শ্যানেলের সিইও লীনা নায়ার

প্রকাশিত: ১:৫২ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২১, ২০২৬

শ্যানেলের সিইও লীনা নায়ার

Manual7 Ad Code

মীর মোনাজ হক |

বিশ্বায়নের এই যুগে নেতৃত্বের মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় পশ্চিমা বিশ্বের করপোরেট বোর্ডরুমগুলোতেই নেতৃত্ব সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু গত তিন দশকে সেই চিত্র আমূল পাল্টে গেছে। আজ গুগল, মাইক্রোসফট, অ্যাডোবি, আইবিএম, পেপসিকো থেকে শুরু করে বহু বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নির্বাহীরা দায়িত্ব পালন করছেন। প্রযুক্তি, আর্থিক খাত, ভোগ্যপণ্য কিংবা বিলাসবহুল ব্র্যান্ড—সবখানেই ভারতীয়দের উপস্থিতি দৃশ্যমান।

সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে শ্যানেলের সিইও লীনা নায়ারের নাম উল্লেখযোগ্য। ইউনিলিভারের দীর্ঘদিনের মানবসম্পদ প্রধান হিসেবে তিন দশকের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে ফরাসি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড শ্যানেলের প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্ব নেন। বৈচিত্র্য, অন্তর্ভুক্তি ও সামাজিক দায়বদ্ধতার মতো মূল্যবোধকে করপোরেট কৌশলের কেন্দ্রে এনে তিনি ইতোমধ্যেই স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁর নেতৃত্ব কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষাব্যবস্থা, পেশাগত দক্ষতা এবং বৈশ্বিক সক্ষমতার প্রতিফলন।

নব্বইয়ের দশকের বীজ

ভারতের এই উত্থান আকস্মিক নয়। নব্বইয়ের দশকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিকাশ, সফটওয়্যার রপ্তানি, আইটি আউটসোর্সিং এবং দক্ষ মানবসম্পদের ধারাবাহিক বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে একটি শক্ত ভিত গড়ে ওঠে। সেই সময়েই ভারতীয় প্রোগ্রামাররা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েন। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক দক্ষতা, ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা এবং প্রযুক্তিগত শিক্ষার বিস্তার ভারতকে বৈশ্বিক আইটি শক্তিতে পরিণত করে।

Manual2 Ad Code

বাংলাদেশও এই পরিবর্তনের বাইরে ছিল না। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ ও প্রকৌশলী প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী একবার বলেছিলেন, আন্তর্জাতিক মানের কাজ শেখার ক্ষেত্রে ভারতের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হয়ে উঠেছিল। ২০০৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশি আইটি পেশাজীবীরাও বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেন। আজ ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার রপ্তানি ও স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমে বাংলাদেশের তরুণদের উপস্থিতি ক্রমেই বাড়ছে।

সাফল্যের পেছনের কারণ

ভারতের করপোরেট নেতৃত্বের সাফল্যের পেছনে কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—

শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ – আইআইটি, আইআইএমের মতো উচ্চমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশ্বমানের মানবসম্পদ তৈরি করেছে।

প্রবাসী নেটওয়ার্কের শক্তি – বিদেশে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় পেশাজীবীরা নতুন প্রজন্মের জন্য পথ খুলে দিয়েছেন।

ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক অভিযোজন ক্ষমতা – বহুজাতিক পরিবেশে কাজের উপযোগী দক্ষতা।

প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব ও ধারাবাহিক পরিশ্রম – দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গঠনে কৌশলগত ধৈর্য।

Manual7 Ad Code

ঈর্ষা নয়, প্রেরণা

অনেকে প্রতিবেশী দেশের এই সাফল্যকে ঈর্ষার চোখে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ার যে কোনো দেশের অগ্রগতি আঞ্চলিক সম্ভাবনাকেই শক্তিশালী করে। ভারত যদি বৈশ্বিক করপোরেট নেতৃত্বে জায়গা করে নিতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? ইতোমধ্যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা উদ্যোগ ও আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিচ্ছে।

আমাদের প্রয়োজন—

শিক্ষা ব্যবস্থায় বাস্তবমুখী দক্ষতা উন্নয়ন,
গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ,
করপোরেট গভর্ন্যান্স ও নেতৃত্ব উন্নয়ন,
আন্তর্জাতিক মানের পেশাগত সংস্কৃতি গড়ে তোলা।

দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনার নতুন অধ্যায়

Manual7 Ad Code

আজকের বিশ্বে প্রতিভার কোনো ভৌগোলিক সীমা নেই। দক্ষতা, সৃজনশীলতা এবং নেতৃত্বগুণই নির্ধারণ করছে কারা বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে। ভারতীয় সিইওদের সাফল্য তাই কেবল একটি দেশের অর্জন নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার সম্ভাবনার প্রতীক।

Manual1 Ad Code

বাংলাদেশের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট—ঈর্ষা নয়, প্রস্তুতি প্রয়োজন। পরিকল্পিত বিনিয়োগ, দক্ষ মানবসম্পদ এবং বৈশ্বিক মানসিকতা নিয়ে এগোতে পারলে একদিন আন্তর্জাতিক কোম্পানির বোর্ডরুমেও আমরা দেখতে পাবো আরও বেশি বাংলাদেশি নাম।
#
লেখক: মীর মোনাজ হক

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ