মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এখন মুক্তিযোদ্ধার কবর পরিবারের নারীরা খুঁড়ছেন!

প্রকাশিত: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২৭, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের সময় এবং এখন মুক্তিযোদ্ধার কবর পরিবারের নারীরা খুঁড়ছেন!

Manual8 Ad Code

শরীফ শমশির |

১৯৭১ সালের ৩০ শে মার্চে চট্টগ্রামে মনি ইমাম এবং তাঁর বোন রওশন আরা মোস্তফা ঘরের আঙিনায় খুঁড়েছিলেন আপন আপন স্বামী কাজী আলী ইমাম ও ডা. গোলাম মোস্তফার কবর!

Manual7 Ad Code

কি অদ্ভুত পরিহাস! স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পর মাঝরাতে মোবাইলের আলোয় একজন মুক্তিযোদ্ধার কবর খুঁড়লেন কন্যা ও দুই বোন!

স্বাধীনতার পর বাঁধা দিয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও তার দোসর বিহারীরা আর আজ স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী একটা রাজনৈতিক দল!

Manual4 Ad Code

গত ২৪-২৫ তারিখের ঘটনাটা পড়তে পড়তে ১৯৭১ সালের ঘটনাটা মনে পড়লো!
বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা লেখিকা বেগম মুশতারী শফীর একটা গ্রন্থ আছে, ‘মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রামের নারী’। এটা সাক্ষাতকারের ভিত্তিতে লেখা একটা গবেষণা গ্রন্থ। ১৯৯২ সালে প্রথম এই গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তারপর বেশ কয়েকটি সংস্করণ হয়। এই গ্রন্থটিতে প্রায় পনের জনের অধিক মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ও মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার রয়েছে। তাদেরই একজন মনি ইমাম। সংক্ষেপে উল্লেখ করছি কীভাবে মনি ইমামের পরিবার নিহতদের কবর খুঁড়েছিলেন:

Manual2 Ad Code

১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী শুধু ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটের মাধ্যমে বাঙালিদের উপর বর্বর গণহত্যা শুরু করে তা নয় চট্টগ্রামেও তারা গণহত্যা শুরু করে। মনি ইমামরা থাকতেন লালখান বাজার। তখনকার শামসী কলোনির বিহারিরাও বাঙালিদের হত্যা শুরু করেছিল। এই পরিস্থিতিতে মনি ইমাম বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে চাইলেও তাঁর স্বামী কাজী আলী ইমাম রাজি হলেন না। এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে তাঁর বাসায় উঠে আসেন ছোট বোন রওশন আরা ও জেরিন। রওশন আরার বাসাও ছিল চট্টগ্রামের লালখান বাজার। রওশন আরার স্বামী বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফা। এদিকে বিহারিরা এই এলাকায় চার পাঁচটা বাঙালি পরিবারের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। মনি ইমামরা তবুও গেলেন না। বাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। হুমকি আসছে। এইসময় দুজন আহত পুলিশ সদস্য বাড়িতে ঢুকে পড়লে ডা. গোলাম মোস্তফা তাঁদের চিকিৎসা দিলেন। এদিকে ২৭ -২৮ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রায় পুরো চট্টগ্রাম দখলে নেয় এবং গণহত্যা চালাতে থাকে।
৩০শে মার্চ, ১৯৭১ সকালে বাসা থেকে একজন গৃহকর্মীকে ওয়াসার মোড়ে পানি আনতে পাঠানো হলো। তার আসতে দেরি দেখে কাজী আলী ইমাম নিজেই গেলেন ছেলেটার খোঁজ নিতে। তাঁর দেখাদেখি তাঁর ভায়রা ডা. গোলাম মোস্তফাও প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতে বের হলেন। এর পনের মিনিট পরেই শোনা গেলো এক ঝাঁক গুলির শব্দ।
এই শব্দের পর মনি ইমাম, রওশন আরা, জেরিন সহ পরিবারের পুরুষ সদস্য এমনি তাদের মা- ও ইমাম ও মোস্তফার সন্ধানে বের হলেন। হাইলেভেল রোডের মুখে কালভার্টের কাছে ৮-১০ জনের লাশের মধ্যে পাওয়া গেলো মনি ইমাম এবং গোলাম মোস্তফার লাশ। বৃদ্ধা মা চিৎকার করে দুই জনের লাশ তাঁর বুকে নিলেন। তারপর নারীরা সকলে মিলে দু’জনের লাশ ঘরে আনলেন। আলী ইমামের গুলি লেগেছিল পিঠে, গোলাম মোস্তফার মাথায়। উভয়ের শরীর বিভৎস হয়ে পড়েছিল। লাশগুলো এনে বৃদ্ধা মায়ের সাদা পরনের কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো।
এরমধ্যেই পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও দোসররা এসে দরজা ভেঙে লাশ দুটি নিয়ে যেতে চাপ দিচ্ছিল। মায়ের কান্না, অনুনয় ও প্রতিরোধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা ফিরে যায় তবে তারা শর্ত দেয় লাশ কোথাও নেওয়া যাবে না। আর বলেছিল, তোমারা বাঙালি। তোমাদের লাশ কবর দিতে দেওয়া হবে না। তখন বৃদ্ধা মা বললেন, ঠিক আছে, তবে আমাদের কোরআন পড়তে দাও। দিন পার হয়ে সন্ধ্যা হলো। এরমধ্যে তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, যা থাকে কপালে, লাশ বাইরে নিতে দেবে না, উঠোনে কবর দেবেন।
তারপর তাঁরা ঘরে সংরক্ষিত সামান্য তোলা পানিতে লাশ দুটি ধুয়ে মায়ের বিছানার ধোয়া সাদা চাদর দিয়ে জড়িয়ে দিলেন।
বাসায় কবর খোঁড়ার কোদাল নেই। মনি ইমাম সহ সবাই রান্না ঘরের দা, বটি, খুন্তি, বড় চামচ দিয়ে করব খুঁড়লেন। মাত্র দেড় হাত গর্ত করে দুটি কবর প্রস্তুত করলেন। তারপর তাঁরা নিজ নিজ হাতে অতি আপনজনদের সেই গর্তে শুইয়ে দিয়ে মাটি চাপা দেন। তবুও লাশ পাকিস্তানীদের দেয়নি।
মনি ইমাম এইসব নির্মম হত্যাকান্ড এবং অসীম সাহসে নারীরা কীভাবে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রেখেছিল তা বর্ণনা করে অভিমানে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।
অভিমান তো হওয়ারই কথা। আমরাতো মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করতে পারিনি। তাই আজ পঞ্চান্ন বছর পর আবারও তিনজন নারীকে করব খুঁড়ে এক মুক্তিযোদ্ধা আপনজনকে কবরস্থ করতে হলো।
দেশকে মুক্ত রাখতে যখন পুরুষ অসহায় হয় তখন নারীরা সেই যুদ্ধকে টেনে নিয়ে যায়।
ইতিহাস ফিরে ফিরে আসে!
#
শরীফ শমশির
লেখক ও গবেষক।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ