নদী উদ্ধার আন্দোলনের নায়ক ড. তুহিন ওয়াদুদ

প্রকাশিত: ২:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০২৬

নদী উদ্ধার আন্দোলনের নায়ক ড. তুহিন ওয়াদুদ

Manual6 Ad Code
  • ১৬ বছরের আন্দোলনে উদ্ধার চার নদী, চলমান আরও কয়েকটির লড়াই

নিজস্ব প্রতিবেদক | রংপুর, ৩০ জুলাই ২০২৬ : একের পর এক নদ-নদী দখলমুক্ত করে উত্তরাঞ্চলে নদী রক্ষার আন্দোলনকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, নদী গবেষক ও পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক ড. তুহিন ওয়াদুদ।

শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি নদী রক্ষার আন্দোলনকে জনসম্পৃক্ত করে তুলেছেন। স্থানীয় মানুষকে সংগঠিত করে নদী সুরক্ষা কমিটি গঠন, ধারাবাহিক গণআন্দোলন, প্রশাসনের সঙ্গে সংলাপ, মানববন্ধন, স্মারকলিপি ও আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তার নেতৃত্বে এখন পর্যন্ত চারটি নদী উদ্ধার হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকটি নদী রক্ষায় আন্দোলন চলছে।

Manual8 Ad Code

নদীবিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলস-এর পরিচালক হিসেবে ড. তুহিন ওয়াদুদ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী নিয়ে গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তার নেতৃত্বে উদ্ধার হওয়া নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে নীলফামারীর শাখা দেওনাই, রংপুরের শালমারা, বদরগঞ্জের খটখটিয়া এবং কুড়িগ্রামের চাকিরপশার নদ।

Manual5 Ad Code

শাখা দেওনাই নদ উদ্ধার : বাতিলের মুখ থেকে সরকারি তালিকায়

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার শাখা দেওনাই নদ ছিল স্থানীয় প্রভাবশালীদের অবৈধ দখলে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, স্থানীয় প্রশাসন নদটিকে নদীর শ্রেণি থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও তৈরি করেছিল।

খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান ড. তুহিন ওয়াদুদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গঠন করেন ‘শাখা দেওনাই নদী সুরক্ষা কমিটি’। কমিটির আহ্বায়ক করা হয় আব্দুল ওয়াদুদকে এবং সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন ড. তুহিন ওয়াদুদ।

তার নেতৃত্বে শুরু হয় বিক্ষোভ, মানববন্ধন, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, স্মারকলিপি প্রদান এবং ধারাবাহিক আন্দোলন। আন্দোলনের মুখে ২০১৯ সালে প্রশাসন নদটিকে বাতিলের প্রস্তাব প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে অবৈধ দখলদাররা নদীর জমি ছেড়ে দেয় এবং নদটিকে সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়।

শাখা দেওনাই নদী সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, “তুহিন ওয়াদুদের সক্রিয় নেতৃত্বে আমরা শুধু একটি নদী উদ্ধার করিনি; বরং পুরো জেলার নদ-নদী রক্ষার আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। নদীপাড়ের মানুষের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার মানুষ।”

শালমারা নদ : জেল-জুলুমের পর বিজয়

রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শালমারা নদীর মূল প্রবাহের বড় অংশ কয়েকজন ব্যক্তি অবৈধভাবে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নেন। স্থানীয়রা দীর্ঘদিন আন্দোলন করলেও নদী উদ্ধার সম্ভব হয়নি। আন্দোলন করতে গিয়ে কারাবরণও করেন সত্তরোর্ধ্ব শাহ জালাল।

পরে শাহ জালালকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটি। সমন্বয়ে ছিলেন ড. তুহিন ওয়াদুদ। দীর্ঘ আন্দোলন, প্রশাসনিক তৎপরতা এবং জনমত গড়ে তোলার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফল হিসেবে ২০২২ সালে শালমারা নদী দখলমুক্ত হয়।

স্থানীয়দের মতে, বিচ্ছিন্ন আন্দোলনকে সুসংগঠিত গণআন্দোলনে রূপ দেওয়ার কারণেই শালমারা নদ উদ্ধার সম্ভব হয়েছে।

খটখটিয়া নদ : অবৈধ মালিকানা বাতিল

বদরগঞ্জ উপজেলার খটখটিয়া নদ দখলের তথ্য প্রথমে ড. তুহিন ওয়াদুদের কাছে পৌঁছে দেন প্রকৌশলী ফজলুল হক। এরপর স্থানীয়দের নিয়ে গঠন করা হয় খটখটিয়া নদী সুরক্ষা কমিটি।

দীর্ঘ আন্দোলন, প্রশাসনের কাছে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে ২০২৪ সালে নদীর ওপর অবৈধ মালিকানা বাতিল হয়। স্থানীয়দের মতে, এ আন্দোলনে প্রকৌশলী ফজলুল হকের পাশাপাশি ড. তুহিন ওয়াদুদের সাংগঠনিক নেতৃত্ব ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

চাকিরপশার নদ : ১৪১ একর দখলমুক্ত

Manual2 Ad Code

কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত চাকিরপশার নদ দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের দখলে ছিল। নদটির ১৪১ একর জায়গা বিভিন্নভাবে দখল করা হয়েছিল।

ড. তুহিন ওয়াদুদের সমন্বয়ে গঠিত হয় চাকিরপশার নদী সুরক্ষা কমিটি। দীর্ঘ আন্দোলন, জনমত সৃষ্টি এবং প্রশাসনিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০২২ সালে নদটির ১৪১ একর জায়গা দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়।

চাকিরপশার নদী সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক খন্দকার আরিফ বলেন, “তুহিন ওয়াদুদের নিরলস প্রচেষ্টা ও নেতৃত্ব ছাড়া এই নদ উদ্ধার সম্ভব হতো না।”

১৬ বছরের সংগ্রাম

ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, “নদী উদ্ধারের আন্দোলন করতে গিয়ে বহুবার মামলা-হামলার শিকার হয়েছি। শারীরিকভাবে আক্রমণের শিকার হয়েছি, প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছি। সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা হয়েছে, আর্থিক ক্ষতিরও মুখোমুখি হতে হয়েছে। কিন্তু নদী রক্ষার সংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াইনি। প্রায় ১৬ বছর ধরে এই কাজ করে যাচ্ছি।”

তিনি জানান, বর্তমানে নীলফামারীর কুমলাই নদ রক্ষায় আন্দোলন চলছে। পাশাপাশি উত্তরাঞ্চলের আরও কয়েকটি নদী উদ্ধারে স্থানীয় জনগণকে নিয়ে নতুন আন্দোলনের প্রস্তুতিও চলছে।

নদী রক্ষায় নতুন মডেল

Manual6 Ad Code

পরিবেশবিদদের মতে, ড. তুহিন ওয়াদুদের সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু নদী উদ্ধার নয়; বরং প্রতিটি নদীকে ঘিরে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে স্থায়ী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। প্রতিটি এলাকায় নদী সুরক্ষা কমিটি গঠন করে তিনি স্থানীয়দের মধ্যেই নদী রক্ষার দায়িত্ববোধ তৈরি করেছেন। ফলে আন্দোলন ব্যক্তি-নির্ভর না থেকে জনআন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

কমিশনের মূল্যায়ন

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, “ড. তুহিন ওয়াদুদ দীর্ঘদিন ধরে নদী নিয়ে গবেষণা ও আন্দোলন করে আসছেন। যেকোনো সফল আন্দোলনের জন্য একজন দক্ষ সংগঠকের প্রয়োজন হয়। রংপুর অঞ্চলের নদী রক্ষার আন্দোলনে সেই সাংগঠনিক নেতৃত্বের ভূমিকাই পালন করছেন তিনি। তার নেতৃত্বে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি নদী উদ্ধার হয়েছে।”

তিনি বলেন, নদী রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে মডেল ড. তুহিন ওয়াদুদ তৈরি করেছেন, তা দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অনুসরণযোগ্য হতে পারে।

নদী উদ্ধারের সময়রেখা

– ২০১৯: নীলফামারীর শাখা দেওনাই নদ বাতিলের প্রস্তাব প্রত্যাহার ও দখলমুক্তির প্রক্রিয়া শুরু।
– ২০২২: রংপুরের শালমারা নদ উদ্ধার।
– ২০২২: কুড়িগ্রামের চাকিরপশার নদের ১৪১ একর জায়গা দখলমুক্ত।
– ২০২৪: বদরগঞ্জের খটখটিয়া নদের অবৈধ মালিকানা বাতিল।
– চলমান: নীলফামারীর কুমলাই নদ রক্ষার আন্দোলন এবং আরও কয়েকটি নদী উদ্ধারের প্রস্তুতি।

দীর্ঘ ১৬ বছরের আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় ড. তুহিন ওয়াদুদ এখন উত্তরাঞ্চলে নদী রক্ষার অন্যতম পরিচিত মুখ। স্থানীয় মানুষের মতে, তার নেতৃত্বে নদী উদ্ধারের আন্দোলন শুধু পরিবেশ রক্ষার উদ্যোগ নয়, বরং নদীকেন্দ্রিক জনঅধিকার প্রতিষ্ঠারও একটি সফল উদাহরণ।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ