কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের ৫৪ বছর

প্রকাশিত: ১২:৫৪ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের ৫৪ বছর

Manual6 Ad Code

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের ৫৪ বছর পূর্তি আজ।

১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রায় ১০ লাখ মানুষের সমাবেশে ভাষণ দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনদিনের সফরে তিনি কলকাতায় যান এবং ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত পশ্চিমবঙ্গবাসীর সামনে ভাষণ প্রদান করেন। সেদিন উত্তাল জনতার উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধুর প্রতি কলকাতাবাসীর আগ্রহ ছিল সীমাহীন। শেখ মুজিবুর রহমানের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে কলকাতায় যাত্রা বিরতি করবেন, এমনটাই ভেবেছিলেন তারা। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন দেশের মাটিতে আগে যেতে চেয়েছিলেন বলে এদিন দিল্লী থেকে সরাসরি ঢাকা যাওয়ার পথে কলকাতার দমদম বিমানবন্দরে বার্তা পাঠান যে, তিনি অতি শিগগিরই কলকাতা আসবেন। পরবর্তীতে একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের সফরে কোলকাতা আসেন।

Manual3 Ad Code

শেখ হাসিনা দিবসটি উপলক্ষে এক বাণীতে বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ও ভারত দুই বন্ধুপ্রতিম দেশের মৈত্রীর বন্ধন দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হবে বলে প্রত্যাশা ব্যাক্ত করেন।

Manual1 Ad Code

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি তিনদিনের সফরে কলকাতায় আসেন এবং ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডের জনসভায় শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর উপস্থিতিতে লক্ষ লক্ষ স্বতঃস্ফূর্ত পশ্চিমবঙ্গবাসীর সম্মুখে ভাষণ প্রদান করেন। সেদিন তিনি উত্তাল জনতার উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী চিরদিন অটুট থাকবে’।

তাঁর অগ্নিঝরা ভাষণে উপস্থিত জনতা আবেগপ্লুত হয়েছিলেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বাত্মক সহযোগিতার জন্য ভারতের জনগণ, সরকার, সশস্ত্রবাহিনী, বিশেষ করে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীর প্রতি বঙ্গবন্ধু গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, মেঘালয় এবং আসামের জনগণের প্রতিও বিশেষ কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতার বিখ্যাত ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধুর কলকাতায় অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্ববহ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শহরের ইসলামিয়া কলেজ (বর্তমানে মৌলানা আজাদ কলেজ) থেকে বঙ্গবন্ধু উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময়েই তিনি জাতীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং শুদ্ধ রাজনীতির চর্চা ও গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের অনন্য সম্মিলনে ধর্মনিরপেক্ষতা কীভাবে সমাজজীবনকে বদলে দিতে পারে, তা তিনি কলকাতা শহরে ছাত্রাবস্থাতেই রপ্ত করেছিলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতের অবদান চিরস্মরণীয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের দেশের প্রায় এককোটি মানুষকে ভারত যেমন আশ্রয়-খাদ্য-রসদসহ সবরকম সহায়তা দিয়েছে, তেমনি হাজার হাজার ভারতীয় সৈন্য এদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন। সে কারণে আমাদের দু’দেশের বন্ধুত্ব রক্তের অক্ষরে লেখা থাকবে।”

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বঙ্গবন্ধুর দেয়া ভাষণের ৫৪ বছর উপলক্ষে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

ব্রিগেডে বঙ্গবন্ধু

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

কলকাতার আকাশ সেদিন ছিল দীপশিখা জ্বলা,
ইতিহাসের হৃদপিণ্ডে বাজে সময়ের তবলা।
ব্রিগেড মাঠে জনসমুদ্র, ঢেউ ওঠে বারবার,
লক্ষ কণ্ঠে এক নাম শুধু—বঙ্গবন্ধু, তোমার।

পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এসে মিশেছে হুগলীতে,
রক্তের নদী লিখেছে গান স্বাধীনতার গীতিতে।
দূর ঢাকার ধ্বংসস্তূপে জন্ম নেয় যে সূর্য,
তার আলো এসে পড়েছিল ব্রিগেডের উর্বর্য।

১৯৭২—ফেব্রুয়ারির ছয়, ইতিহাসের দিন,
স্বাধীন বাংলার স্থপতি দিলেন অমর ঋণ।
ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে বললেন দৃপ্ত কণ্ঠে,
বন্ধুত্বের সেতু গড়ব রক্তেরই স্রোতে।

“আমি বিশ্বাস করি দৃঢ়”—কণ্ঠে ছিল শপথ,
ভারত-বাংলা মৈত্রী হবে অটুট অবিচল পথ।
এই বন্ধনে নেই কোনো ভয়, নেই কোনো ফাঁক,
রক্তের অক্ষরে লেখা হবে দুই দেশের ডাক।

ইন্দিরা পাশে, ইতিহাস নীরবে চেয়ে থাকে,
মুক্তির গল্প লিপিবদ্ধ হয় সময়েরই আঁকে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ সেদিন আবেগে অচল,
বিজয়ের কান্না গড়িয়ে পড়ে, চোখের জলে টলমল।

ঢাকার ধ্বংস, গ্রামের আগুন, নারীর নীরব ব্যথা,
সব কাহিনি ব্রিগেড মাঠে পেলো ভাষার কথা।
যে দেশ পেয়েছিল আশ্রয়, অন্ন, অস্ত্র, প্রাণ,
তার প্রতি কৃতজ্ঞতার ঢেউ ভাসাল অনন্ত গান।

Manual7 Ad Code

ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, বাংলার প্রতিটি ঘর,
শরণার্থীর কান্না শুনে খুলে দিয়েছিল দ্বার।
এক কোটি মানুষের বেদনা ভাগ করে নেওয়া দেশ,
সেই ঋণ শোধ হবার নয়—ইতিহাস তার সাক্ষ্যবেশ।

কলকাতার পথে পথে মুজিবের ছাত্রজীবন,
ইসলামিয়া কলেজে গড়ে ওঠে দৃপ্ত মনন।
রাজনীতির পাঠশালা ছিল এই শহরের রোদ,
এখানেই তিনি চিনেছেন গণতন্ত্রের বোধ।

ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ কী, শিখেছিলেন হাতে-কলমে,
সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন বুনেছেন মানবিক সলতে।
ছাত্রাবস্থার সংগ্রাম থেকেই জন্ম নেয় নেতা,
যার কণ্ঠে উঠে আসে কোটি বাঙালির ব্যথা।

স্বদেশে ফিরেও থামেননি ইতিহাসের ডাক,
তাই দিল্লি থেকে ঢাকায় গিয়ে পাঠালেন বার্তাপাক—
“কলকাতা, অপেক্ষা করো, আমি আসব আবার,”
আর এলেন ফেব্রুয়ারিতে, পূর্ণ হলো অঙ্গীকার।

ব্রিগেড মাঠে সেই ভাষণ শুধু বক্তৃতা নয়,
ওটা ছিল মুক্তির মহাকাব্য, সময়ের মহাসয়।
প্রতিটি শব্দে ছিল আগুন, প্রতিটি বাক্যে দৃঢ়তা,
ভবিষ্যতের মানচিত্রে আঁকা স্বাধীনতার গাথা।

আজ চুয়ান্ন বছর পরে দাঁড়িয়ে স্মৃতির তটে,
ইতিহাসের সেই ক্ষণ বাজে হৃদয়ের নোটে।
শেখ হাসিনার কণ্ঠে ফেরে সেই অঙ্গীকার,
অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বন্ধুত্বের বিস্তার।

বাংলাদেশ-ভারত দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ,
এই বন্ধন থাকবে অটুট—রক্তেই লেখা বেশ।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আজও দেয় সাহস, দেয় দিশা,
মৈত্রীর দীপ জ্বালিয়ে রাখে ইতিহাসের শিখা।

Manual2 Ad Code

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড আজও নীরবে জানে,
কীভাবে একজন মানুষ বদলে দেয় কালের মানে।
যতদিন থাকবে বাংলা, যতদিন থাকবে গান,
বঙ্গবন্ধু থাকবেন বেঁচে—ব্রিগেডের সেই আহ্বান।