১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক কমরেড ইসহাক কাজলের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী

প্রকাশিত: ৩:২০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ৬, ২০২৬

১১ ফেব্রুয়ারি সাংবাদিক কমরেড ইসহাক কাজলের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কারে ভূষিত সাহিত্যিক, প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড ইসহাক কাজলের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী আগামী ১১ ফেব্রুয়ারি।

দিনটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং প্রবাসে তাঁর সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও প্রগতিশীল সংগঠনসমূহ নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

Manual6 Ad Code

কমরেড ইসহাক কাজল ছিলেন আজীবন সংগ্রামী এক মানুষ—যাঁর জীবন ও কর্ম একসূত্রে গাঁথা ছিল গণমানুষের অধিকার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে। শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের কারণে তাঁকে বারবার নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর একজন সচেতন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে পুলিশি হয়রানি ও নজরদারির মুখে পড়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হন তিনি। এর ফলে হারাতে হয় তাঁর চাকরিও। তবু আদর্শচ্যুত হননি; বরং সাধারণ মানুষের পক্ষে তাঁর লড়াই আরও দৃঢ় হয়েছে।

Manual1 Ad Code

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান—বাংলাদেশের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে তিনি সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের শ্রম সম্পাদক, সিলেট জেলা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক, সিলেট জেলা শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি, সিলেট জেলা সংবাদপত্র হকার্স ইউনিয়ন ও সমবায় সমিতির সভাপতি এবং সিলেট জেলা রিকশা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবেও তিনি শ্রমিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি মৌলভীবাজার জেলা শাখার সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। সিলেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আন্দোলন, সিলেট বিভাগ আন্দোলনসহ নানা গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।

প্রবাসে গিয়েও তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। যুক্তরাজ্যে অবস্থানকালে তিনি একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যুক্তরাজ্য ইউনিট কমান্ডের নির্বাহী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বাংলাদেশের ইতিহাস তুলে ধরতে তিনি ছিলেন নিরলস।

Manual3 Ad Code

সাহিত্য ও সাংবাদিকতায় কমরেড ইসহাক কাজলের অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৬৯ সালে গণমানুষের কবি দিলওয়ার ‘সমস্বর লেখক ও শিল্পী সংস্থা’ গঠন করলে তিনি এর যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর পেশাদার সাংবাদিকতা। ২০০০ সালে সপরিবারে লন্ডনে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করার পর তিনি বিলাতের সবচেয়ে পুরোনো বাংলা সংবাদপত্র সাপ্তাহিক জনমত-এর সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার এবং পরবর্তীতে পলিটিক্যাল এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি তিনি বিলাত থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্র তৃতীয় ধারা-র প্রধান সম্পাদক ছিলেন।

সাধারণ মানুষই ছিল তাঁর লেখনীর মূল শক্তি ও প্রেরণা। শ্রমিক, কৃষক, মুক্তিযোদ্ধা, প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম তাঁর লেখায় বারবার উঠে এসেছে। সম্পাদনাসহ তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২১টি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— বাঙালি ও বাংলাদেশ, একাত্তরের যোদ্ধারা, মুক্তিযুদ্ধ রাজনীতি ও অন্যান্য, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবীর জেনারেল ওসমানী, বরাক উপত্যকার বাংলা ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস, গল্পে গল্পে বঙ্গবন্ধু, দিলওয়ার: পৃথিবী স্বদেশ যার, কিশোরদের বঙ্গবন্ধু, দ্য ওয়ার্কার্স মুভমেন্ট ইন দ্য সুরমা ভ্যালিসহ আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাধর্মী ও প্রামাণ্য গ্রন্থ।

১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন কমরেড ইসহাক কাজল। প্রবাসে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি বাংলা একাডেমি প্রবাসী লেখক পুরস্কারে ভূষিত হন—যা তাঁর সাহিত্যকর্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।

দীর্ঘদিন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০২০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি গ্রেটার লন্ডনের রমফোর্ড কুইন্স হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতি, সাংবাদিকতা ও সাহিত্যাঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

Manual6 Ad Code

ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীরা স্মরণ করছেন কমরেড ইসহাক কাজলকে এক নির্ভীক মুক্তিযোদ্ধা, আপসহীন সাংবাদিক এবং গণমানুষের আজীবন বন্ধু হিসেবে—যাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবে দীর্ঘদিন।

কমরেড ইসহাক কাজলের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা —

কমরেড ইসহাক কাজল

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

আজো শীতের হাওয়ায় ভাসে
একুশেরই ধ্বনি,
লাল মাটিতে লেখা থাকে
তোমার নামধ্বনি।
ফেব্রুয়ারির এগারোটি
নীরব আগুন জ্বালে,
কমরেড, তোমার শূন্যতাই
আমাদের কথা বলে।

কমলগঞ্জের সবুজ বুকে
যে শিশুটি জন্ম নেয়,
তার চোখে ছিল ইতিহাস,
ভবিষ্যৎ যে রক্ত চায়।
কলম ছিল তার অস্ত্রখানা,
মুখে ছিল প্রতিবাদ,
শাসকের চোখে ভয় ছিল সে,
জনতার সে সন্তান।

শিশুশিক্ষার খাতা খুলে
শুরু হয়েছিল পথ,
শ্রেণিকক্ষে শিখিয়েছিল
মানুষ হওয়া সত্য।
বঙ্গবন্ধু হত্যার পর
কালো মেঘে ঢাকা দেশ,
সত্য বলার অপরাধে
হারালে চাকরি বেশ।

আত্মগোপন, লড়াই, অনাহার
ভাঙতে পারেনি মন,
কারণ তার শিরায় বয়ে
গণমানুষের রণ।
পুলিশি লাঠি, রাষ্ট্রের রোষ
দমাতে পারেনি তাকে,
কারণ সে ছিল শ্রমজীবী
মানুষেরই পক্ষে।

একাত্তরের রণাঙ্গনে
তুমি ছিলে সাহস,
রক্ত দিয়ে লিখে দিলে
স্বাধীনতার কাগজ।
ছেষট্টির ছয় দফাতে
ছিল তোমার কণ্ঠ,
ঊনসত্তরের রাজপথে
ছিল বজ্রগর্জন স্পষ্ট।

শিক্ষা আন্দোলন থেকে
গণঅভ্যুত্থান,
প্রতিটি মিছিলে ছিলে
অগ্রসেনার প্রাণ।
স্বাধীনতার পরও তুমি
থামাওনি লড়াই,
শ্রমিকের অধিকার ছিল
তোমার শেষ চাওয়াই।

সিলেট জেলায় শ্রমিক লীগ,
ঐক্য পরিষদ,
রিকশা, হকার, চা-বাগানের
ঘামে লেখা ইতিহাস-বেদ।
ওয়ার্কার্স পার্টির পতাকা
ছিলে তুমি বহনকারী,
আদর্শে অবিচল থেকেও
ছিলে ভীষণ মানবিক।

প্রবাসে গিয়েও ভুলোনি
মাটির গন্ধ, ভাষা,
ঘাতক-দালাল নির্মূলে
ছিল অবিচল আশা।
লন্ডনের কুয়াশা ভেদ করে
লিখেছ ইতিহাস,
সাপ্তাহিক জনমতের পাতায়
ছিল জনগণের শ্বাস।

পলিটিক্যাল এডিটর হয়ে
লেখোনি শুধু খবর,
লিখেছ মানুষের জীবন,
শ্রমের লাল সাগর।
তৃতীয় ধারার সম্পাদক হয়ে
তুলেছ কলম শক্ত,
সাহিত্যে রাজনীতি মিশে
হয়েছে আরো সত্য।

দিলওয়ারের সঙ্গে পথচলা,
সমস্বরের গান,
শিল্পী-লেখক একসাথে
গড়েছিল প্রতিবাদী স্থান।
তোমার লেখার মূল শক্তি
ছিল সাধারণ জন,
বইয়ের পাতায় বেঁচে আছে
শ্রমিকেরই মন।

একুশটি গ্রন্থ—একুশটি
জ্বলন্ত দলিল,
বাঙালি, বঙ্গবন্ধু, যুদ্ধ
সবই সেখানে নীল।
ওসমানী থেকে চা-শ্রমিক,
বরাক থেকে সুরমা,
তোমার লেখায় উঠে আসে
অবহেলিত কর্মধারা।

প্রবাসী লেখক পুরস্কার
বাংলা একাডেমির,
সে শুধু সম্মান নয়—
স্বীকৃতি সংগ্রামেরই।
তবু তুমি থেকেছ সাদামাটা,
কোনো অহংকার নেই,
কারণ তুমি জানো—
লড়াইয়ের শেষ কোথাও নেই।

২০২০-এর এগারো ফেব্রুয়ারি
নীরব এক সকাল,
রমফোর্ড হাসপাতালে থামে
এক অগ্নিমান পথচলা কাল।
ক্যানসার জিতলেও ইতিহাস
হারেনি একটুও,
কারণ তোমার আদর্শ আজো
জাগিয়ে রাখে মুক্তবোধ।

কমরেড, তুমি নেই—
তবু আছ প্রতিটি মিছিলে,
আছ শ্রমিকের ঘামে,
আছ সংবাদপত্রের শিরোনামে।
যতদিন থাকবে শোষণ,
যতদিন থাকবে লড়াই,
ইসহাক কাজল নামটি
থাকবে উচ্চারিত তাই।

আজ ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে
আমরা শপথ করি,
কলম, রাজপথ, সংগঠনে
সত্যের পাশে থাকি।
ফেব্রুয়ারির এই দিনে
তোমাকে স্মরণ করে,
লাল পতাকা উঁচু রাখি
মানুষের অধিকারে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ