সিলেট ২৪শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:০৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৭, ২০২৪
বিশেষ প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ এপ্রিল ২০২৪ : সংবিধান হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আইন। সংবিধানের ১৮ অনুচ্ছেদের ‘জনস্বাস্থ্য ও নৈতিকতা’ সংক্রান্ত ১ উপধারায় বলা হয়েছে, ‘জনগণের পুষ্টির স্তর-উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য বলিয়া গণ্য করিবেন এবং বিশেষতঃ আরোগ্যের প্রয়োজন কিংবা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট অন্যবিধ প্রয়োজন ব্যতীত মদ্য ও অন্যান্য মাদক পানীয় এবং স্বাস্থ্যহানিকর ভেষজের ব্যবহার নিষিদ্ধকরণের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন৷’- এ কারণেই দেশে এখন সরকারি-বেসরকারি মিলে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা ১৫ হাজারের বেশি। এর বাইরে ১৪ হাজার আছে কমিউনিটি ক্লিনিক। আছে পল্লি চিকিৎসকদের অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা ধরনের সেবা। ফার্মেসি থেকেও সেবা নেন বড় একাংশ মানুষ। সব মাধ্যম মিলিয়ে দেশে প্রতিদিন ৩০ লাখের বেশি মানুষ রোগী হিসেবে সেবার জন্য ছুটে বেড়ান বলে আনুমানিক তথ্য পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্র থেকে। রোগীর এই চাপ সামাল দিতে একদিকে হিমশিম অবস্থা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের। অন্যদিকে খরচের চাপ নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন রোগী ও তাদের পরিবার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের স্বাস্থ্যসেবার পরিধি ব্যাপক হলেও তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ছে দুর্নীতি, অনিয়ম, অনৈতিক বাণিজ্য, নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার কারণে। এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে দেশের স্বাস্থ্য খাতের সামর্থ্য বাড়াতে হবে। দুর্নীতি, অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রাইভেট সেক্টরে জন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য গণমুখী নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরির তাগিদও দেন কেউ কেউ। সেই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধেও আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়নেও জোর দেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই আজ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমার স্বাস্থ্য, আমার অধিকার’।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে এক বিবৃতিতে বলেছেন, স্বাস্থ্য এবং অন্যান্য মানবাধিকারের অধিকারকে এগিয়ে নিতে ডব্লিউএইচও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিশ্ব এখন রোগব্যাধি, বিপর্যয় থেকে সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনসহ একাধিক সংকটের মুখোমুখি। মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার উপলব্ধি করা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘সবার জন্য স্বাস্থ্যের অধিকার উপলব্ধি করার অর্থ হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রত্যেকে সর্বত্র উচ্চমানের স্বাস্থ্য সুবিধা, পরিষেবা এবং পণ্যগুলোর সুযোগ গ্রহণ করতে পারে; যা জনগণের চাহিদা, বোঝাপড়া এবং মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেয়।’
আঞ্চলিক পরিচালক জোর দিয়ে বলেন, স্বাস্থ্যের অধিকার পূরণের জন্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্তর্নিহিত নির্ধারক উভয়ই উপলব্ধ, প্রাপ্তিযোগ্য, গ্রহণযোগ্য এবং পর্যাপ্ত মানের হওয়া উচিত।
বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশিদ ই মাহবুব বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের স্বাস্থ্যসেবার যেমন ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে, তেমনি অনেক অব্যবস্থাপনার নজিরও মিলছে। রোগীদের আস্থার সংকটও আছে। চিকিৎসকরা একদিকে তাদের জীবন নিবেদিত করে কাজ করছেন, অন্যদিকে কিছু সংখ্যকের দায়িত্বহীনতার ফলে দায় চাপছে পুরো চিকিৎসক সমাজের ওপর। মানুষকে এখন স্বাস্থ্যসেবা কিনে নিতে হচ্ছে। মানুষ হিমশিম খাচ্ছেন খরচ মেটাতে গিয়ে। সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোতে নানা সংকট লেগেই আছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতির অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, মানুষ একদিকে যেমন সেবার জন্য ছুটে বেড়াচ্ছেন, দিনে লাখো মানুষ সেবা নিচ্ছেন, আবার তাদের আস্থার প্রশ্নটিও বড় হয়ে উঠছে দিনে দিনে। এমন অবস্থা থেকে বের হতে হলে নজর দিতে হবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসা ও ব্যবস্থাপনায় সংস্কারের দিকে। বিশেষ করে যারা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকবেন, তাদের আলাদা কাঠামোর আওতায় দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে চাকরির শুরু থেকেই। সেই সঙ্গে বেসরকারি খাতকে অবশ্যই আরও অনেক শৃঙ্খলা, সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যসূত্র অনুসারে, কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েই চলেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতায় থাকা সব প্রতিষ্ঠানে এখন সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি ঝুলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কেনাকাটায় প্রকৃত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কেনাকাটার মাধ্যমে অর্থ তসরুপের ঘটনা ঘটেছে বেশ কয়েকটি। করোনা মহামারির সময় দুর্নীতির আলোচনা সামনে চলে আসে আগের বেশ বড় বড় আলোচিত দুর্নীতির ঘটনাকে পেছনে ফেলে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় দায়ের করা মামলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছেন আদালত। গত ১ এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আস সামছ জগলুল হোসেন এ অভিযোগপত্র গ্রহণ করেন। হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ না থাকার পরও করোনাভাইরাসের নমুনা সংগ্রহ ও চিকিৎসার জন্য চুক্তি করে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০২০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর মামলাটি করে দুদক। তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ ও রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের উপপরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। এজাহারে স্বাস্থ্যের সাবেক ডিজি আবুল কালাম আজাদের নাম না থাকলেও তদন্তে প্রমাণ পেয়ে অভিযোগপত্রে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের ক্যাশ সরকারের দায়িত্ব পালনকালে গত বছরের ২৫ মে অফিস সহায়ক মো. রবিউল ইসলাম ২০২১-২২ অর্থবছরে বিল জালিয়াতির মাধ্যমে ১ কোটি ৫৩ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৬ টাকা আত্মসাতের ঘটনা অডিট টিমের নিরীক্ষাকালে ধরা পড়ে, যা পরে দুদকে মামলা হয়।
অন্যদিকে সম্প্রতি অ্যানেস্থেসিয়ার প্রভাবে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনা দেশের প্রাইভেট সেক্টরের চিকিৎসাসেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে, যা নিয়ে চিকিৎসকরাও বিব্রত। নবায়ন ছাড়াও রয়েছে এক হাজারের বেশি প্রাইভেট হাসপাতাল ক্লিনিক। এ ছাড়া রোগীদের কাছ থেকে যেনতেনভাবে টাকা আদায়ের অভিযোগ অনেক দিনের। চিকিৎসার খরচ জোগাতে গিয়ে মানুষ নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন।
গত ৩ এপ্রিল বাংলাদেশ স্মার্ট ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ নেটওয়ার্কের কর্মশালায় জানানো হয়, দেশে সর্বশেষ হিসাব অনুসারে মোট চিকিৎসা ব্যয়ের ৬৮ দশমিক ৫০ শতাংশ যায় ব্যক্তি বা পরিবারের পক্ষ থেকে। চিকিৎসা খরচ জোগাতে গিয়ে ২৪ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়েন। কেবল খরচই নয়, আছে জনবল না থাকার প্রভাবে রোগীদের হয়রানির চিত্রও।
স্মার্ট ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ নেটওয়ার্কের ওই কর্মশালার তথ্যে জানানো হয়, দেশে উপজেলায় ৭৬ শতাংশ ও জেলায় ৩৬ শতাংশ চিকিৎসকের পদ শূন্য। এ ছাড়া উপজেলায় ১৫ শতাংশ ও জেলায় ১১ শতাংশ স্টাফ নার্স, উপজেলা ৮ শতাংশ ও জেলায় ১১ শতাংশ ফার্মাসিস্টের পদ শূন্য পড়ে আছে। জানানো হয়, কেবল নার্স ও মিডওয়াইভসদের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নীতিমালা অনুসারে প্রতি এক হাজার জনসংখ্যার জন্য ৪ দশমিক ৪৫ জন থাকার কথা থাকলেও দেশে আছেন মাত্র ১ দশমিক ২৭ শতাংশ।
ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেন দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাত আরও কার্যকর করতে সবার সহযোগিতা কামনা করে বলেন, চিকিৎসক থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা এবং কর্মকর্তারা যদি আন্তরিকভাবে কাজ করেন তবে চিকিৎসার প্রতি অবশ্যই মানুষের আস্থা বাড়বে।
ওই কর্মশালার মূল প্রবন্ধে বাংলাদেশ স্মার্ট ইউনিভার্সেল হেলথ কাভারেজ নেটওয়ার্কের চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ এফ এম রুহুল হক এমপি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে বলেন, ‘আমাদের অবকাঠামো, কমিনিউটি ক্লিনিক সারা বিশ্বে অতুলনীয়। তবে আমাদের ব্যবস্থাপনায় আরও জোর দিতে হবে। রোগ প্রতিরোধে নজর বাড়াতে হবে। কমিউনিটি পর্যায় থেকে উপজেলা, উপজেলা পর্যায় থেকে জেলা, জেলা থেকে বিভাগে এবং পর্যায়ক্রমে রাজধানীতে রেফারেল সিস্টেম কার্যকর করা জরুরি।’
যদিও আগের চেয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোকে কার্যকর করার কিছু উদ্যোগ দেখা যায় সরকারের পক্ষ থেকে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুসারে ২০২৩ সালে মেডিকেল যন্ত্রপাতি মেরামতসংক্রান্ত কার্যক্রমের আওতায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ১ হাজার ৫০৮টি, জেলা সদর হাসপাতালের ৪৩৬টি, বিশেষায়িত হাসপাতালের ৯৯৮টি এবং মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১ হাজার ৪৫২টিসহ ৫১টি আইটেমের মোট ৪ হাজার ৪১৪টি যন্ত্র মেরামত করে তা সচল করা হয়েছে। মেরামত প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখার জন্য এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের কর্মকর্তাদের নিয়ে বিভাগভিত্তিক আটটি স্থায়ী টিম গঠন করা হয়েছে। পাঁচজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যন্ত্রপাতি সরঞ্জামাদি, এমএসআর ইত্যাদি সরবরাহ করা হয়েছে বলেও মন্ত্রণালয়ের তথ্যে উল্লেখ করা হয়। ওই তথ্য অনুসারে ২০১৭-২৩ সাল পর্যন্ত এক্স-রে মেশিন ১১৫টি, আলট্রাসনোগ্রাম ২৩৩টি, ইসিজি মেশিন ১৭৫টি, সেমি-অটো অ্যানালাইজার ২১৬টি, হট এয়ার স্টেরিলাইজার ৫১টি, ব্লাড ব্যাংক রেফ্রিজারেটর ৪৫টি, ডায়াথার্মি মেশিন ১৫৬টি, ফিটাল ডপলার ২০টি, আইপিএস ২০টি কেনা হয়েছে।
ওষুধের ক্ষেত্রে গত এক বছরে ৪২০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৬ আইটেমের (ইডিসিএল) ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ১ হাজার ২৮৭টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ৩৬ আইটেমের (ইডিসিএল) ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ৪৪৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪০ আইটেমের (ইমার্জেন্সি বিভাগ) ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ৪৫০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫ আইটেমের (ইডিসিএল-বহির্ভূত) ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ১ হাজার ২২৫টি উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৩ আইটেমের (ইডিসিএল) ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ৪০০টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৫ আইটেমের (ইডিসিএল-বহির্ভূত ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। আটটি (আরবান হেলথ) সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ৩৩ আইটেমের ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। ৭০টি (ট্রাইবাল হেলথ) সিভিল সার্জনের কার্যালয়ে ৩৩ আইটেমের ওষুধ সরবরাহ করা হয়েছে। এদিকে বিশ্বের কাছে মডেল হিসেবে পরিচিত মোট ১৪ হাজার ২০০টি কমিউনিটি ক্লিনিককে আরও সক্রিয় করার জন্য কাজ চলছে বলে জানানো হয় মন্ত্রণালয় থেকে। পাশাপাশি মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালগুলোয় ইনস্টিটিউশনাল প্র্যাকটিস কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্র। গত বছরের ৩০ মার্চ থেকে উপজেলা, জেলা ও টারশিয়ারি পর্যায়ে ইতোমধ্যে ১৮৩টি হাসপাতালে এ সেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি রোগ যাতে না হয়, যাতে মানুষকে হাসপাতালে যাওয়া না লাগে, চিকিৎসার খরচ যাতে কমানো যায়, সে জন্য রোগ প্রতিরোধে আরও বেশি সচেতনতা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতে বাজেট আরও বাড়ানোর।
শনিবার (৬ এপ্রিল ২০২৪) বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর এক ওয়েবিনারে জানানো হয়, সাধারণভাবে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত সোডিয়াম বা লবণ গ্রহণ, তামাকের ব্যবহার, কায়িক শ্রমের অভাব, বায়ুদূষণ প্রভৃতি কারণে বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, কিডনি রোগ, শ্বাসতন্ত্রের রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে, যা বর্তমানে দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭০ শতাংশ। তবে এসব রোগ মোকাবেলায় বাজেট বরাদ্দ খুবই সামান্য, মোট স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪.২ শতাংশ।
ওয়েবিনারে আরো জানানো হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জাতীয় বাজেটের অন্তত ১৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিলেও, ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশে এ খাতে বরাদ্দ ছিল মাত্র ৫ শতাংশ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিওএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে কম।
তারা আরও বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগে অকাল মৃত্যুর পরিমাণ এক তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যসহ অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় সরকারের কিছু নীতিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে যা পূরণ করতে প্রয়োজন এ খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ সহ অন্যান্য ভয়াবহ অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় সরকার কর্তৃক গৃহীত কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রদানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি এখাতে টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে অসংখ্য জীবন বাঁচানোসহ হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোক প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেছেন, “কেবল উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমেই অসংক্রামক রোগের প্রকোপ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ প্রদানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আসন্ন বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনগণের মধ্যে লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে আনতে হবে।”
জিএইচএআই বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেছেন, “গবেষণায় দেখা গেছে উচ্চ রক্তচাপের পরীক্ষা ও ওষুধের পিছনে ১ টাকা ব্যয় করলে সামগ্রিকভাবে ১৮ টাকার সুফল পাওয়া সম্ভব। কাজেই জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এখাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি টেকসই অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “অধিকাংশ সময় উচ্চ রক্তচাপের নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ এবং উপসর্গ থাকে না। এটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হার্ট, কিডনিসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ রোগের ঝুঁকি মোকাবিলায় গণসচেতনতা বৃদ্ধি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে দেশের সব হাসপাতাল-উপজেলা ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ফার্মেসি এবং কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে এ খাতে সরকারের বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে।”
বাজেটে স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প ও কর্মসংস্থানকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হলেও, অর্থমন্ত্রীর বাজেট প্রস্তাবনা এখনও প্রবৃদ্ধিকেন্দ্রিক বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেছেন, উন্নয়ন বিলম্ব করা যায়, কিন্তু জীবন এক লহমার জন্য থেমে থাকতে পারে না। প্রবৃদ্ধিকে মানুষের জীবনের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া সঠিক নয়। বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি পেলেও এর ৩৫ ভাগ চলে যায় সরকারি কর্মচারিদের পেনশনে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি