সিলেট ২৬শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৪:৪০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২৫, ২০২৬
অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে বাড়ছে রোগের ঝুঁকি, দ্রুত প্রবিধানমালা চূড়ান্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৫ আগস্ট ২০২৬ : বাংলাদেশে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে তরুণ ও বয়স্ক—সব বয়সী মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বিযুক্ত অতি-প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কারণে সৃষ্ট এসব স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে ভোক্তাকে খাবারের ক্ষতিকর উপাদান সম্পর্কে সহজ ও স্পষ্ট তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা জরুরি। এ ক্ষেত্রে খাদ্যের মোড়কের সামনের অংশে সতর্কবার্তা বা ‘ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং’ (এফওপিএল) চালু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ প্যাকেটজাত খাবারের মোড়কের পেছনে ছোট অক্ষরে ও তুলনামূলক জটিলভাবে পুষ্টি-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া থাকে। ফলে সাধারণ ভোক্তার পক্ষে একটি খাবারে কত পরিমাণ লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বি রয়েছে এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ—তা দ্রুত বুঝে ওঠা কঠিন। তাই খাবারের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজে দৃশ্যমান ও বোধগম্য সতর্কবার্তা যুক্ত করা হলে ভোক্তা কেনাকাটার সময় দ্রুত ও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।
রাজধানীর বিআইপি কনফারেন্স রুমে ২৪ ও ২৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত দুইদিনব্যাপী ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল): প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটর (জিএইচএআই)-এর সহযোগিতায় প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে প্রিন্ট, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ২৬ জন সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর বড় একটি অংশের জন্য দায়ী অসংক্রামক রোগ। হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের পেছনে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বি সমৃদ্ধ অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের নিয়মিত ও অতিরিক্ত গ্রহণ মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে ঝুঁকি
বক্তারা বলেন, নগরায়ণ, জীবনযাত্রায় পরিবর্তন, ব্যস্ততা এবং সহজলভ্যতার কারণে প্যাকেটজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে ক্রমেই জায়গা করে নিচ্ছে। শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যেও এসব খাবারের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। বিভিন্ন ধরনের কোমল পানীয়, মিষ্টিজাতীয় খাবার, স্ন্যাকস, ইনস্ট্যান্ট বা প্রস্তুত খাবারসহ নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাদ্য নিয়মিত খাদ্যতালিকায় যুক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বি গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খাদ্যের প্যাকেটে থাকা তথ্য ভোক্তাকে সচেতন করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। কিন্তু শুধু প্যাকেটের পেছনে বিস্তারিত পুষ্টি তথ্য উল্লেখ থাকলেই তা সব ভোক্তার কাছে কার্যকরভাবে পৌঁছায় না। তথ্য যদি জটিল, ছোট অক্ষরে লেখা কিংবা বোঝার জন্য বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন হয়, তাহলে ভোক্তার আচরণ পরিবর্তনে এর কার্যকারিতা কমে যেতে পারে।
এ কারণে প্যাকেটের সামনের অংশে সহজ, স্পষ্ট ও দ্রুত বোঝা যায়—এমন সতর্কতামূলক লেবেল ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
তাদের মতে, বাজারে কোনো পণ্য হাতে নেওয়ার পর কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই একজন ভোক্তা যেন বুঝতে পারেন খাবারটিতে অতিরিক্ত লবণ, চিনি বা ক্ষতিকর চর্বি রয়েছে কি না—এফওপিএলের অন্যতম উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সেটিই।
দ্রুত চূড়ান্ত হবে খসড়া প্রবিধানমালা
কর্মশালায় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, ‘খসড়া প্রবিধানমালাটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সকল প্রক্রিয়া শেষে এটি দ্রুতই চূড়ান্ত হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
তিনি বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে এফওপিএল ভোক্তাকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর খাদ্য বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে।
ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এফওপিএল একটি বিজ্ঞানসম্মত উপায়। এটি ভোক্তাকে সহজেই অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি বুঝতে সাহায্য করবে।’
তার মতে, খাবারের প্যাকেটে তথ্য থাকলেই হবে না; সেই তথ্য এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে বুঝতে পারেন। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের খাদ্যাভ্যাসে অস্বাস্থ্যকর পণ্যের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও গুরুত্ব
জিএইচএআই-এর বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, ‘অসংক্রামক রোগে মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনা সংক্রান্ত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এফওপিএল প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্তকরণ ও বাস্তবায়ন জরুরি।’
তিনি বলেন, অসংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান বোঝা মোকাবিলায় শুধু চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে হবে না; রোগের ঝুঁকি কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ জোরদার করতে হবে। স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্য সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অসংক্রামক রোগের চিকিৎসায় ব্যক্তি ও পরিবারের ওপর যেমন বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তেমনি এসব রোগ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও অর্থনীতির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমে ঝুঁকি কমানোর সুযোগ থাকলে তা দ্রুত কাজে লাগানো প্রয়োজন।
গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ
চ্যানেল ২৪-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, ‘অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় এফওপিএলের কার্যকারিতা তুলে ধরে গণমাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ খসড়া প্রবিধানমালা চূড়ান্তকরণের পথ সুগম করবে।’
তিনি বলেন, জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও উদ্যোগ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এফওপিএল কী, কেন প্রয়োজন এবং এটি কীভাবে ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে—এসব বিষয় সহজ ভাষায় মানুষের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন।
কর্মশালায় বক্তারা আরও বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যের বাজার ও বিপণন কৌশলের কারণে ভোক্তার সিদ্ধান্ত অনেক সময় বিজ্ঞাপন ও আকর্ষণীয় মোড়কের ওপর নির্ভর করে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের বিপণন তাদের খাদ্য পছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। এ পরিস্থিতিতে পণ্যের মোড়কে সহজে দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকলে ভোক্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
নীতিমালা বাস্তবায়নের পাশাপাশি সচেতনতাও জরুরি
বক্তারা বলেন, এফওপিএল চালুর পাশাপাশি এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লেবেলিং ব্যবস্থায় কোন ধরনের তথ্য থাকবে, কীভাবে তা প্রদর্শন করা হবে এবং কোন পণ্যের ক্ষেত্রে সতর্কবার্তা বাধ্যতামূলক হবে—এসব বিষয় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা জরুরি।
একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যেও লেবেল সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কারণ কোনো নীতিমালা কার্যকর হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো সাধারণ মানুষকে সেই নীতিমালা সম্পর্কে জানানো এবং বাস্তব জীবনে তার ব্যবহার নিশ্চিত করা।
কর্মশালায় আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া অ্যালায়েন্স-আত্মার কো-কনভেনর মিজান চৌধুরী এবং প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের।
এ ছাড়া গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রজ্ঞার কর্মসূচি প্রধান হাসান শাহরিয়ার এবং প্রোগ্রাম অফিসার শবনম মোস্তফা।
দুইদিনব্যাপী কর্মশালায় এফওপিএলের প্রয়োজনীয়তা, বাংলাদেশে এর অগ্রগতি, খসড়া প্রবিধানমালার বর্তমান অবস্থা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে এর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বক্তারা বলেন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নীতিগত উদ্যোগ, কার্যকর লেবেলিং, জনসচেতনতা এবং গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা—সবগুলো বিষয়কে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে এফওপিএল-সংক্রান্ত প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত ও কার্যকর করার মাধ্যমে ভোক্তার জন্য আরও স্বচ্ছ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি