বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস আজ

প্রকাশিত: ১২:২৬ পূর্বাহ্ণ, মে ২০, ২০২৬

বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস আজ

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২০ মে ২০২৬ : আজ বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস। ‘নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে।

শিল্পোন্নয়ন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতকরণে নির্ভুল পরিমাপব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরতেই প্রতি বছর ২০ মে বিশ্বব্যাপী এ দিবস উদযাপন করা হয়।

বাংলাদেশে জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) দিবসটি উপলক্ষে আলোচনা সভা, সেমিনার, সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ কর্মসূচি এবং গণমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার আয়োজন করেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্ভরযোগ্য তথ্য, সঠিক পরিসংখ্যান এবং বৈজ্ঞানিক মানদণ্ডভিত্তিক নীতি প্রণয়নে মেট্রোলজির গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা থেকে শুরু করে খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যখাত ও পরিবেশ সংরক্ষণ—সবক্ষেত্রেই সঠিক পরিমাপ এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

মেট্রোলজি কী

মেট্রোলজি বা পরিমাপবিজ্ঞান হলো পরিমাপের বিজ্ঞান। দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত ওজন, দৈর্ঘ্য, সময়, তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ, চাপ কিংবা রাসায়নিক উপাদানের মাত্রা নির্ধারণে যে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, সেটিই মূলত মেট্রোলজির আওতাভুক্ত। সাধারণ মানুষের কাছে এটি কেবল ওজন বা মাপজোকের বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এটি শিল্প, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ভুল পরিমাপ ছাড়া ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বাজারে পণ্যের সঠিক ওজন নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে ওষুধের নির্ভুল মাত্রা নির্ধারণ, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, চিকিৎসা পরীক্ষার ফলাফল, এমনকি আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণেও মেট্রোলজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দিবসটির ইতিহাস

Manual8 Ad Code

বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস প্রতি বছর ২০ মে পালিত হয়। ১৮৭৫ সালের এই দিনে ফ্রান্সের প্যারিসে ‘মিটার কনভেনশন’ বা ‘মিটার চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্বের ১৭টি দেশ প্রথমবারের মতো এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত পরিমাপব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে এ চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতি বা এসআই ইউনিট (SI Units) বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।

এই ঐতিহাসিক চুক্তির স্মরণে ২০০০ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস উদযাপন শুরু হয়। বর্তমানে দিবসটির কার্যক্রম যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে ইন্টারন্যাশনাল ব্যুরো অব ওয়েটস অ্যান্ড মেজারস (BIPM) এবং ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব লিগ্যাল মেট্রোলজি (OIML)।

আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতির গুরুত্ব

আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতি বা এসআই ইউনিট আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি। মিটার, কিলোগ্রাম, সেকেন্ড, অ্যাম্পিয়ার, কেলভিন, মোল ও ক্যান্ডেলা—এই সাতটি মৌলিক এককের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে বৈশ্বিক পরিমাপব্যবস্থা। একই মানদণ্ড অনুসরণ করার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সহজ হয়েছে।

২০১৯ সালে বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হয়। সে বছর আন্তর্জাতিক একক পদ্ধতিতে পরিবর্তন কার্যকর হয়, যার মাধ্যমে প্ল্যাঙ্ক ধ্রুবকের ভিত্তিতে কিলোগ্রামের নতুন সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। এর ফলে বহু বছর ধরে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক কিলোগ্রাম প্রোটোটাইপের পরিবর্তে একটি স্থায়ী বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞানীরা এটিকে পরিমাপবিজ্ঞানের ইতিহাসে যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করেন।

এবারের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য

এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি’। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে তথ্য ও পরিমাপের নির্ভুলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্যনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, জ্বালানি ব্যবহার, কৃষি উৎপাদন, পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ কিংবা শিল্প উন্নয়ন—সবক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য ও নির্ভরযোগ্য পরিমাপের প্রয়োজন রয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বায়ুদূষণের মাত্রা নির্ধারণে সঠিক পরিমাপ না থাকলে পরিবেশনীতি কার্যকর করা সম্ভব নয়। একইভাবে চিকিৎসা পরীক্ষার ভুল পরিমাপ রোগ নির্ণয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। খাদ্যে ভেজাল শনাক্তকরণ, পানির মান নির্ধারণ, বিদ্যুতের ব্যবহার পরিমাপ কিংবা জ্বালানির গুণগত মান নিশ্চিত করতেও মেট্রোলজির নির্ভুলতা অত্যন্ত জরুরি।

নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য সরকারি তথ্য ও পরিসংখ্যানকে অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হতে হবে। আর সেই নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তি তৈরি করে মেট্রোলজি। ফলে উন্নয়ন পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরিমাপবিজ্ঞানের ভূমিকা এখন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে মেট্রোলজির গুরুত্ব

বাংলাদেশে শিল্পায়ন, রপ্তানি বাণিজ্য ও ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় বিএসটিআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশীয় শিল্পপণ্যের মান নিশ্চিত করা, ওজন ও পরিমাপে প্রতারণা রোধ, পণ্যের মান যাচাই এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, ওষুধ, খাদ্যপণ্য ও কৃষিপণ্য রপ্তানিতে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সঠিক পরিমাপব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের ল্যাবরেটরি, মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং ক্যালিব্রেশন কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

বাজারে ওজন ও পরিমাপে অনিয়ম রোধেও মেট্রোলজির গুরুত্ব অপরিসীম। ভোক্তারা যাতে কম ওজনের পণ্য না পান কিংবা জ্বালানি স্টেশনগুলোতে প্রতারণার শিকার না হন, সেজন্য নিয়মিত নজরদারি ও যাচাইকাজ পরিচালনা করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করা গেলে বাজারব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভোক্তাদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে মেট্রোলজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রক্ত পরীক্ষা, ডায়াবেটিস পরিমাপ, রেডিওলজি, ওষুধ উৎপাদন কিংবা চিকিৎসা যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা—সবক্ষেত্রেই নির্ভুল পরিমাপ প্রয়োজন। পরিমাপে সামান্য ভুলও রোগীর চিকিৎসায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একইভাবে পরিবেশ সুরক্ষায়ও মেট্রোলজি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বায়ুদূষণ, পানিদূষণ, শব্দদূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন উপাত্ত বিশ্লেষণে নির্ভুল পরিমাপ অপরিহার্য। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যে নীতিমালা গ্রহণ করা হচ্ছে, তার ভিত্তিও মূলত নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক পরিমাপ।

ডিজিটাল যুগে মেট্রোলজির নতুন চ্যালেঞ্জ

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ইন্টারনেট অব থিংস (IoT), স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং এবং স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মেট্রোলজির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। আধুনিক শিল্পকারখানায় অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিমাপ ছাড়া উৎপাদনব্যবস্থা পরিচালনা সম্ভব নয়।

Manual6 Ad Code

ডিজিটাল অর্থনীতিতে তথ্যের নির্ভুলতা নিশ্চিত করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্মার্ট মিটার, ডিজিটাল সেন্সর এবং স্বয়ংক্রিয় পরিমাপব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে উন্নত মেট্রোলজি কাঠামো প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে পরিমাপবিজ্ঞানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি

বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস ২০২৩ সালে ইউনেস্কোর অন্যতম আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক উন্নয়ন, বিজ্ঞান শিক্ষা ও টেকসই অর্থনীতিতে মেট্রোলজির গুরুত্ব আন্তর্জাতিকভাবে আরও বেশি স্বীকৃতি পায়।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এই স্বীকৃতি উন্নয়নশীল দেশগুলোকে পরিমাপবিজ্ঞান অবকাঠামো উন্নয়নে আরও উৎসাহিত করবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সঙ্গে মেট্রোলজির সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। উন্নত দেশগুলো গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পোৎপাদনে নির্ভুল পরিমাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। বাংলাদেশকেও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে হলে আধুনিক পরিমাপব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

তারা আরও বলেন, শুধু শিল্প বা গবেষণাগারেই নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও মেট্রোলজির প্রভাব রয়েছে। বাজারে চাল, ডাল, তেল কিংবা জ্বালানি কেনার সময় সঠিক পরিমাপ নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির বিল নির্ধারণেও নির্ভুল পরিমাপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সচেতনতা বৃদ্ধির আহ্বান

বিশ্ব মেট্রোলজি দিবস উপলক্ষে সংশ্লিষ্টরা ওজন ও পরিমাপ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তারা বলছেন, ভোক্তাদের অধিকার রক্ষা এবং ন্যায্য বাজারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সরকারি তদারকির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও প্রয়োজন।

Manual4 Ad Code

বিএসটিআই জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দেশের পরিমাপব্যবস্থা আরও আধুনিক ও কার্যকর করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর মেট্রোলজি অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

Manual8 Ad Code

বিশ্ব মেট্রোলজি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দিচ্ছে—সঠিক পরিমাপ কেবল বিজ্ঞান বা প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, সুশাসন, ভোক্তা সুরক্ষা এবং জনগণের আস্থা প্রতিষ্ঠার অন্যতম ভিত্তি।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ