৮০ হাজার টাকা দিয়েও মেয়েকে ছাড়াতে পারছেন না বাবা

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২৬

৮০ হাজার টাকা দিয়েও মেয়েকে ছাড়াতে পারছেন না বাবা

Manual7 Ad Code
হামে আক্রান্ত শিশু জয়ার চিকিৎসা বিল ২ লাখ ৩০ হাজার টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক | চট্টগ্রাম, ১৪ মে ২০২৬ : ‘মেয়েটা এখন অনেকটাই সুস্থ। কিন্তু হাসপাতালের বিল দিতে না পারায় তাকে বাড়ি নিতে পারছি না। যা ছিল সব শেষ। স্ত্রীর গয়নাও বিক্রি করেছি। ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি, তবু হাসপাতাল থেকে ছাড়ছে না।’

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন চট্টগ্রাম নগরের কাঠগড় জেলেপাড়ার বাসিন্দা সুমন জলদাস (৪০)। হাম ও নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় আক্রান্ত পাঁচ মাসের শিশু জয়া দাসকে নিয়ে গত প্রায় ২০ দিন ধরে হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছুটছেন তিনি।

Manual7 Ad Code

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল জয়ার শরীরে জ্বর ও ফুসকুড়ি দেখা দেয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে স্থানীয় এক চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথমে তাকে একটি দাতব্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসা বাবদ প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু শিশুটির শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে চিকিৎসকেরা তাকে আইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দেন।

সুমন জলদাস বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও কোনো আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়নি। বাধ্য হয়ে গত ৩০ এপ্রিল নগরের জিইসি এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শিশুটিকে ভর্তি করানো হয়। সেখানে দীর্ঘদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসার পর বর্তমানে জয়া কিছুটা সুস্থ হয়েছে।

তবে নতুন সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে হাসপাতালের বিল। পরিবারটির দাবি, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মোট ২ লাখ ৩০ হাজার টাকার বিল দিয়েছে। এর মধ্যে ধারদেনা, সঞ্চয় ও স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে এখন পর্যন্ত ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন সুমন। কিন্তু বাকি টাকা পরিশোধ করতে না পারায় শিশুটিকে হাসপাতাল থেকে ছাড়ানো যাচ্ছে না।

সুমন জলদাস পেশায় একজন জেলে। মাছ ধরে যা আয় হয়, তা দিয়েই কোনোভাবে চলে ছয় সদস্যের সংসার। পরপর চার ছেলের পর জন্ম নেয় জয়া। পরিবারের সবার কাছে সে ছিল অনেক আদরের। কিন্তু এখন মেয়ের চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে দিশেহারা পরিবারটি।

Manual2 Ad Code

সুমনের বড় ছেলের বয়স ১৭ বছর। অর্থাভাবে তাকে পড়াশোনা বন্ধ করতে হয়েছে। মেজ ছেলে শ্রমিকের কাজ করেন। সংসারের সীমিত আয়ে হঠাৎ বিপুল চিকিৎসা ব্যয় মেটানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে বলে জানান স্বজনেরা।

সুমনের শ্যালক হৃদয় দাস বলেন, ‘শুরুতে ধারণা ছিল ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার মধ্যে চিকিৎসা শেষ হবে। কিন্তু সোমবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ২ লাখ ২৯ হাজার টাকার বিল দেয়। আমরা ৮০ হাজার টাকা দিয়েছি। আরও ৩০ হাজার টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করছি। কিন্তু হাসপাতাল ২ লাখ টাকার নিচে নামতে রাজি হচ্ছে না।’

Manual3 Ad Code

এ বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুটিকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভর্তি করা হয়েছিল। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতার কারণে তাকে আইসিইউতে রেখে হাই-ফ্লো অক্সিজেনসহ বিশেষ চিকিৎসা দিতে হয়েছে। সে কারণেই চিকিৎসা ব্যয় বেড়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মানবিক দিক বিবেচনায় চিকিৎসক ফি ও সার্ভিস চার্জ মওকুফ করা হয়েছে। তবে অক্সিজেন ও ওষুধের খরচ বাবদ ন্যূনতম বিল পরিশোধ করতে হবে। পরিবারটির আর্থিক অবস্থার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সমাধানের চেষ্টা চলছে।’

এরই মধ্যে নতুন করে বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। জয়ার মা রীতা দাসও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। জয়ার জন্মের সময় সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা দেখা দিলে মঙ্গলবার রাতে তাকে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সুমন জলদাস বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম মেয়েকে সুস্থ করে বাড়ি ফিরব। কিন্তু এখন হাসপাতালের বিলই সবচেয়ে বড় চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে মেয়ের চিকিৎসা, অন্যদিকে স্ত্রীর অসুস্থতা—সব মিলিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি।’

Manual2 Ad Code

স্বাস্থ্যসেবায় আইসিইউ সংকট ও বেসরকারি হাসপাতালের উচ্চ চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে নিম্নআয়ের পরিবারগুলো কী ধরনের চাপে পড়ে, সুমন জলদাসের পরিবারের ঘটনা তারই একটি বাস্তব চিত্র হয়ে উঠেছে।