ফিরে গিয়ে সারাজীবন কষ্ট সহ্য করার শক্তি

প্রকাশিত: ৯:৩৩ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

ফিরে গিয়ে সারাজীবন কষ্ট সহ্য করার শক্তি

Manual8 Ad Code

নাজমা নাজু |

আমার বয়স ২৩ বছর, বিয়ে হয়েছে মাত্র চার মাস। বিয়ের আগে আমাদের সাত মাসের সম্পর্ক ছিল। দুই পরিবারের অমত থাকা সত্ত্বেও অনেক কষ্টে সবাইকে রাজি করিয়ে নিজের পছন্দের মানুষটিকে বিয়ে করেছিলাম। আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে, কিন্তু কখনো অভাবের মধ্যে বড় হইনি। চার বোনের মধ্যে আমি পড়াশোনায় কিছুটা এগিয়ে ছিলাম। আমার বাবা আমাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু আজ তিনি বেঁচে নেই। বাবার আদরে রাজকন্যার মতো বড় হয়েছি। অনেক ভালো সম্বন্ধ আসার পরও শুধু নিজের পছন্দের মানুষটিকে জীবনসঙ্গী করার জন্য সেগুলো ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, টাকা-পয়সা কম থাকলেও ভালোবাসা থাকলে সুখে থাকা যায়। কিন্তু বিয়ের পর বুঝলাম, শুধু ভালোবাসা দিয়ে সব কষ্ট জয় করা যায় না।

Manual1 Ad Code

শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে প্রথম দিন থেকেই পরিবেশ দেখে অবাক হয়েছিলাম। কীভাবে মানিয়ে নেব, বুঝতে পারছিলাম না। তবুও স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে সবকিছু মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছি। এমনকি নিজের পরিবারের মানুষদেরও বৌভাতে আসতে নিষেধ করেছিলাম, যেন নতুন সংসারে কোনো সমস্যা না হয়। কিন্তু বিয়ের মাত্র দুই দিন পর থেকেই আট-দশজনের রান্না, সবজি কাটা, চারটি ঘর পরিষ্কার করা, শ্বশুর-শাশুড়ির কাপড় ধোয়া, স্বামীর কাজ—সবকিছু আমার ওপর এসে পড়ে। গ্যাস না থাকলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুলার সামনে দাঁড়িয়ে রান্না করেছি। জীবনে আগে কখনো এত কাজ একসঙ্গে করতে হয়নি, তবুও কাউকে কিছু বুঝতে দিইনি। ভেবেছিলাম, ধীরে ধীরে সবাই আমাকে আপন করে নেবে।

কিন্তু এত কিছু করার পরও শাশুড়ির মন জয় করতে পারিনি। সরাসরি শুনতে হয়েছে, আমি নাকি কোনো কাজই করি না, কাজ পরিষ্কার করে করতে পারি না, জীবনে নাকি কাপড়ও ধুইনি! অথচ আমার চেষ্টা, পরিশ্রম আর কষ্টের কোনো মূল্যই যেন ছিল না। সকালে উঠে খাওয়া-দাওয়া করে তিনি আবার ঘুমিয়ে পড়তেন, আর দিনের বাকি সময় নানা কথা শুনতে হতো আমাকে। গত তিন মাসে কতবার যে নিজের ঘরে বসে কেঁদেছি, তার হিসাব নেই। কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করিনি, কারও সঙ্গে বেয়াদবি করিনি, অথচ শেষ পর্যন্ত আমাকেই বেয়াদব আর সেয়ানা উপাধি দেওয়া হয়েছে।

সবচেয়ে কষ্টের বিষয়, অসুস্থ হলেও শান্তি ছিল না। সারাদিন না খেয়ে ঘরে পড়ে থাকলেও কেউ এসে জিজ্ঞেস করত না, আমি বেঁচে আছি কি না! সামান্য কিছু খেতে চাইলেও কৈফিয়ত দিতে হতো। অসুস্থ শরীরে এক বাটি স্যুপ খেতে গেলেও প্রশ্ন শুনতে হয়েছে, শাশুড়িকে না দিয়ে কেন খেলাম! একটা মেয়ে নিজের বাড়িতে রাজকন্যার মতো বড় হয়েছে বলে শ্বশুরবাড়িতে কাজ করবে না, এমন দাবি আমার ছিল না। আমি কাজ করতে আপত্তি করিনি; আপত্তি ছিল কাজের নামে অবহেলা, অপমান আর অমানবিক আচরণে। আমি তো নতুন একটা পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছিলাম, আমারও যে সময় লাগতে পারে, আমারও যে শরীর খারাপ হতে পারে, আমারও যে একটু যত্নের প্রয়োজন হতে পারে—এটা কেউ বুঝতে চায়নি।

আমার স্বামী আমাকে ভালোবাসে ভেবেই এত কষ্ট সহ্য করেছি। তার কাছে নিজের কষ্টের কথা বলেছি, কিন্তু সেও ধীরে ধীরে আমার কষ্টগুলোকে স্বাভাবিক ভাবতে শুরু করে। তার মা আমাকে মানসিকভাবে কষ্ট দিতেন, আর রাতে স্বামীর কাছ থেকেও এমন আচরণ পেতাম, যা আমাকে আরও ভেঙে দিত। ঘুমিয়ে পড়লে সামান্য কাজের জন্য ঘুম থেকে উঠিয়ে দেওয়া হতো, অথচ কাজগুলো সে নিজেও করতে পারত। দিনের পর দিন শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি নিয়ে বেঁচে থেকেছি। যে মানুষটির সঙ্গে সুখের সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেই মানুষটিই যখন আমার কষ্ট বুঝতে চাইল না, তখন নিজেকে ভীষণ অসহায় মনে হয়েছে।

Manual3 Ad Code

সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, বিয়ের এই অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই আমার স্বামী কয়েকবার আমার গায়ে হাত তুলেছে। কারণ, আমি নাকি তার কথা শুনিনি! একজন স্ত্রী কি স্বামীর সব কথা মেনে না নিলেই মার খাওয়ার যোগ্য হয়ে যায়? বিয়ে করেছি বলে কি নিজের মতামত, অনুভূতি আর সম্মান বিসর্জন দিতে হবে? আমি কি মানুষ নই? আমার কি কষ্ট হয় না? আমারও কি ভালো থাকার অধিকার নেই?

এখন এক মাসের বেশি সময় ধরে বাবার বাড়িতে আছি। এই বাড়িতে এসে অন্তত একটু শান্তিতে নিঃশ্বাস নিতে পারছি। কিন্তু এখানেও মনের ভেতর যুদ্ধ চলছে। যাকে এত ভালোবেসে নিজের পরিবারের অমত উপেক্ষা করে বিয়ে করেছিলাম, তাকে ছেড়ে থাকার কথা ভাবলেই বুকটা কেঁপে ওঠে। অথচ সেই মানুষটাই এখন বলছে, আমি নাকি তাকে ভালোবাসি না! ভালোবাসলে নাকি সবকিছু ফেলে তার কাছে ফিরে যেতাম। কিন্তু কেউ কি একবারও ভেবে দেখে, একটা মেয়ে কেন নিজের সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িতে ফিরে আসে? সে কি শখ করে নিজের সংসার ছেড়ে আসে, নাকি দিনের পর দিন সহ্য করতে করতে একসময় আর পারে না?

Manual1 Ad Code

আমি জানি, সংসারে মানিয়ে নিতে হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়, শ্বশুরবাড়িতে দায়িত্বও থাকে। কিন্তু মানিয়ে নেওয়ার অর্থ কি নির্যাতন সহ্য করা? ভালোবাসার অর্থ কি নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখা? একজন স্ত্রী অসুস্থ হলে তার পাশে দাঁড়ানো কি স্বামীর দায়িত্ব নয়? আর যে মানুষটি নিজের পছন্দে বিয়ে করে এসেছে, তার নিরাপত্তা ও সম্মানের দায়িত্ব কি স্বামীর নেই?

Manual6 Ad Code

আজ আমি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে একদিকে ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে আসার যন্ত্রণা, অন্যদিকে সেই মানুষটির কাছে ফিরে গিয়ে আবারও একই কষ্ট পাওয়ার ভয়। আমি তাকে ভালোবাসি, কিন্তু এই সম্পর্কের মধ্যে থেকে যদি সারাজীবন এভাবেই কষ্ট পেতে হয়, তাহলে আমার ভবিষ্যৎ কী? আমি কি শুধু সংসার টিকিয়ে রাখার জন্য নিজের জীবনটা শেষ করে দেব? নাকি নিজের সম্মান ও নিরাপত্তার কথা ভেবে কঠিন কোনো সিদ্ধান্ত নেব?

আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন একজন নারী কি নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে বলে সারাজীবন সব অন্যায় সহ্য করতে বাধ্য? স্বামী ভালোবাসার দাবি করলেই কি স্ত্রীর কষ্ট, অপমান আর গায়ে হাত তোলার ঘটনাগুলো ভুলে যাওয়া উচিত? নাকি একজন নারীরও অধিকার আছে এমন একটা সংসার চাওয়ার, যেখানে তাকে কাজের মানুষ নয়, পরিবারের সদস্য হিসেবে দেখা হবে; যেখানে অসুস্থ হলে যত্ন পাবে, কষ্ট পেলে পাশে কাউকে পাবে, আর নিজের স্বামীর কাছেই নিরাপদ বোধ করবে?

আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না, আমার এখন কী করা উচিত। ভালোবাসার মানুষটিকে ছেড়ে যাওয়ার সাহস পাচ্ছি না, আবার এভাবে ফিরে গিয়ে সারাজীবন কষ্ট সহ্য করার শক্তিও খুঁজে পাচ্ছি না। অভিজ্ঞ ভাই-বোনদের কাছে অনুরোধ, আমাকে বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিন। আবেগ দিয়ে নয়, একজন নারীর ভবিষ্যৎ, সম্মান ও নিরাপত্তার কথা ভেবে বলুন এই পরিস্থিতিতে আমার কী করা উচিত?

—নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নববিবাহিত নারী।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ