভা শেষে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা সাঁওতাল শিল্পীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাকে নৃত্য ও সংগীত পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা এবং সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রত্যয় ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

এ দিবস উপলক্ষে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, “৩০ জুন সাঁওতাল বিদ্রোহ দিবস। এ বছর সাওতাল বিদ্রোহের ১৭১ বছর পূর্ণ হলো। প্রতি বছর দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করা হয়।
১৮৫৫ সালের এই দিনে ব্রিটিশ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে সাঁওতালরা যুদ্ধ শুরু করেছিল। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা মারা যায়। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা বৃটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে সিদু-কানহু-চান্দ ও ভাইরো পর্যায়ক্রমে নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয় ও বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে।
দিবসটি উপলক্ষে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলার চা বাগানগুলোতে বসবাসকারী প্রায় ৩০ হাজার সাঁওতাল প্রতি বছর দিনব্যাপী কর্মসূচি পালন করলেও এবার করোনার জন্য কোন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়নি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, আজ থেকে ১৭১ বছর পূর্বে ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন তারিখে সাওতাল সম্প্রদায়ের চার ভাই সিদু-কানহু-চান্দ ও ভাইরোর নেতৃত্বে আদিবাসীরা বৃটিশদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। এ যুদ্ধের উদ্দেশ্য ছিল বৃটিশ সৈন্য ও তাদের দোসর অসৎ ব্যবসায়ী, মুনাফাখোর ও মহাজনদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও নির্যাতনের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করা এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম সাঁওতাল রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা।
ইতিহাস হতে আরও জানা যায়, দামিন-ই কোহ ছিল সাঁওতালদের নিজস্ব গ্রাম, নিজস্ব দেশ। বহু কষ্ট করে জঙ্গল কেটে বন সাফ করে তারা তাদের জনপদ গড়ে তুলেছিল। অতীতে যে মাটিতে কোন মানুষের পা পড়েনি, সে মাটিকে তারা বাসযোগ্য করে গড়ে তুলেছিল আর সে মাটিতে ফলিয়েছিল ধান, ভুট্টা, নানা ধরণের সব্জি আর সোনালী ফসল। সুখে ছিল তারা দামিন-ই কোহতে। নিজেদের আলাদা একটি জগৎ তৈরী করেছিল তারা। সে জগতে কোন মহাজন, দালাল, জমিদার ছিলনা। কেউ ঋণী ছিলনা তখন। কিন্তু ব্যবসায়ী ও মহাজন শ্রেণী দলে দলে আসতে শুরু করল সাঁওতাল পরগনায়। মহাজন ও ব্যবসায়ী শ্রেণী সাঁওতাল পরগনায় ঢুকে বিপুল পরিমাণ ধান, সরিষা ও অন্যান্য তৈলবীজ গরুর গাড়ী বোঝাই করে নিয়ে যেত। বিনিময়ে সাঁওতালদের দেওয়া হতো সামান্য লবণ, টাকা-পয়সা, তামাক অথবা কাপড়। এখানে বিনিময়ের সময় চরমভাবে ঠকানো হতো সাঁওতালদের। কিছু অর্থ, কিছু চাল বা অন্য কোন দ্রব্য ঋণ দিয়ে সমস্ত জীবণের জন্য সাঁওতালদের ভাগ্য বিধাতা ও দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসত মহাজনরা। ফসল কাটার মৌসুম এলে মহাজন শ্রেণী গরুর গাড়ী ও ঘোড়া নিয়ে সাঁওতাল পরগনায় আসত। বার্ষিক আদায়ে আসার সময় মহাজনরা একটি পাথরে সিদুর মাখিয়ে নিয়ে আসত এবং সাঁওতালদের বলত যে, এ পাথরের ওজন নির্ভূল। এ পাথরের সাহায্যে ওজন করে মহাজনরা সাঁওতালদের সমস্ত ফসল তুলে নিয়ে যেত। কিন্তু তারপরও আদিবাসীদের ঋণের বোঝা সামান্য হ্রাস পেত না। মহাজনদের ঋণের সুদের হার ছিল অতি উচ্চ। একজন সাঁওতালকে তার ঋণের জন্য তার জমির ফসল, লাঙ্গলের বলদ এমনকি নিজেকেও বলি দিতে হতো তার পরিবারের কাছ থেকে। আর সেই ঋণের দশগুণ পরিশোধ করলেও পূর্বে যেরুপ ছিল পরেও সেইরুপ ঋণ অবশিষ্ট থাকত।
মহাজন, দালাল, জমিদার কর্তৃক নিরীহ ও সরল আদিবাসীদের শোষণ ও নির্যাতনে পরোক্ষ মদদ দিতো বৃটিশ সৈন্য বাহিনী। এ কারণে আদিবাসীরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ১৮৫৫ সালের ৩০ জুন যুদ্ধ শুরু হয় এবং ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে তা শেষ হয়। সাওতাঁলরা তীর-ধনুক ও দেশীয় অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করলেও ইংরেজ বাহিনীর হাতে ছিলো বন্দুক ও কামান। তারা ঘোড়া ও হাতি যুদ্ধে ব্যবহার করেছিল। এ যুদ্ধে ইংরেজ সৈন্যসহ প্রায় ১০ হাজার সাঁওতাল যোদ্ধা মারা যায়। সাঁওতাল বিদ্রোহের লেলিহান শিখা বৃটিশ সরকারের মসনদ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধে সিদু-কানহু-চান্দ ও ভাইরো পর্যায়ক্রমে নিহত হলে ১৮৫৬ সালের নভেম্বর মাসে যুদ্ধ শেষ হয় ও বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে।”

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার চানপুর চা বাগানের শ্রমিক ও আদীবাসী ফোরাম হবিগঞ্জ জেলার আহবায়ক স্বপন সাঁওতাল জানান, “হবিগঞ্জের চা বাগানগুলোতে প্রায় ৩০ হাজার সাঁওতাল রয়েছে। আমাদের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি। প্রতি বছর আমরা ঝাকঝমক ভাবে দিবসটি পালন করি।
তিনি আরও জানান সহজ-সরল সাঁওতালরাই এই উপমহাদেশের দুর্গম জঙ্গল ও ভূমিকে কঠোর পরিশ্রম করে আবাদী জমিতে রুপান্তর করে কৃষির প্রচলন করে। এখনও সাঁওতালরা চা শিল্প ও কৃষিতে যেভাবে কাজ করে আর কেউ এভাবে কাজ করে না। কিন্তু সাঁওতালরা তাদের এই পরিশ্রমের কোন স্বীকৃতি পায়নি। কোন পৃষ্টপোষকতা না থাকায় আমাদের সংস্কৃতি ও ভাষা বিলীন হওয়ার পথে।”

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ