সুন্দরবন দিবস আজ, বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান

প্রকাশিত: ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬

সুন্দরবন দিবস আজ, বিশ্ব ঐতিহ্য রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : আমাদের দেশের রাজনীতি ও ছাত্র গণ-আন্দোলনের ইতিহাসে অনন্য নজির হিসেবে খ্যাত এরশাদ স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস আজ। অন্যদিকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা দিবস হিসেবে পালিত হলেও দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে দিনটি পালিত হয় ভিন্ন এক তাৎপর্যে—‘সুন্দরবন দিবস’ হিসেবে। বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরতেই দুই দশকের বেশি সময় ধরে উপকূলীয় জনপদে পালিত হয়ে আসছে এই দিবস।

২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) উদ্যোগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশসহ দেশের ৭০টির বেশি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ওই সম্মেলন থেকেই ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে প্রতি বছর নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত সুন্দরবনের আয়তন ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যের কারণে ১৯৯২ সালে এটি রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, সুন্দরবনে রয়েছে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং ৫০৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণী। এর মধ্যে ৪৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ১৪ প্রজাতির উভচর এবং ৩৫৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে। এছাড়া ২১০ প্রজাতির মাছ ও ছয় প্রজাতির ডলফিনের আবাস এ বন। সুন্দরীসহ ৩৩৪ প্রজাতির গাছপালা, ১৬৫ প্রজাতির শৈবাল ও ১৩ প্রজাতির অর্কিডে সমৃদ্ধ এ বন বিশ্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্র।

বিশ্ববিখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসভূমিও সুন্দরবন। একই সঙ্গে হরিণ, কুমির, কিং কোবরা, শূকরসহ অসংখ্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল এটি। মোট আয়তনের প্রায় ৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ জলাভূমি নিয়ে গড়ে ওঠা এ বন উপকূলীয় প্রতিবেশ রক্ষায় অনন্য ভূমিকা রাখছে।

উপকূলের প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা সুন্দরবন প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিরুদ্ধে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য এক প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা দেয়াল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও ঝড়ো হাওয়ার আঘাত প্রশমনে এই বন ঢাল হিসেবে কাজ করে। উপকূল সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী ও সাংবাদিক শুভ্র শচীন বলেন, “সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো আগলে রাখে। প্রতিটি ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে এ বনই প্রথম আঘাত নেয়, ফলে উপকূলের মানুষ রক্ষা পায়। সুন্দরবনের টিকে থাকা মানেই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের বেঁচে থাকা।”

বাড়ছে সংকট

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় হুমকি লবণাক্ততা বৃদ্ধি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, ফলে সাগর ও নদীর পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে কম লবণসহিষ্ণু সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ হুমকির মুখে পড়েছে।
উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বনাঞ্চলে মিঠা পানির সংকট তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী শিকার, কাঠ পাচার ও অবৈধ অনুপ্রবেশের মতো কর্মকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বন ও এর জীববৈচিত্র্য।

বন বিভাগের তথ্যমতে, একসময় সুন্দরবনে প্রায় ৪০০ প্রজাতির পাখি ছিল, যা বর্তমানে কমে প্রায় ২৭০ প্রজাতিতে দাঁড়িয়েছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে পূর্ণিমা ও অমাবস্যার জোয়ারে বনের উঁচু এলাকাও প্লাবিত হচ্ছে। এতে বন্যপ্রাণীর ডিম নষ্ট হয়ে বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

Manual7 Ad Code

পরিবেশবাদীরা বলছেন, বনের ওপর পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপ, শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং অবৈধ কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে।

করণীয় কী

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, সুন্দরবনের ওপর থেকে পর্যটনের চাপ কমানো, বনের আশপাশে শিল্প কারখানা নির্মাণ বন্ধ, অভয়ারণ্য এলাকায় প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, চোরাশিকার ও বনজ সম্পদ পাচার বন্ধ, বনজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা—এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন জরুরি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষন দপ্তর সূত্রে বলা হয়, “সুন্দরবন প্রকৃতিগতভাবেই সৃষ্টি এবং প্রকৃতিই এর রক্ষক। তবে বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আগের চেয়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।”

সচেতনতা ও আন্দোলনের বার্তা

সুন্দরবন দিবসের মূল উদ্দেশ্য শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং বন রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা। পলিথিন ও প্লাস্টিক দূষণ রোধ, পরিবেশবান্ধব আচরণ চর্চা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের মধ্য দিয়েই সম্ভব সুন্দরবনের টেকসই সুরক্ষা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষা করা মানে কেবল একটি বন সংরক্ষণ নয়—বরং একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্র, লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করা।

ভালোবাসা দিবসে সুন্দরবন দিবস পালনের মধ্য দিয়ে তাই উপকূলের মানুষ জানিয়ে দিচ্ছেন—প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসাই হতে পারে টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।

সুন্দরবন দিবসে অঙ্গীকার
— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি আজ জাগে ভোরের গান,
ভালোবাসার সাথে জাগে বনরক্ষার প্রাণ।
লাল গোলাপের রঙে রাঙা শহরের আয়োজন,
উপকূলে ঢেউ তোলে সুন্দরবনের স্পন্দন।

প্রেমের সাথে জড়িয়ে আছে মাটির গভীর টান,
মায়ের মতো ডাকে বনের সবুজ অভিমান।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নির্ভীক,
প্রকৃতির সে মহাকাব্য অমর অবিচল ঠিক।

শ্বাসমূলের জটিল জাল নোনা জলের বুকে,
জীবনেরই গোপন কথা লিখে রাখে সুখে।
জোয়ারভাটার ছন্দমালা দিনরাতের তালে,
ছয়বার রূপ বদলায় বন প্রকৃতিরই কলে।

সুন্দরী গরান গেওয়া দাঁড়িয়ে সারি বেঁধে,
মাটি আঁকড়ে রাখে তারা দুর্যোগ এলেও কেঁদে।
ঘূর্ণিঝড়ের রুদ্র রোষে যখন কাঁপে দেশ,
সবুজ দেয়াল হয়ে বন রাখে অটল রেশ।

আয়লা সিডর বুলবুলির সেই তাণ্ডব রাতে,
মানুষ বাঁচে বনের দয়ায় শেষ প্রহরের প্রাতে।
ঝড়ের বুকে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় যে অবিরাম,
সেই বনই মায়ের মতো রাখে সবার দাম।

রয়েল বেঙ্গল বাঘের গর্জন ঘন অরণ্য মাঝে,
অদম্য শক্তির প্রতীক সে প্রাচীন বনের সাজে।
চিত্রা হরিণ ছুটে চলে শিশিরভেজা ঘাসে,
কুমির ভাসে নিঃশব্দে নদীর নোনাজলে ভাসে।

ডলফিন উঠে নিঃশ্বাস নেয় নীল জলের কোলে,
পাখির ডাকে সকাল নামে কুয়াশা ভেজা তলে।
তিন শতাধিক পাখির সুরে জেগে ওঠে বন,
বৈচিত্র্যের রঙে রাঙা প্রকৃতিরই মন।

রামসার স্বীকৃতি পেলো বিরল ঐশ্বর্য ধরে,
বিশ্বঐতিহ্য মর্যাদা জাগে গর্বের ঘরে।
বাংলার মুখ উজ্জ্বল করে বিশ্বমঞ্চের মাঝে,
সুন্দরবন অনন্য থাকে ইতিহাসের সাজে।

Manual4 Ad Code

ছয় হাজার সতেরো বর্গকিলোমিটার জুড়ে,
নদীখাল আর জলাভূমি জীবন বোনে ঘুরে।
পাঁচ শতাধিক উদ্ভিদের সবুজ মহাকাব্য,
প্রাণের ভাণ্ডার হয়ে ওঠে অনিঃশেষ সম্ভাব্য।

তবু আজও শঙ্কা ঘিরে লবণাক্ততার ঢেউ,
মিঠা জলের অভাব বাড়ে উজান ফেরা নেই।
সুন্দরী আর কম সহিষ্ণু বৃক্ষ কাঁদে ক্ষয়ে,
নোনা জলের বিষণ্নতা জমে বনের বয়ে।

Manual4 Ad Code

পলিথিনের বিষদাঁত বসে নদীর নীল শরীরে,
প্লাস্টিকের স্তূপ জমে নীরব মৃত্যুর নীড়ে।
বিষ ঢেলে যে মাছ ধরে সে অমানবিক লোভে,
মারে নিজের ভবিষ্যৎকেই অন্ধ স্বার্থরোগে।

Manual7 Ad Code

চোরাশিকারির গুলির শব্দ ছিন্ন করে রাত,
বাঘ হরিণের রক্ত ঝরে নিভে যায় প্রভাত।
গাছপাচারের কালো ছায়া ঢাকে বনের প্রাণ,
লোভের আগুনে পুড়ে যায় জীবনেরই গান।

জোয়ারে ভাসে উঁচু ভূমি পূর্ণিমা অমাবস্যায়,
ডিম নষ্টে থেমে যায় জীবন নব প্রত্যাশায়।
জলবায়ুর উত্তাপ বাড়ে সাগর বাড়ায় ঢেউ,
প্রকৃতিরই সতর্কবাণী শোনে না কেউ কেউ।

তবু আশা নিভে যায় না মানুষেরই প্রাণে,
সচেতনতার প্রদীপ জ্বলে গ্রাম শহরের টানে।
দুই দশকের বেশি সময় জেগে আছে দিন,
সুন্দরবন দিবস তাই সংগ্রামেরই ঋণ।

খুলনার সেই সম্মেলনে উচ্চারিত শপথ,
বনের তরে জীবন দেবো—অটুট হোক রথ।
সত্তর সংগঠন মিলি এক কণ্ঠে বলি আজ,
সবুজ বাঁচাও, দেশ বাঁচাও—এ আমাদের কাজ।

বনজীবীদের বিকল্প হোক ন্যায্য কর্মপথ,
অভয়ারণ্যে শান্তি ফিরুক সুরক্ষিত হোক রথ।
শিল্পের নামে বিষের কারখানা হোক না আর,
প্রকৃতিরই ক্ষত বাড়িয়ে কোরো না অন্ধকার।

পর্যটনের সীমা থাকুক নিয়ম মেনে চলি,
নয়তো নিজের হাতেই কাটি জীবনেরই ডালি।
বিজ্ঞানী গবেষকেরা খুঁজে পাক সমাধান,
উজান থেকে মিঠা জল ফেরাক জীবনের গান।

সুন্দরবন মায়ের মতো রাখে বুকের ঢাল,
তারই কোলে বেঁচে থাকে জনপদের কাল।
দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার প্রাণ অর্থনীতির শ্বাস,
এই বনেই ভবিষ্যতের অমর ইতিহাস।

এসো তবে অঙ্গীকার করি এই শুভক্ষণে,
সবুজ রক্ষায় দৃঢ় হবো প্রত্যয়ী জীবনে।
প্রেমের দিনে প্রেম হোক মাটির প্রতি দায়,
সুন্দরবন বাঁচলে তবেই বাংলাদেশ বাঁচায়।

চৌদ্দই ফেব্রুয়ারি তাই ভালোবাসার সাথে,
সবুজ রক্ষার শপথ নেবো হাতে হাত রেখে হাতে।
প্রকৃতির এই মহাকাব্য থাকুক চির অমলিন—
সুন্দরবন জাগুক চিরদিন, জাগুক অনন্তদিন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ