বাসযোগ্য নগরী গঠনে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও গণপরিসর সংরক্ষণের আহ্বান

প্রকাশিত: ৫:৪৫ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৪, ২০২৬

বাসযোগ্য নগরী গঠনে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ ও গণপরিসর সংরক্ষণের আহ্বান

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ আগস্ট ২০২৬ : অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে রাজধানী ঢাকায় পার্ক, খেলার মাঠ, সবুজ এলাকা, জলাধার ও জলাভূমি ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এর ফলে নগরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ু ও শব্দদূষণ, যানজট এবং জনস্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপদ ফুটপাত, সড়ক পারাপার, হাঁটাবান্ধব অবকাঠামো, সাইকেল চলাচলের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং মানসম্মত গণপরিবহন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা।

তারা বলেছেন, ঢাকা শহরের মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ মানুষ ব্যক্তিগত গাড়িতে যাতায়াত করে। বিপরীতে ৯০ শতাংশের বেশি মানুষ দৈনন্দিন যাতায়াতে হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই নগর পরিকল্পনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের চলাচল ও জীবনযাত্রার প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে নগরের পার্ক, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, জলাধার ও সবুজ এলাকা সংরক্ষণ করে সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত ও প্রবেশগম্য করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

সোমবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) রাজধানীতে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাসযোগ্য নগরী গঠনে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সকাল ১০টায় সংস্থার কৈবর্ত সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।

অনুষ্ঠানে ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের সহকারী প্রকল্প কর্মকর্তা মো. মিঠুনের সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সংস্থার পরিচালক গাউস পিয়ারী।

Manual1 Ad Code

সভায় সমাজকর্মী ও তেঁতুলতলা মাঠ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক সৈয়দা রত্না, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হুমায়ুন কবির সুমন, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) অর্গানাইজিং সেক্রেটারি আবুল কালাম আজাদ, ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার নাঈমা আকতার, শিশুদের মুক্ত বায়ুসেবন সংস্থার সদস্য মো. সেলিম, এ্যাকশন ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশনের মেরিনা আক্তার, ডিডিপির সভাপতি জাকির হোসেন, ব্রেভের নির্বাহী পরিচালক জাকিয়া জাহান, ধানমন্ডি কচিকন্ঠ হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এইচ এম নুরুল ইসলাম, বেঙ্গলী মিডিয়াম হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক জাকির হোসেন, রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সবিতা রাণী পাল, বারসিকের রুমা আক্তার, ডিওয়াইডিএফের হেড অব এনভায়রনমেন্ট মো. মুন্না হোসেন, গ্রিন ভয়েসের আহসান হক, ডাব্লিউডিডিএফের অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাডমিন অফিসার রওশন আরা চৌধুরী, ভিডিসির এস এম শফিউল ইসলাম, ছায়াতল বাংলাদেশের মিতু খাতুন এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশের পলিসি অফিসার তালুকদার রিফাত পাশাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য দেন।

Manual7 Ad Code

হাঁটা, সাইকেল ও গণপরিবহনে গুরুত্ব

সভায় বক্তারা বলেন, নগরের পরিবহন পরিকল্পনায় ব্যক্তিগত গাড়িকেন্দ্রিক ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে যানজট ও দূষণ বাড়ায়। অথচ নগরের বিপুলসংখ্যক মানুষ হেঁটে, সাইকেলে ও গণপরিবহনে চলাচল করেন। তাই পথচারী ও গণপরিবহন ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ ও আরামদায়ক অবকাঠামো তৈরি করা জরুরি।

তারা ফুটপাতের মান উন্নয়ন, প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটপাত প্রশস্ত করা এবং অবৈধ দখলমুক্ত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে নিরাপদ সড়ক পারাপারের ব্যবস্থা, ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পথচারীবান্ধব নগর অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন।

সাইকেলকে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ের যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, রাজধানীতে সাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট লেন তৈরি করার পাশাপাশি বিচ্ছিন্ন কিছু লেনের পরিবর্তে কার্যকর ও ধারাবাহিক রুট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। এতে স্বল্প দূরত্বে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

মাঠ-পার্ক সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার দাবি

মতবিনিময় সভায় ঢাকার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, শিশু-কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ এবং নগরবাসীর সুস্বাস্থ্যের জন্য এলাকাভিত্তিক মাঠ ও গণপরিসরের বিকল্প নেই। এসব স্থান কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা ক্লাবের নিয়ন্ত্রণে রেখে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত করা উচিত নয়।

মাঠ-পার্কগুলো সরকারের আওতায় রেখে সবার প্রবেশগম্যতা ও অন্তর্ভুক্তিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে মাঠ-পার্কে খেলাধুলা বা প্রবেশের জন্য অর্থ আদায় না করার সুপারিশ করেন বক্তারা।

Manual4 Ad Code

তাদের মতে, নগরের খাস জমি দখলমুক্ত করে সেখানে পুকুর খনন, জলাধার ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং নতুন সবুজ এলাকা সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। জলাধার ও সবুজ এলাকা শুধু সৌন্দর্যবর্ধনের উপাদান নয়, বরং নগরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জলাবদ্ধতা মোকাবিলা ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদ্যালয় ও হাসপাতাল ঘিরে নিরাপদ পরিবেশ

শিশুদের নিরাপদ চলাচল ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়েও সভায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি জানান। পাশাপাশি বিদ্যালয়ে শিশুদের নিরাপদে হেঁটে যাতায়াতের উপযোগী রাস্তা ও ফুটপাত নিশ্চিত করার সুপারিশ করেন।

তাদের মতে, শিশুদের বিদ্যালয়ে যাতায়াতকে নিরাপদ করতে হলে শুধু বিদ্যালয়ের ভেতরের নিরাপত্তা নয়, বিদ্যালয়সংলগ্ন সড়ক, ফুটপাত, পারাপার ব্যবস্থা ও ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণকেও পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।

দূষণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান

সভায় নগরের বায়ু, শব্দ ও অন্যান্য পরিবেশদূষণের উৎস চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন যথেষ্ট নয়; সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।

দখল ও দূষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে পরিবেশ রক্ষায় সক্রিয় ও কঠোর নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

কাঁচাবাজারে শৃঙ্খলা ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিতের সুপারিশ

রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলোর অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, নগরের বাজারগুলোতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন ও চলাচলের পর্যাপ্ত সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বাজারের পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে দক্ষ জনবল নিয়োগ, পরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত ও কার্যকর মনিটরিংয়ের সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনের যথাযথ বাস্তবায়নের দাবি জানানো হয়।

ভোক্তা ও দোকানি—উভয়ের অধিকার বিবেচনায় নিয়ে বাজারের অবকাঠামো পরিকল্পনা করার ওপরও জোর দেওয়া হয়। বাজারে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীসহ সব শ্রেণির মানুষের প্রবেশগম্যতা ও অন্তর্ভুক্তিতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সুবিধা তৈরির সুপারিশ করা হয়।

স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান

আয়োজনে স্থানীয় জ্ঞান, সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং নগরবাসীর বাস্তব অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে ন্যায়ভিত্তিক ও টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে একটি প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়।

সভায় উপস্থিত অতিথিরা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন বিষয়ে সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে ছিল হেঁটে ও সাইকেলে নিরাপদ যাতায়াত, শিশুদের নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত, মাঠ-পার্ক ও এলাকাভিত্তিক গণপরিসরের উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, পরিবেশদূষণ হ্রাস এবং কাঁচাবাজারের মানোন্নয়ন।

বক্তারা বলেন, বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে শুধু বড় অবকাঠামো নির্মাণের দিকে নজর দিলে হবে না। নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ফুটপাত, গণপরিসর, বাজার, জলাধার, সবুজ এলাকা, গণপরিবহন ও নিরাপদ চলাচলের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে নগর উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে।

বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস পালনের পরিকল্পনা

মতবিনিময় সভার দ্বিতীয় পর্বে বিশ্ব ব্যক্তিগত গাড়িমুক্ত দিবস ২০২৬ উদযাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করা হয়। এ উপলক্ষে সম্মিলিতভাবে মানববন্ধন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারাভিযান, গাড়িমুক্ত সড়ক আয়োজন এবং স্কুলভিত্তিক সচেতনতামূলক কর্মসূচি পালনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন আয়োজক ও অংশগ্রহণকারীরা।

বক্তারা বলেন, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো শুধু যানজট নিরসনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জ্বালানি ব্যবহার, সড়ক নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং নগরের উন্মুক্ত স্থান ব্যবহারের সুযোগও জড়িত। তাই ব্যক্তিগত গাড়ির বিকল্প হিসেবে নিরাপদ হাঁটা, সাইকেল এবং উন্নত গণপরিবহনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

Manual8 Ad Code

আয়োজনে ধানমন্ডি কচিকন্ঠ হাইস্কুল, বেঙ্গলী মিডিয়াম হাইস্কুল, শিশুদের মুক্ত বায়ু সেবন সংস্থা, ছায়াতল বাংলাদেশ, ডিডিপি, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিইং বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সভা থেকে বক্তারা প্রত্যাশা করেন, সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, নগর পরিকল্পনাবিদ, নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে ঢাকাকে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তরের পথ তৈরি হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ