সিলেট ২৮শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১২ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৬
আপিল বিভাগের রায়ে আলোচিত সাক্ষ্য ও পর্যবেক্ষণে উঠে আসে হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৮ অক্টোবর ২০২৬ : দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর যুদ্ধাপরাধ মামলার চূড়ান্ত আপিল রায়টি নিয়ে যদি ব্যবচ্ছেদ করা হয়, তবে সেখানে এক অবিশ্বাস্য প্যারাডক্স বা আত্মঘাতী সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। আমরা সবাই জানি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানান তর্ক-বিতর্ক, পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড রক্ষা করতে না পারা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের গুরুতর অভিযোগ ছিল। এই বিচারিক প্রক্রিয়ার বহু দুর্বলতা নিয়ে আইনজ্ঞদের ভেতরেও গভীর অসন্তোষ রয়েছে।
১.
সাইদীর মামলার সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক অধ্যায়টি অন্য জায়গায়। আপনি যদি ট্রাইব্যুনাল বা আপিল বিভাগের দেওয়া রায়ের ভেতর থেকে রাষ্ট্রপক্ষের সমস্ত বয়ান, প্রসিকিউশনের আনা সাক্ষ্য-প্রমাণ, সব আইনের বিশ্লেষণ এবং বিচারকদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণগুলো সম্পূর্ণভাবে ছেঁটে ফেলেন— কেবল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জামায়াতের নিযুক্ত শীর্ষ আইনজীবীরা তাদের দলীয় নেতাকে বাঁচাতে যে তথ্য-উপাত্ত আর সাক্ষী হাজির করেছিলেন, শুধু সেইটুকুর একটা সংকলন তৈরি করেন, তবে যে কেউ আঁতকে উঠবেন।
আজকের দিনের ৯৯ ভাগ জামায়াত নেতাকর্মী বা সমর্থক নিজেদের দলের আইনজীবীদের তৈরি করা একাত্তরের সেই রক্তাক্ত দলিল কোনো অবস্থাতেই হজম করতে পারবেন না।
কারণ সাঈদীকে সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায় থেকে মুক্ত করতে গিয়ে ডিফেন্স টিম নিজেরাই আদালতে সুচারুভাবে প্রমাণ করে দিয়ে গেছে যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আর তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার ও শান্তি কমিটি মিলে পিরোজপুরের পাড়েরহাট এলাকায় কী ভয়াবহ ও বেরহম গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটতরাজ, অগ্নিসংযোগ এবং জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণের নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল।
২.
আইনশাস্ত্রের একটা সাধারণ নিয়ম হলো, যখন কোনো আসামি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করার পাশাপাশি ‘অ্যালাইবাই’ বা ঘটনাস্থলে অনুপস্থিতির যুক্তি দেয়, তখন সে অবধারিতভাবেই ধরে নেয় যে অপরাধের ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে, শুধু সেই মুহূর্তে সে সেখানে উপস্থিত ছিল না। সাঈদীর আইনজীবীরা মূলত এই কৌশলেই মামলা লড়েছিলেন। তারা আদালতকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, ১৯৭১ সালের মে থেকে জুলাই মাসের ভেতরে পিরোজপুরের পাড়েরহাট, বাদুড়িয়া, চিতলিয়া কিংবা উমেদপুরে যে রক্তবন্যা বয়ে গিয়েছিল, যেসব বাড়িঘর জ্বালিয়ে ছারখার করা হয়েছিল—তা ধ্রুব সত্য, কিন্তু দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী তখন সেখানে ছিলেন না; তিনি যশোরে অবস্থান করছিলেন।
আর এই অনুপস্থিতি প্রমাণ করার তাগিদে এবং সাঈদীর কাঁধ থেকে দায় সরিয়ে অন্যের ঘাড়ে চাপানোর উদ্দেশ্যে জামায়াতের আইনজীবীরা স্থানীয় রাজাকার ও শান্তি কমিটির একের পর এক অপরাধের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ এবং লোমহর্ষক বিবরণ আদালতের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যা রাষ্ট্রপক্ষের আনা বিবরণকেও হার মানায়।
এই অদ্ভুত দৃশ্যটি লক্ষ্য করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা— স্বৈরাচারী খুনি শেখ হাসিনা যাকে পরবর্তীতে পদত্যাগে বাধ্য করে দেশছাড়া করেছিলেন— সিনহা তার রায়ে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন। বিচারপতি সিনহা লক্ষ্য করেন, প্রসিকিউশন পক্ষ একটা নির্দিষ্ট গণহত্যার ঘটনায় স্থানীয় শান্তি কমিটি ও রাজাকার বাহিনীর যে সমস্ত খুনির নাম বলেছে, আসামিপক্ষের নিজস্ব সাক্ষীরাও কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ঠিক হুবহু একই নামগুলো উচ্চারণ করেছেন। সিকান্দার শিকদার, দানেশ মোল্লা, মাওলানা মোসলেম উদ্দিন, হাজী আব্দুল গনি গাজী, শফিজউদ্দিন মৌলভী কিংবা আসমেত আলী মুন্সীর মতো স্থানীয় নরঘাতকদের নাম রাষ্ট্রপক্ষ এবং আসামিপক্ষ—উভয়ের মুখ থেকেই সমানভাবে এসেছে। দুই পক্ষের তালিকায় শুধু একটিমাত্র নামের গরমিল ছিল, আর তা হলো সাঈদীর নাম।
ডিফেন্সের চেষ্টা ছিল এটা দেখানো যে, অপরাধের মূল হোতা বা মাস্টারমাইন্ড ছিল এই লোকগুলো, এদের সাথে সাঈদী ছিলেন না। কিন্তু এই ‘বস বাঁচাও’ তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জামায়াতের আইনজীবীরা প্রকারান্তরে আদালতের কাছে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবুল করে নিয়েছেন যে, এই শান্তি কমিটি ও রাজাকাররাই ১৯৭১ সালে পিরোজপুরের প্রত্যন্ত জনপদে সুসংগঠিতভাবে রাষ্ট্রীয় মদদে চরমতম মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছিল।
ডিফেন্সের অর্থাৎ সাইদীর পক্ষের নিজস্ব সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরাগুলো একটু গভীরভাবে পাঠ করলেই বেরিয়ে আসে জামায়াতের নিজস্ব বয়ানে তৈরি একাত্তরের ভয়াল চালচিত্র।
ডিফেন্সের অর্থাৎ সাইদীর পক্ষের তিন নম্বর সাক্ষী নুরুল হক হাওলাদার আদালতে দাঁড়িয়ে নির্দ্বিধায় স্বীকার করে গেছেন যে, একাত্তরের বৈশাখ মাসের শেষ দিকে পাকিস্তানি সেনারা পাড়েরহাটে এসে মাখন সাহা, মদন সাহা, নারায়ণ সাহা, বিজয় মাস্টার এবং গৌরাঙ্গ পালের মতো সংখ্যালঘু হিন্দু ব্যবসায়ীদের দোকানপাট নির্মমভাবে লুট করেছিল। শুধু তা-ই নয়, পরের দিনই নুরু খানের বাড়িতে কীভাবে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই আগুনের কালো ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল, তার রোমহর্ষক বিবরণ আসামিপক্ষের এই সাক্ষী নিজেই দিয়ে গেছেন।
৩.
একই ডিফেন্স সাক্ষী আদালতকে আরও জানিয়েছেন, পাড়েরহাটের ত্রাস রাজাকার মোসলেম মাওলানা স্থানীয় সংখ্যালঘু হিন্দু বিপথ সাহার বাড়িতে টানা আট মাস ধরে জবরদখল করে বাস করত এবং তার মেয়ে ভানু সাহাকে আটকে রেখেছিল।
ডিফেন্স পক্ষ দাবি করার চেষ্টা করেছিল মোসলেম নাকি ভানু সাহাকে ‘বিয়ে’ করেছিল, কিন্তু যুদ্ধাবস্থায় এক সংখ্যালঘু পরিবারের বাড়ি দখল করে তাদের মেয়েকে আটকে রাখার এই তথ্য আদালতের নথিতে জামায়াতই স্থায়ীভাবে খোদাই করে দিয়ে গেছে। এমনকি এই সাক্ষী এটাও স্বীকার করেছেন যে, নির্যাতিত গৌরাঙ্গ সাহা একাত্তরেই তার কাছে নালিশ করেছিলেন পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তুলে নিয়ে গিয়ে তার বোনদের ওপর তিন দিন ধরে দলবদ্ধ পাশবিক ধর্ষণ চালানো হয়েছিল।
একাত্তরে হিন্দু নিধন ও তাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার যে আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল, সাঈদীকে সেই অভিযোগ থেকে বাঁচাতে গিয়ে ডিফেন্স সাক্ষী নুরুল হক হাওলাদার এমন এক বয়ান দিয়ে বসেন যা যেকোনো সভ্য মানুষের মেরুদণ্ড দিয়ে শীতল স্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো।
তিনি আদালতে জানান, যেসব হিন্দু ধর্ম পরিবর্তন করে মুসলমান হয়েছিল, তারা যদি মুসলমান না হতো তবে তাদের নিশ্চিতভাবে হত্যা করা হতো। পাকিস্তানি সেনারা তো হিন্দু চিনত না, স্থানীয় শান্তি কমিটির নেতারাই মূলত বাড়ি বাড়ি গিয়ে হিন্দুদের শনাক্ত করে দিত এবং পাকিস্তানি মিলিটারির মাধ্যমে হত্যাযজ্ঞ চালাত। আর ঠিক সেই নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে হিন্দুরা ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল।
অর্থাৎ, একাত্তরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের নীতি যে ছিল সুনির্দিষ্টভাবে একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করা এবং শান্তি কমিটি যে সেই জাতিগত নিধনের প্রধান পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করছিল—তা কোনো প্রোপাগান্ডা নয়, জামায়াতের নিজস্ব সাক্ষীর মুখ থেকেই আদালতে অন-রেকর্ড স্বীকারোক্তি হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।
একইভাবে আট নম্বর অভিযোগে বর্ণিত ইব্রাহিম কুট্টি হত্যাকাণ্ডটির দিকে তাকালে দেখা যায়, সাঈদী যে কুট্টি হত্যা করেননি তা প্রমাণ করতে ডিফেন্স কাঠগড়ায় দাঁড় করায় দুই নম্বর সাক্ষী আব্দুর রাজ্জাক আকন্দ, সাত নম্বর সাক্ষী জামাল হোসেন ফকির এবং এগারো নম্বর সাক্ষী গোলাম মোস্তফাকে। এই তিন ডিফেন্স সাক্ষীর ভাষ্য বিশ্লেষণ করলে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়।
তারা কেউই হত্যাকাণ্ডকে অস্বীকার করেননি, বরং তারা আদালতের সামনে একাত্তরের এক নারকীয় সকালের বর্ণনা দিয়েছেন। তারা বলেছেন, ফজরের ঠিক আগে তারা প্রচণ্ড গুলির শব্দ শোনেন এবং খালের ঘাটে গিয়ে দেখতে পান একটি নৌকায় হাত-পা বাঁধা রক্তাক্ত কুতীর লাশ নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, আর সেই নৌকায় ছিল দানেশ মোল্লা, সেকেন্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা, রুহুল আমিন এবং আইয়ুব আলী চৌকিদারের মতো রাজাকাররা।
অপর একটি নৌকায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য সাহেব আলী ও তার মাকে হাত পেছমোড়া করে বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, যাদের পরবর্তীতে ক্যাম্পে নিয়ে হত্যা করা হয়। কুতীর বাড়িতে গিয়ে তারা দেখতে পান কুতীর স্ত্রী মমতাজ বেগম গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন এবং তার বোন ক্ষতস্থানে কাপড় বাঁধছেন। ডিফেন্সের নিজস্ব সাক্ষীদের দেওয়া এই সাক্ষ্যই চিরতরে প্রমাণ করে দেয় যে, পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকাররা একাত্তরে কীভাবে সাধারণ নিরস্ত্র মানুষের ঘরে ঢুকে ভোরবেলা গুলি করে মানুষ মারত এবং লাশ নৌকায় তুলে নিয়ে নদীতে ভাসিয়ে দিত।
৪.
উমেদপুর হিন্দু পাড়ায় আগুন দেওয়া এবং অসুস্থ বিসাবলীকে নারিকেল গাছের সাথে বেঁধে হত্যার ঘটনায় সাঈদীর সম্পৃক্ততা কাটাতে এসে ডিফেন্সের নয় নম্বর সাক্ষী হেমায়েত উদ্দিন বর্ণনা করেন, কীভাবে জ্যৈষ্ঠ মাসের এক সকালে ১৫-১৬ জন পাকিস্তানি সেনাকে সাথে নিয়ে মোসলেম মাওলানা, দানেশ মোল্লা ও সিকান্দার শিকদারের রাজাকার বাহিনী হিন্দু পাড়ায় অতর্কিত আক্রমণ চালায়। চারপাশের বাড়িঘরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে এবং অসুস্থতার কারণে পালাতে না পারা বিসাবলীকে ধরে নিয়ে গিয়ে অন্যান্য ৪-৫ জন হিন্দু নাগরিকের সাথে বলেশ্বর নদীর তীরে ব্রাশফায়ারে হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ভাগীরথী নামের এক নারীকে পাকিস্তানি সেনারা কীভাবে পৈশাচিক নির্যাতন করে মেরেছিল, তা বলতে গিয়ে ডিফেন্সের দশ নম্বর সাক্ষী আনোয়ার হোসেন এবং খোদ ভাগীরথীর ছেলে গণেশ চন্দ্র সাহা (ডিফেন্স উইটনেস ১৭) আদালতে স্বীকার করেন যে, ভাগীরথীকে জীবন্ত অবস্থায় একটি পাকিস্তানি জিপের পেছনে দড়ি দিয়ে বেঁধে পিচঢালা রাস্তায় টেনে-হিঁচড়ে শরীর ছিন্নভিন্ন করে হত্যা করা হয়েছিল।
এখানেই শেষ নয়। সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী ডিফেন্সের তেরো নম্বর সাক্ষী হিসেবে নিজের বাবার পক্ষে যেসব বইপত্র ও ঐতিহাসিক দলিল আদালতে প্রদর্শন করেছিলেন, তার ভেতর ছিল হাসান হাফিজুর রহমান সম্পাদিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ এবং সেক্টর কমান্ডার মেজর জিয়াউদ্দিনের লেখা যুদ্ধস্মৃতিকথা। সাঈদী যে কোনো প্রামাণ্য নথিতে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত হননি, এটা প্রমাণ করার তাগিদে ডিফেন্সের দাখিল করা মেজর জিয়াউদ্দিনের বইয়ের ১১৫ পৃষ্ঠায় স্পষ্ট লেখা ছিল: “আমাদের খুব বেশি আশঙ্কা ছিল যে, পাকিস্তানী হানাদার গোষ্ঠী এবং জামায়াতে ইসলামী-মুসলিম লীগের মীরজাফররা এক পর্যায়ে আমাদের ওপর নাপাম বোমার আক্রমণ পরিচালনা করবে।”
অর্থাৎ একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক অবস্থান যে দেশদ্রোহী, মানবতাবিরোধী এবং পাকিস্তানি ঘাতকদের প্রত্যক্ষ সহযোগী ছিল—তা প্রমাণের জন্য প্রসিকিউশনকে অতিরিক্ত কোনো কসরত করতে হয়নি; আসামিপক্ষ নিজেই তাদের নেতার জীবন রক্ষার তাগিদে সেই দলিল আদালতের টেবিলে ফাইলবন্দি করে দিয়ে গেছে।
৫.
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস হলো, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত পাঁচ দশক ধরে জামায়াত তাদের তরুণ সমর্থকদের মগজে এই বয়ান গেঁথে দেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা করেছে যে—একাত্তরে গণহত্যা হয়নি, কোনো নারী নির্যাতন হয়নি, যা হয়েছে তা নিছক রাজনৈতিক গৃহযুদ্ধ আর ভারতীয় চক্রান্ত, এবং ট্রাইব্যুনালের সমস্ত অভিযোগই নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ‘বানানো গল্প’।
অথচ জামায়াতের শীর্ষ আইনজীবীরা আদালতে দাঁড়িয়ে একাত্তরের প্রতিটি গণহত্যা, প্রতিটি গ্রামের অগ্নিসংযোগ, প্রতিটি সংখ্যালঘু নিধনের রক্তাক্ত বাস্তবতাকে একে একে কবুল করে গেছেন। তারা শুধু বলেছেন, “অপরাধগুলো সত্য, কিন্তু সাঈদী করেনি; করেছে আমাদের বাকি রাজাকার ও শান্তি কমিটির ভাইয়েরা।”
রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি, সাক্ষ্য কিংবা ট্রাইব্যুনালের হাজারো সীমাবদ্ধতাকে সম্পূর্ণ ছুড়ে ফেলে দিলেও, জামায়াতের নিজস্ব আইনজীবীদের উপস্থাপন করা তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে যে রক্তাক্ত, নারকীয় একাত্তরের ইতিহাস দৃশ্যমান হয়— আজকের দিনের যেকোনো অন্ধ জামায়াত সমর্থকের জন্য সেই সত্যের মুখোমুখি হওয়া প্রায় অসম্ভব।
#
প্রতিবেদন সংক্রান্ত নোট:
যে বিষয়গুলো যাচাই করা জরুরি
১. আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়: ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বরের রায়ের সংশ্লিষ্ট অংশ থেকে বিচারপতি এস কে সিনহার পর্যবেক্ষণের হুবহু ভাষা ও পৃষ্ঠা নম্বর।
২. সাক্ষীদের পরিচয় ও নম্বর: নুরুল হক হাওলাদার, আব্দুর রাজ্জাক আকন্দ, জামাল হোসেন ফকির, গোলাম মোস্তফা, হেমায়েত উদ্দিন ও অন্য সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জেরার সঙ্গে প্রতিবেদনটি মিলিয়ে নিতে হবে।
৩. অভিযোগ ও চূড়ান্ত রায়ের পার্থক্য: কোন অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল কী সিদ্ধান্ত দিয়েছিল এবং আপিল বিভাগ কোন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বা বহাল রেখেছিল, তা পরবর্তী প্রতিবেদনে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হবে।
৪. সরাসরি উদ্ধৃতি: মেজর জিয়াউদ্দিনের বইয়ের উদ্ধৃতিসহ যেকোনো উদ্ধৃতি মূল নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে হবে।
৫. শিরোনামের নিরপেক্ষতা: জাতীয় পত্রিকার সংবাদ প্রতিবেদনে ‘নিজস্ব সাক্ষ্যেই অপরাধ স্বীকার’ বা ‘জামায়াতের স্বীকারোক্তি’ ধরনের শিরোনাম এড়িয়ে চলা ভালো, কারণ সাক্ষীদের বক্তব্যকে দলীয় স্বীকারোক্তি হিসেবে দেখানো অতিরঞ্জিত হতে পারে।
সম্পাদকীয় নোট:
এই প্রতিবেদনটির সবচেয়ে শক্তিশালী সংবাদমূল্য হলো—আসামিপক্ষের সাক্ষ্যেও একাত্তরের পিরোজপুর অঞ্চলের সহিংসতার যেসব বিবরণ উঠে এসেছে, সেগুলোর সঙ্গে আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণের সম্পর্ক। মূল রায় ও সাক্ষ্য থেকে সুনির্দিষ্ট উদ্ধৃতি, পৃষ্ঠা নম্বর এবং অভিযোগভিত্তিক বিচারিক সিদ্ধান্ত যুক্ত করা গেলে প্রতিবেদনটি আরও শক্তিশালী হতো।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি