২৪ বছরেও রানার সম্পাদক মুকুল হত্যার বিচার হয়নি

প্রকাশিত: ১০:৫৪ পূর্বাহ্ণ, আগস্ট ২৯, ২০২২

২৪ বছরেও রানার সম্পাদক মুকুল হত্যার বিচার হয়নি

Manual1 Ad Code

রেজাউল ইসলাম |

দীর্ঘ ২৪ বছরেও তৎকালীন সাহসী সাংবাদিক যশোরের দৈনিক রানার সম্পাদক আর এম সাইফুল আলম মুকুল হত্যার বিচার হলোনা। ১৯৯৮ সালের ৩০ আগষ্ট গভীর রাতে যশোর শহরে চিরুনিকলের সামনে সন্ত্রাসীরা খুব কাছ থেকে তাকে বোমা হমলায় নিহত করে। এ সময় তিনি পত্রিকা অফিস থেকে কাজ শেষে রিক্সাযোগে বাসায় ফিরছিলেন। বোমার কয়েকটি স্পিল্নিটার তার বুকে বিদ্ধ হয়। তার অনেক আগে থেকে এবং এ হত্যাকান্ডের পরও দির্ঘদিন যাবৎ দৈনিক রানার বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের সাহসী ও জনপ্রীয় পত্রিকা ছিল। যতবড় অন্যায়-দূর্নীতির খবরই হোক রানার ছাপতে কখনো পিছপা হয়নি। মুকুল ভাই নিজেও খুব সাহসের সাথে সম্পাদকীয় এবং কলাম লিখতেন। এ কারনেই সন্ত্রাসীরা গভীর চক্রান্ত করে তাকে অকালে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়। তখনকার সরকার এ হত্যাকান্ডের সঠিক বিচারের আশ্বাস দিয়েছিল।
পরবর্তীতে কয়েকবার সরকার অদল-বদল হয়েছে। মাঝখানে সেনা সমর্থিত ফখরুদ্দিনের তত্বাবধায়ক সরকারও ছিল ২ বছর। কিন্ত কেউ মুকুল হত্যার সঠিক বিচারের উদ্যেগ নেয়নি। বরং রাজনৈতিক সরকার গুলো মুকুল হত্যা মামলার কল-কাঠি নেড়ে বিচারের পথ অনেকটা রুদ্ধ করেছে। মামলার তদন্তও ঘুরিয়েছে নিজেদের মতো করে। মুকুল হত্যার সুষ্ঠু বিচার আজ রাজনৈতিক ঘুর-প্যাচে বন্দী। বিচার পায়নে বলে হত্যাবার্ষিকীতে যশোরবাসী আগের মতো বড় বড় কর্মসূচী নিয়ে আর মুকুল হত্যার বিচার দাবী করে না। তারা মনে করে এ হত্যার বিচার আর হয়তো হবেনা। এখন ছোট কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে দাবী করে। যশোরের অপর সাংবাদিক জনকন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামসুর রহমান কেবল হত্যা মামলার বিচারের অবস্হাও একই পথে।
১৯৯৯ সালে কালীগঞ্জ (ঝিনেদা) জাতীয় সাংবাদিক সংস্হার পক্ষথেকে সাধারন সম্পাদক হিসেবে মুকুল হত্যার বিচারের দাবীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর আমি স্মারকলিপিও দিয়েছিলাম। সেই প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাই ২০০৯ সাল থেকে এখনো একটানা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।
আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আমার আবারো জোরালো দাবী আপনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন, যুদ্ধাপরাধী হত্যার বিচার করেছেন, বোমা-গ্রেনেড হামলার বিচার করেছেন, আপনার পক্ষেয় মুকুল ও শামসুর রহমান হত্যার বিচার সম্ভব। যশোরের এ দুই অকুতোভয় সাহসী সিনিয়র সাংবাদিক হত্যার বিচার না হলে আমারা বিচার হীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসেছি একথা পরিপূর্ণতা পাবে না।

Manual5 Ad Code

মুকুল ভায়ের সাথে পরিচয় আমার ১৯৮৫ সাল থেকে। ওয়ার্কার্স পার্টি সমর্থিত গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন করার কারনে মুকুল ভায়ের সাথে আমার অনেকটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও হয়েছিল। যশোর জেলা তৎকলীন ওয়ার্কার্স পার্টি সম্পাদক নুরুল আলম ভায়ের দৈনিক দেশহিতৈষী অফিসে মুকুল ভায়ের সাথে প্রয়ই দেখা হতো। তিনি নিজেও অনেক দিন ওয়ার্কার্স পার্টির সদস্য ছিলেন। আমার সাংবাদিকতার হাতেখড়িও মুকুল ভায়ের মাধ্যমে দৈনিক রানারেই। প্রেসবিজ্ঞপ্তি পাঠানোর মধ্য দিয়ে। ছাত্র সংগঠন ও পার্টির যেকোন কর্মসূচীর প্রেসবিজ্ঞপ্তি বা নিউজ পাঠিয়ে দিলে মুকুল ভাই গুরুত্ব সহকারে রানারে ছেপে দিতেন।
মুকুল ভাই নিহত হবার পরদিন আমি সকালে কালীগঞ্জে বাড়ীর ছোলা ও মসুরি বিক্রি করতে গিয়ে সংবাদ পেলাম। বিক্রি শেষেই লুঙ্গি পরা অবস্হায় বাসে চেপে মুকুল ভায়ের বাসায় পৌছালাম। তখন মুকুল ভায়ের নিথর দেহ গোসলের জন্য কলপাড়ে নেয়া হয়েছে। দেখলাম বুকে স্পিলিন্টার লাগা জায়গা দিকে তখনো হালকা রক্ত বের হচ্ছে। বাসার বাইরে শ্রদ্ধেয় নুরুল আলম ভাইসহ অসংখ্য লোক। সবার চোখে পানি, বুকে বেদনা। পরে একবার কালীগঞ্জ প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে মুকুল ভায়ের কবর জিয়ারত করতে গিয়েছিলাম। সাইফুল আলম মুকুল ও শামসুর রহমান কেবল হত্যা এবং তাদের হত্যাকান্ডের বিচারহীনতায় দক্ষিণাঞ্চলে এমন সাহসী সাংবাদিক তৈরির পথ রুদ্ধ হয়ে আছে। এ পথ থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
মুকুল ভায়ের পিতা গোলাম মাজেদও দৈনিক রানারের সম্পাদক ছিলেন। স্বৈরশাষক এরশাদের বিরুদ্ধে লেখায় তাকে জেলে ঢুকিয়ে চরম নির্যাতন করা হয়। এ নির্যাতনের কারনেই পরবর্তিতে জেল থেকে ছাড়া পেলেও তিনি ধীরে ধীরে মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর মুকুল ভাই রানার সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। পরে মুকুল ভায়ের ছেলেরও অস্বাভাবিক অবস্হায় বাসার বাথরুম থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছিল। মুকুল ভাই হত্যাকান্ডের পর তার ছোটভাই আরএম টুটুল রানার সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহন করেন। ব্যাবসায়ীক কাজে নোয়াপাড়ায় অবস্হান কালে তারও অস্বভাবিক মৃত্যু হয় হয়। পত্রিকা ও সাহসী সাংবাদিকতার কারনে একটি বংশের পুরুষ সন্তানগুলো অকালে হারিয়ে গেল। যা বড়ই দু:খজনক ও বেদনাদায়ক।
আজকের এই দিনে আবারো সাহসী সাংবাদিক মুকুল ভাইসহ সকল সাংবাদিক হত্যার জোরালো বিচার দাবী করছি। সেইসাথে সকল শহীদ সাংবাদিকদের প্রতি রইল হাজারো সালাম ও বিনম্র শ্রদ্ধা।
উল্লেখ্য: মুকুল ভায়ের পিতা গোলাম মাজেদও অনেকদিন ওয়ার্কার্স পার্টির সাথে যুক্ত ছিলেন।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ