সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:২৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৮, ২০২৬
না লটারি না পরীক্ষা, সমাধান অঞ্চলভিত্তিক ভর্তি,
শিক্ষা নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ ও শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের মধ্যে আলোচনা আমার নজর কেড়েছে। প্রাথমিক স্তরে ভর্তি প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন বিষয়টি নিয়ে তিনি কাজ করছেন, অভিভাবকসহ সকল পক্ষের সাথে আলোচনা করে, সবার মতামতের ভিত্তিতে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম শিক্ষামন্ত্রী ২০২৭ সাল থেকে প্রাথমিক স্তরে মেধাভিক্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দিয়েছেন।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি পদ্ধতি কি হবে বা ভর্তি পদ্ধতি থাকবে কিনা, থাকলে তা লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, না মেধার ভিত্তিতে হবে, নিঃসন্দেহে তা আলোচনার বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও আমরা ঠিক করতে পারিনি, শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ভর্তির পদ্ধতি কি হবে? অথচ এটি হচ্ছে শিক্ষার অত্যন্ত মৌলিক ও প্রাথমিক একটি বিষয়।
শিশুশিক্ষা বা প্রথম শ্রেণীতে যারা ভর্তি হয় তাদের বয়স ৪ থেকে ৬ বছরের মধ্যে। এই সময় শিশুরা কেবল তাদের মত করে কথাবার্তা ও যোগাযোগ করতে শেখে। শিশুরা তখন প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ, পরিবার ও সমাজের সাথে পরিচিত হতে থাকে। তাদের জ্ঞান-বুদ্ধি এমন পর্যায়ে থাকে না যে তাদের মেধা ও জানা-শোনা পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই যোগ্য। সেটা করা মানে শিশুদের প্রতি অবিচার ও অভিভাবকদের জন্য মানসিক চাপ সৃষ্টি করা।
ইউনিসেফের মতে, ”শিশুকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা শিশুদের মধ্যে ভয়, উদ্বেগ ও লেখাপড়ার প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করতে পারে।
শিশুরা কে কতটা মেধাবী তা সহজে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন, কেননা মেধার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে একটি আপেক্ষিক, আরোপিত ও কৃত্তিম ধারণা। মেধার এই বিষয়টি আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পদ ও সুযোগের মাধ্যমে তৈরী করা হয়। যাদের সেই সুযোগ থাকে না তারা পিছিয়ে পড়ে। এক অর্থে সকল শিশুই মেধাবী তা নির্ভর করছে সেই শিশুদের আগ্রহ, সম্পদ ও যথাযথ সুযোগের ওপর। উচ্চবিত্তরা দামী স্কুল তৈরী করে সেখানে নিজেদের সন্তানদের ভর্তি করিয়ে মেধাবী বলে স্বীকৃতি উৎপাদন করা সমাজে বৈষম্য ও বিভাজন তৈরী করা।
যখন ভর্তির জন্য মেধা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসবে তখন বাণিজ্য নির্ভর শিক্ষা, কোচিং সেন্টার, প্রতিযোগিতা ও দুর্নীতি ও প্রভাব-তদবিরের বিষয় আসবে। এমন কথা ইউনস্কোর এক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে। এ নিয়ে আমাদের পত্র-পত্রিকায় বছরের পর বছর অনেক সংবাদ-প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই দিক থেকে বলা যায় এটি কোন বৈজ্ঞানিক ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি নয়, তা নানা ভাবে প্রমাণিত। সেক্ষেত্রে এই পদ্ধতির ধারাবাহিকতার রক্ষা করা বা চালিয়ে যাওয়ার কোন কারণ বা যৌক্তিকতা নেই।
উন্নত বিশ্বের কোথাও শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির এই ধরণের কোন ব্যবস্থার প্রচলন নেই। এমন কি প্রতিবেশি ভারত, শ্রীলঙ্কাতেও নেই। সেক্ষেত্রে বিশ্বে প্রাথমিক-মাধ্যমিক পর্যায়ে যে ভর্তির পদ্ধতি চালু আছে তাকে অনুসরণ করতে হবে।
উন্নত বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থাটি এমন যে সেখানে শিশুদের প্রাথমিক স্তরে ভর্তি হতে লটারিতেও অংশ নিতে হয় না আবার মেধারভিত্তিতেও ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হয় না। কারণ সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে, যে যে এলাকায় বসবাস করে তাকে বাধ্যতামুলকভাবে সেই এলাকার বিদ্যালয়ে যেতে হয়। এক এলাকার শিক্ষার্থীকে অন্য এলাকায় যেতে হয় না। যে কারণে শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে সেখানে এমন পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয় না। বাবা-মা, অভিভাবকদের কোন হয়রান হতে হয় না, দুশ্চিন্তা করতে হয় না। এই ব্যবস্থা চালু হলে ভর্তি পরীক্ষা বা লটারি কোনটার দরকার নেই।
সুতরাং বাংলাদেশকে ভর্তির এই প্রচলিত বিরক্তিকর, বিতর্কিত অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি থেকে বেড়িয়ে আসতে হলে “জোনিং বা ম্যাপিং স্কুল সিস্টেম” চালু করতে হবে। যে, যে এলাকায় বাস করে, তাকে সেই এলাকার স্কুলে যেতে, পড়তে বাধ্য করতে হবে। এক এলাকার ছেলেমেয়ে অন্য এলাকায় যেতে বা পড়তে পারবে না! এই ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর গুন-মানের ভারসাম্য আসবে। তথাকথিত নামী-দামী স্কুলের জন্য এক এলাকা থেকে অভিভাবকদের অন্য এলাকায় দৌড়াঝাপ করতে হবে না! ভর্তি নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হবে না! কোচিং সেন্টার, দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি ও ডোনেশন প্রথা উঠে যাবে। রাস্তাঘাটে জ্যাম ও যানবাহনের ঝামেলা কমবে। শিক্ষার্থীরা একা ও অভিভাবকের সাথে পায়ে হেঁটে বা সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যেতে পারবে। অভিভাবকদের শিশুদের সাথে যেয়ে স্কুলে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকতে হবে না ও বিপুল শ্রমঘন্টার অপচয় হবে না।
আমার দুই ছেলে। একজন জাপান ও একজন কানাডায় তাদের প্রাথমিক স্তরের লেখাপড়া শেষ করেছে। এই দুই দেশেই আমি যেখানে বসবাস করেছি তারা সেখানকার স্থানীয় স্কুলেই লেখাপড়া করেছে। সেখানে আমাকে কোন এমন অদ্ভুত ব্যবস্থ্যার মুখোমুখি হতে হয়নি। বিশ্বের সকল সভ্য ও উন্নত দেশেই একই ব্যবস্থা। এ সকল দেশে শিক্ষাকে শিশুর জন্মগত অধিকার হিসেবে স্বীকৃত। এটা কোন সুযোগের বিষয় নয়। সে কারণ রাষ্ট্র অবধারিতভাবে সকল শিশুর জন্য মানসম্পন্ন নিরাপদ শিক্ষা নিশ্চিত করে। কেননা শিক্ষাকে তারা লাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে করে। নোবেল জয়ী অর্থনীতিবীদ থিওডর শলজসহ অনেক গবেষক দেখিয়েছেন, শিক্ষায় বিনিয়োগ বহুগুণ হয়ে ফিরে আসে এবং তা সমাজ ও রাষ্ট্রে বহুভাবে ভূমিকা রাখে।
জাপানের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো শিশুদের জন্য কোন পরীক্ষাও রাখা হয়নি। সেখানে শিশুদের স্কুলের প্রথম চার বছর কোন পরীক্ষা দিতে হয় না। তাদের কেবল চাপহীন ছোট ছোট কয়েকটি টেস্ট দিতে হয়। এখানকার শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন স্কুল শুরুর প্রথম চার বছর শিশুদের মেধার মূল্যায়ন করার জন্য যথেষ্ট সময় না। বরং এই সময়ে তাদের আদব-কায়দা, স্বভাব-চরিত্র ও মানবিক গুণাবলীর উন্নয়ন, প্রাণ-প্রকৃতির সাথে পরিচয় ও ব্যবহারিক বিষয়গুলো শেখানোয় অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে আজ পর্যন্ত আমি আমার সন্তানদের স্কুলের পাঠ্যবইও চোখে দেখিনি। স্কুলেই তাদের সব লেখাপড়া করতে হয়েছে বাসায় নামমাত্র কিছু হোমওয়ার্ক দেয়া হয় এই যা।
শিক্ষামন্ত্রী শিক্ষার সমন্বিত রূপের কথা বললেন সেটা আসলেই এক বিস্তৃত আলোচনা বিষয়। প্রাথমিক থেকে উচ্চতর পর্যায়ে শিক্ষার তিনটি প্রধান ধারা হলেও তারমধ্যে আছ বেশ কয়েকটি উপধারা। এক্ষেত্রে বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ যদি অনুসরণ করা হয় তাহলে শিক্ষার একমুখী ও সময় উপযোগিতাকে বিবেচনায় নিতে হবে। সেখানে শিক্ষার মান, ধারা, পাঠ্যসূচী, পাঠক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার স্তর, অর্থায়ন, গবেষণা, শিক্ষাপ্রশাসন ইত্যাদি বহু বিষয়। শিক্ষামন্ত্রী নিজেই বলেছেন কাজটি কঠিন, জটিল ও চ্যালেঞ্জের। এ জন্য প্রাথমিকভাবে প্রয়োজন জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক ভিত্তিক একটি শিক্ষা কমিশন, তার ভিত্তিতে একটি জাতীয় নীতিমালা।
#
ড. মঞ্জুরে খোদা টরিক
লেখক ও শিক্ষা উন্নয়ন বিষয়ক গবেষক।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি