সৈয়দ আমিরুজ্জামান |
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসপ্রণয়ন, লোকসাহিত্যের সংরক্ষণ এবং বাংলার অতীত ঐতিহ্যকে আধুনিক জ্ঞানচর্চার আলোয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যাঁর নাম প্রথম সারিতে উচ্চারিত হয়, তিনি দীনেশচন্দ্র সেন। ময়মনসিংহ গীতিকা, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, বৃহত্তর বঙ্গের ইতিহাসসংগ্রহ—সবকিছুর মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন এক যুগসংস্কারক গবেষক। আজ তাঁর ৮৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। এই মহামানবের জীবন, কর্ম, সাহিত্য ও বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় তাঁর অসামান্য অবদান গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা জরুরি।
জন্ম ও পারিবারিক পটভূমি
১৮৬৬ সালের ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ জেলার বগজুরি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত বৈদ্যব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন দীনেশচন্দ্র সেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল ঢাকার সুয়াপুর গ্রামে। পিতা ঈশ্বরচন্দ্র সেন ছিলেন মানিকগঞ্জ আদালতের উকিল এবং মাতা রূপলতা দেবী ছিলেন স্নেহশীল গৃহিণী। পরিবারের শিক্ষাপ্রেম, সংস্কৃতিচর্চা ও বাংলাসাহিত্যের প্রতি আন্তরিক আকর্ষণ দীনেশচন্দ্রকে শৈশব থেকেই প্রভাবিত করেছিল। উল্লেখ্য, প্রখ্যাত কবি ও সাংবাদিক সমর সেন তাঁর পৌত্র।
শিক্ষাজীবন
দীনেশচন্দ্র সেনের শিক্ষাজীবন ছিল সুদীর্ঘ ও গৌরবমণ্ডিত। ১৮৮২ সালে জগন্নাথ স্কুল থেকে এনট্রান্স, ১৮৮৫ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এফ.এ এবং ১৮৮৯ সালে বি.এ সম্পন্ন করেন। স্বশিক্ষা, অধ্যবসায় ও অবসরসময়ে গ্রন্থপাঠ তাঁকে একদিকে যেমন শাস্ত্রজ্ঞানে সমৃদ্ধ করেছিল, অন্যদিকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল বাংলার লোক-ঐতিহ্য অন্বেষণে।
কর্মজীবনের সূচনা
১৮৮৭ সালে সিলেটের হবিগঞ্জ স্কুলে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। পরে কুমিল্লার শম্ভুনাথ ইনস্টিটিউশন (১৮৮৯) এবং ভিক্টোরিয়া স্কুলে (১৮৯০) প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব ও সাহিত্যপ্রেমের জন্য তিনি দ্রুত বুদ্ধিজীবী মহলে স্বীকৃতি লাভ করেন। পরবর্তীকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে রীডার হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ১৯১৩ সালে ‘রামতনু লাহিড়ী রিসার্চ ফেলো’ নির্বাচিত হওয়া তাঁর গবেষণাজীবনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে।
সাহিত্য ও গবেষণাকর্ম
বাংলা সাহিত্যঐতিহ্যের বিস্তৃত ইতিহাস প্রণয়নের প্রয়াসে দীনেশচন্দ্র সেন গ্রামবাংলার প্রাচীন পুঁথি, গীতিকা ও কাহিনির সন্ধানে বের হন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে কুমিল্লায় কর্মরত অবস্থায় তিনি বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে মূল্যবান পুঁথি সংগ্রহ করেন। এই প্রাচীন সম্পদ ও নিজস্ব গবেষণার ভিত্তিতে রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের প্রথম সুবিন্যস্ত ইতিহাসগ্রন্থ—“বঙ্গভাষা ও সাহিত্য” (১৮৯৬)। এটি বাংলার সাহিত্যসমাজে বিপুল সাড়া ফেলে।
পরবর্তীতে তিনি প্রকাশ করেন রামায়ণী কথা, বেহুলা, জড়ভারত, সুকথা, বৈদিক ভারত, ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য, আলোকে আঁধারে, পৌরাণিকীসহ বহু গ্রন্থ। বাংলার লোকঐতিহ্যকে গবেষণাধর্মী ভাষায় উপস্থাপনে তাঁর তুলনা বিরল।
“হিস্ট্রি অব বেঙ্গলি লিটারেচার” — বিশ্বমহলে স্বীকৃতি
১৯১১ সালে তাঁর ইংরেজি ভাষায় লেখা “History of Bengali Literature” প্রকাশিত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তিনি বহুল প্রশংসিত হন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ, ঐতিহাসিক উৎস, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা এবং লোকসাহিত্যের প্রভাব—সবকিছু মিলিয়ে এটি এক মহাগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
ময়মনসিংহ গীতিকা : লোকসাহিত্যকে বিশ্বমঞ্চে তোলা
বাংলা লোকসাহিত্য সংরক্ষণে দীনেশচন্দ্র সেনের সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি হলো “মৈমনসিংহ গীতিকা” সম্পাদনা ও প্রকাশ।
১৯২৩ থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে তিনি চন্দ্রকুমার দে সহ বিভিন্ন সংগ্রাহকের কাছে সংরক্ষিত পালাগান সংগ্রহ করেন এবং সেগুলো গবেষণা ও সম্পাদনা করে বহু খণ্ডে প্রকাশ করেন।
তৎকালীন ময়মনসিংহ ও নেত্রকোণা অঞ্চলের ঐতিহ্যবহুল দশটি পালা—মহুয়া, চন্দ্রাবতী, কমলা, মলুয়া, কাজলরেখা, দেওয়ানা মদিনা, দস্যু কেনারাম, কঙ্ক ও লীলা, রাবিয়া রূপবতী, দেওয়ান ভাবনা—সবই এই সংকলনে যুক্ত হয়।
মৈমনসিংহ গীতিকা পরবর্তীতে বিশ্বের ২৩টি ভাষায় অনূদিত হয়—যা বাংলা লোকসাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনন্য মর্যাদা এনে দেয়।
দীনেশচন্দ্র সেন ভূমিকায় লিখেছিলেন—
“মহুয়ার প্রেম কী নির্ভীক, কী আনন্দপূর্ণ! মৃত্যুকে বরণ করেও সে মৃত্যুঞ্জয়ী।”
এই বিবৃতি থেকে বোঝা যায়, লোককাহিনির অন্তর্নিহিত মানবিক মূল্য ও নন্দনীয়তাকে তিনি কত গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন।
পালাগুলোর সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা
মহুয়া পালা
রচয়িতা: দ্বিজ কানাই
অধ্যায়: ২৪
ছত্র: ৭৮৯
মহুয়ার পালা রোমান্টিক ট্র্যাজেডির বিখ্যাত দৃষ্টান্ত। বেদেসর্দার হুমরা বেদের পালিত কন্যা মহুয়া ও জমিদারের দেওয়ান সুদর্শন নদের চাঁদের প্রেমকাহিনি যেমন মানবিক, তেমনি শোকাবহ। সরদারের নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে প্রেমিকের প্রাণ নিতে বলা হলে মহুয়া নিজের জীবন উৎসর্গ করে প্রেমকে অমর করে। নদের চাঁদও তার অনুকরণে আত্মাহুতি দেন। এ কাহিনি বাংলা লোকশিল্পে চিরস্থায়ী দ্যুতি ছড়িয়েছে।
মলুয়া পালা
ছত্র: ১২৪৭
অঙ্ক: ১৯
রচয়িতা: অজ্ঞাত (কবি চন্দ্রাবতীর ভণিতা থাকায় তাঁকেই অনেক সময় রচয়িতা ভাবা হয়)
দাম্পত্য, বিচ্ছেদ, ক্ষমতাবান কাজির অত্যাচার, নারীর সাহস ও আত্মমর্যাদা—সব মিলিয়ে মলুয়া পালা গ্রামবাংলার সামাজিক বাস্তবতার এক শক্তিমান দলিল। দীনেশচন্দ্র সেন বলেছেন—
“রাগে উজ্জ্বল, বিরাগে উজ্জ্বল, সহিষ্ণুতায় উজ্জ্বল—এই মহীয়সী প্রেমের মহাসম্রাজ্ঞীর তুলনা কোথায়!”
কমলা পালা
রচয়িতা: দ্বিজ ঈশান
ছত্র: ১৩২০
অঙ্ক: ১৭
রানি কমলার আত্মত্যাগ, স্বামীর মুক্তির প্রয়াস এবং ঐতিহাসিক সত্যতার সঙ্গে রূপকথার মিশ্রণ—এ পালাকে করেছে অনন্য। দিঘিতে নিজের জীবন উৎসর্গ করে স্বামীকে রক্ষা করা কমলার কাহিনি বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসেও বহুল আলোচিত।
কাজল রেখা
মৈমনসিংহ গীতিকার একমাত্র রূপকথামূলক পালা।
অজ্ঞাত রচয়িতা হলেও এটি গ্রামীণ লোকবিশ্বাস, কল্পকাহিনি ও জাদুবাস্তবতার এক অসাধারণ নিদর্শন। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের ঠাকুরমার ঝুলি–তেও এর সংক্ষিপ্ত রূপ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
উপাধি ও স্বীকৃতি
দীনেশচন্দ্র সেনের মেধা, পরিশ্রম ও গবেষণা তাঁকে অসংখ্য সম্মানে ভূষিত করেছে।
ডি.লিট., কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯২১),
জগত্তারিণী স্বর্ণপদক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৩১),
রায় বাহাদুর উপাধি, ব্রিটিশ সরকার (১৯২১),
মৈমনসিংহ গীতিকা প্রকাশ—১৯২৬,
ঐতিহাসিক গ্রন্থ “বৃহৎবঙ্গ”—১৯৩৫ (দুই খণ্ডে),
‘বৃহৎ বঙ্গ’ গ্রন্থ সমগ্র বাঙালি জাতির ইতিহাসচর্চায় আজও এক অনন্য দলিল।
প্রধান রচিত গ্রন্থসমূহ
বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (২ খণ্ড) (১৮৯৬), তিন বন্ধু (১৯০৪), রামায়ণী কথা (১৯০৪), বেহুলা (১৯০৭), সতী (১৯০৭), ফুল্লরা (১৯০৭), জড় ভরত (১৯০৮), সুকথা (১৯১২), গৃহশ্রী (১৯১৬), নীলমানিক (১৯১৮), মুক্তা চুরি (১৯২০), সরল বাংলা সাহিত্য (১৯২২), বৈদিক ভারত (১৯২২), ঘরের কথা ও যুগসাহিত্য (১৯২২), আলোকে আঁধারে (১৯২৫), চৌকির বিড়ম্বনা (১৯২৬), ওপারের আলো (১৯২৭), পৌরাণিকী (১৯৩৪), বৃহৎ বঙ্গ (১৯৩৫), আশুতোষ স্মৃতিকথা (১৯৩৬), শ্যামল ও কাজল (১৯৩৬), পদাবলী মাধুর্য্য (১৯৩৭), পুরাতনী (১৯৩৯), বাংলার পুরনারী (১৯৩৯), প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান (১৯৪০) এবং মৈমনসিংহ গীতিকা।
বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অবদান
দীনেশচন্দ্র সেন ছিলেন শুধু গবেষক নন—তিনি ছিলেন ইতিহাসের আলোকপ্রতিম নাবিক।
১. লোকসাহিত্যকে মর্যাদার আসনে বসানো
তাঁর আগে লোকসাহিত্যকে অনেকেই হালকা বিনোদনের উপাদান মনে করতেন। দীনেশচন্দ্র সেন প্রতিষ্ঠা দেন যে—লোকসাহিত্যই একটি জাতির জীবন্ত ইতিহাস।
২. বাংলা সাহিত্যের বৈজ্ঞানিক ইতিহাস রচনা
প্রাচীন পুঁথি, শাস্ত্র, কাব্য, লোকগাথা ও ভাষাতাত্ত্বিক সূত্রের আলোকে তিনি বাংলা সাহিত্যের ধারাবাহিক ইতিহাস প্রথমবারের মতো সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেন।
৩. নারীর ভূমিকা উন্মোচন
চন্দ্রাবতী, মহুয়া, মলুয়া, কমলা—এই সব চরিত্র ও নারী-রচিত পালার মূল্য তিনি প্রথম তুলে ধরেন। ‘বাংলার পুরনারী’ গ্রন্থ নারীর সাহিত্যঐতিহ্য অনুসন্ধানে বিশেষ কীর্তি।
৪. বহুসংস্কৃতিবোধ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি
‘প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান’—এ গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছেন, বাংলার সাহিত্য কেবল এক সম্প্রদায়ের নয়; বহুজাতি-সমৃদ্ধ সংস্কৃতি একযোগে গড়ে উঠেছে।
৫. আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা সাহিত্যের পরিচিতি
“History of Bengali Literature” প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে বাংলা সাহিত্য প্রথমবারের মতো গুরুত্ব পায়।
মৃত্যু
১৯৩৯ সালের ২০ নভেম্বর কলকাতার বেহালায় দীনেশচন্দ্র সেন মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর অবদান বাঙালি জাতির চেতনায় চিরস্মরণীয় হয়ে আছে—যেমন অমর হয়েছে ময়মনসিংহ গীতিকার প্রেম, বেদনা, বীরত্ব আর মানবতার অম্লান গল্পগুলো।
উপসংহার
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও লোকঐতিহ্যকে আজ আমরা যেভাবে জানি—তার ভিত্তিভূমি নির্মাণে দীনেশচন্দ্র সেনের অবদান অপরিসীম। তিনি শুধু ইতিহাস লিখেননি—তিনি রচনা করেছেন বাঙালিত্বের মর্মকথা।
আজ তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা মানে বাংলার শিকড়, সাহিত্যঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা জানানো। তাঁর গবেষণা, সংগ্রহ ও চিন্তাধারা নবপ্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করুক—এই প্রত্যাশা।
#
সৈয়দ আমিরুজ্জামান
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট;
বিশেষ প্রতিনিধি, ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিনান্সিয়াল পোস্ট ও সাপ্তাহিক নতুনকথা;
সম্পাদক, আরপি নিউজ;
কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, জাতীয় কৃষক সমিতি;
‘৯০-এর মহান গণঅভ্যুত্থানের সংগঠক ও সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রী।
সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়ন।
সাধারণ সম্পাদক, মাগুরছড়ার গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ আদায় জাতীয় কমিটি।
প্রাক্তন সভাপতি, বাংলাদেশ আইন ছাত্র ফেডারেশন।
E-mail : syedzaman.62@gmail.com
WhatsApp : 01716599589
মুঠোফোন: ০১৭১৬৫৯৯৫৮৯
Bikash number : +8801716599589 (personal)
Post Views:
৩,২৮১