প্রান্তিক মানুষের সমস্যা সুনির্দিষ্ট করা ও সমাধানের দিকে আগানো জরুরি: ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৩০, ২০২৪

প্রান্তিক মানুষের সমস্যা সুনির্দিষ্ট করা ও সমাধানের দিকে আগানো জরুরি: ড. হোসেন জিল্লুর রহমান

Manual4 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল, ৩০ এপ্রিল ২০২৪ : ‘আমাদের প্রান্তিক মানুষের সমস্যা সুনির্দিষ্ট করা ও কুশলী চিন্তার মাধ্যমে সমাধানের দিকে আগানো এবং এই পদ্ধতির ধারাবাহিকতা ধরে রাখাটাও সমানভাবে জরুরি।’

মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল ২০২৪) আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস ২০২৪ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে ব্র্যাক লার্নিং সেন্টারে আয়াজিত চা শ্রমিক ও হরিজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন ও কর্মপরিবেশ শীর্ষক আলাচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান এসব কথা বলেন।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান আরও বলেন, ‘প্রান্তিকতার সবচয়ে ক্ষতিকর দিক হলো নিজকে প্রান্তিক ভাবা, ক্ষমতাহীন ভাবা। নিজেদের শক্তির বহিঃপ্রকাশের সক্ষমতা থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। এ ধরণের কাজেই সাহায্য করছে ব্রাত্যজন রিসার্স সেন্টার।’

ধারাবাহিক গবেষণার মাধ্যমে তারা এই কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে সাংবাদিকদের দায়িত্বও অনেক। এই গবেষণা তাদেরকে (সাংবাদিক) আরও সামনে এগিয়ে নিয়ে যতে হবে, মন্তব্য করেন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

ড. হোসেন জিল্লুর রহমানের সাথে।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিমুদ্দিন খান, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর শ্রীমঙ্গল এর উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান ও কমলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং ট্রেড ইউনিয়ন নেতা রামভজন কৈরি।

কাত্যিয়ানী চান্দোলার সাথে সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

আলোচনায় অংশ নেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের (বিসিএসিউ) সহ-সভাপতি জেসমিন আক্তার, ভারতের যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আইনজীবী সংগঠন নাজদীক এর উপদেষ্টা কাত্যিয়ানী চান্দোলা, বাংলাদেশ হরিজন ঐক্য পরিষদের মৌলভীবাজার শাখার সভাপতি কান্তিলাল বাসফর, হরিজন সম্প্রদায়ের নারী নেত্রী সুখন বাসফর, সাগর বাসফর, বিসিএসইউ এর ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিপেন পাল এবং কোষাধ্যক্ষ পরেশ কালিন্দি।

নৃত্যে চা শ্রমিক তিন কিশোরী।

মহান মে দিবস উপলক্ষে একদিন আগে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড), ব্রাত্যজন রিসার্স সেন্টার (বিআরসি) এবং পিপিআরসি।

Manual1 Ad Code

আলোচনা সভার মূল বিষয় ছিল, ‘চা শ্রমিক ও হরিজন পরিছন্নতা কর্মীদের ন্যায্য মজুরির প্রশ্ন ও কর্মপরিবেশ’।

অনুষ্ঠানের শুরুতে চা শ্রমিকের অধিকার নিয়ে হবিগঞ্জের দেউন্দি চা বাগানের সাংস্কৃতিক দল ‘প্রতীক থিয়েটার’ মনোরম গান, নাচ ও নাটক পরিবেশন করে।

সুনীল বিশ্বাসের পরিচালনায় প্রতীক থিয়েটার পরিবেশিত নাটক, গান ও নৃত্যে অংশ নেন আমোদ মাল, রুপম মাল, সাকিল বাউরী, সন্তোষ রায়, চন্দন মহালী, শিমুল দাস, রপিন ভৈমিক, মিলন ভৌমিক, অপু ঘোষ, বৃষ্টি রায়, বর্ষা রায়, ফারজানা সুলতানা রিয়া, মিলি ভৌমিক, সাধনা মহালী, প্রীতি মহালী ও নীলা রানী আচার্য।

ফিলিপ গাইনের সাথে চায়ের আড্ডায়।

মূল আলোচ্য বিষয়ের উপর সভার শুরুতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন সেড’র পরিচালক ফিলিপ গাইন।

তিনি বলেন, ‘শ্রমিকেরা যদি কাজ না করতো তবে আমাদের কী হতো? তারপরও তাদের প্রতি এতো বঞ্চনা। চা শ্রমিকেরা সারাদিন হাঁটেন, ঝড়-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সারাদিন দাঁড়িয়ে পাতা তুলেন। ৫-৭ টা বাগান ছাড়া কোথাও বাগানের সেকশনে তাদের জন্য নাই কোনো শৌচাগার। নিঃসন্দেহে তাদের কর্মপরিবেশ শোভন নয়। আবার শ্রীমঙ্গলে ৩৬ জন হরিজন সম্প্রদায়ের কর্মীর মাসিক বেতন ৫৫০ টাকা। এই বেতন কি ন্যায্য ও গ্রহণযাগ্য?’

বক্তব্য শেষে তিনি বিআরসি’র বিভিন্ন প্রকাশনা সবার সামনে তোলে ধরেন।

Manual3 Ad Code

কাত্যিয়ানী চান্দোলা ও সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

কাত্যিয়ানী চান্দোলা ও সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

অধ্যাপক ড. তানজিমুদ্দিন খান বলেন, ‘খাত ভিত্তিক মজুরি নির্ধারণ না করে সব ইউনিয়নের উচিৎ এক হয় একটি সর্বজনীন নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা।’

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান শ্রমিকদের উদ্যেশ্যে বলেন, ‘আপনারা নিজেরা আসেন। না পারলে বিভিন্ন সেবাদানকারী এনজিও বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নিয়ে হলেও আমাদের কাছে আসেন। আইনের দ্বারা সংরক্ষিত আপনাদের অধিকার বুঝে নিন। বাগানে আইনের ব্যত্যয় হলে শ্রম আদালতের মাধ্যমে অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন, এখন তো সিলেটেই শ্রম আদালত রয়েছে।’

Manual2 Ad Code

তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের বাগানের কোনও ছাত্র-ছাত্রী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ণরত থাকলে আমাদের খোঁজ দিন। আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই, উপবৃত্তি দিতে চাই।’

রামভজন কৈরি বলেন, ‘যখনই চায়ের দাম কমে যায় তখনই এর ফলাফল ভোগ করত হয় প্রত্যেক চা শ্রমিককে। কিন্তু যখন চায়ের দাম বাড়ে- লাভ হয়, তখন এর ফলাফল আর পৌঁছায় না শ্রমিক পর্যায়ে।’

Manual8 Ad Code

জেসমিন আক্তার বলেন, ‘চা বাগানের নারী চা শ্রমিক সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্তেও তাদের কোনোও মূল্যায়ন নাই- না বাগানে, না তাদের সংসারে। ন্যায্য পাওনা চাইলেই মালিকের লোকসানের কথা চলে আসে।’

আসামের চা শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক আইনজীবী সংগঠন ‘নাজদীক’-এর উপদেষ্টা কাত্যিয়ানী চান্দোলা বলেন, ‘বর্তমানে আসামে চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ২৫০ রুপি। কিন্তু অন্যান্য বেশ কিছু জায়গা যেমন তামিল নাড়ুতে মজুরি ৪০০ রুপি। এখন ভারতের সকল রাজ্যের চা শ্রমিকদের দাবি নিম্নতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সুপ্রীম কোর্টের ফর্মূলা ব্যবহার করে সকল রাজ্যের জন্য নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করা হোক। কেননা কোভিড পরবর্তীকালীন সময়ে জিনিসপত্রের যেভাবে দাম বেড়েছে, সে অনুযায়ী মজুরি আনুপাতিক হারে বাড়ছে না। যদি ফর্মূলা ব্যবহার করে মজুরি নির্ধারণ করা হতো তবে তাদের মজুরি এখন ৫০০ রুপির বেশি হতো।’

কান্তিলাল বাসফর সিলেট বিভাগের একটি সিটি কর্পোরেশন ও কয়েকটি পৌরসভায় হরিজনদের মাসিক বেতনের একটি সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন।

এতে দেখা যায় সবচেয়ে কম বেতন শ্রীমঙ্গলের হরিজন পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের। তিনি মন্তব্য করেন, ‘মাসিক বেতন কম হওয়াতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের কাজের মানের উন্নয়ন হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘পেটে ক্ষুধা থাকলে আমরা হিতাহিত জ্ঞান ভুলে যাই, আমাদের অনেকে মদ-গাঁজা খায়।কেউ কেউ বিক্রিও করে।’

সুখন বাসফর বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ৪ ঘন্টা কাজ করি, ঝড় হোক তুফান হোক। এমনকি মে দিবসেরও ছুটি নাই। এরজন্য আমরা মাসে পাই ৫৫০ টাকা। আমার ছেলে ও স্বামী বেতন ছাড়াই আমাক সাহায্য করে কাজে। আমার ছেলের খাতা কিনলে কলম কিনতে পারিনা। মাছ-মাংস তা দূরের কথা।’
সাগর বাসফর বলেন, ‘আমরা হরিজনরা কোনও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পাই না, পেনশন পাই না, এমনকি দুর্ঘটনা কবলিত হলে কোনও ক্ষতিপূরণ পাই না। আমাদের কোন ছুটিও নেই।’

চা শ্রমিক প্রতিনিধিদের মধ্যে আরও বক্তব্য দেন বিসিএসইউ’র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল এবং কোষাধ্যক্ষ পরেশ কালিন্দি।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, ‘৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

উল্লেখ্য এ বছর মে দিবসের মূল সুর, “সামাজিক ন্যায় বিচার এবং সবার জন্য শোভন কর্মপরিবেশ।”
বাংলাদেশে শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে চা শ্রমিক ও হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষেরা সবচেয়ে কম মজুরি পান। তাদের কর্মপরিবেশও শোভন নয়। তাদের অধিকাংশের বসবাসের জায়গা অত্যন্ত নিম্নমানের। সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড) ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এদেরকে নিয়ে সাম্প্রতিক যে গবেষণা ও অনুসন্ধান করেছে তাতে তাদের মজুরি ও কর্ম পরিবেশের বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।

আলোচনা সভায় চা শ্রমিক ও হরিজনদের নিয়ে সাম্প্রতিক প্রকাশিত গ্রন্থ এবং রিপোর্ট সবার জন্য উন্মোচন করা হয়।


“মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।”
–ধারা-১৯ (২), বাংলাদেশ সংবিধান

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ