হামে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচার দাবীতে ওয়ার্কার্স পার্টির মানববন্ধন ১৬ মে

প্রকাশিত: ২:৫৩ অপরাহ্ণ, মে ১৪, ২০২৬

হামে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিচার দাবীতে ওয়ার্কার্স পার্টির মানববন্ধন ১৬ মে

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক ঢাকা, ১৪ মে ২০২৬ : দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।

টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় অব্যবস্থা এবং ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে দায়ী করে দলটি ‘শিশু মৃত্যুর মিছিল থামাও’ শীর্ষক মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

আগামী ১৬ মে ২০২৬ শনিবার সকাল ১১টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির চিকিৎসা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ আয়োজিত এই কর্মসূচিতে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ, স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

দলটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, দেশে হামের বিস্তার এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নীতিগত ব্যর্থতা ও জনস্বাস্থ্য খাতের অবহেলার ফল। তারা এই পরিস্থিতিকে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে দায়ীদের বিচারের দাবি জানান।

নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত বা সীমিত করার মতো অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের ফলে বহু শিশু নিয়মিত টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। এর পরিণতিতে দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং শত শত পরিবার সন্তান হারানোর বেদনা বহন করছে।

বিবৃতিতে তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান। একই সঙ্গে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে শিশু মৃত্যুর জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়।

ওয়ার্কার্স পার্টির নেতারা বলেন, “হামে আক্রান্ত হয়ে দেশে চারশ’র বেশি শিশুর মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক ঘটনা নয়। একটি রাষ্ট্র যখন তার শিশুদের জীবনরক্ষাকারী টিকাদান কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যর্থতার দায় নীতিনির্ধারকদের বহন করতে হয়।”

তারা আরও বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু প্রশাসনিক বিবৃতি বা সীমিত উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। অবিলম্বে হাম পরিস্থিতিকে জাতীয় মহামারি ঘোষণা করে জরুরি স্বাস্থ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।”

‘রাষ্ট্রের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে’

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক এবং কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের অবহেলা, টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং শিশুস্বাস্থ্যকে অগ্রাধিকার না দেওয়ার ফলেই পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

তিনি বলেন, “যে রাষ্ট্র তার শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।”

Manual1 Ad Code

তার ভাষ্য অনুযায়ী, হাম পরিস্থিতিকে অবিলম্বে মহামারি ঘোষণা করে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুনরায় টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

চার দফা দাবি

ওয়ার্কার্স পার্টির পক্ষ থেকে মানববন্ধন কর্মসূচিকে সামনে রেখে চার দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। দাবিগুলো হলো—

১. দেশে চলমান হাম পরিস্থিতিকে অবিলম্বে ‘মহামারি’ ঘোষণা করতে হবে এবং শিশু মৃত্যুর মিছিল বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে;

২. আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী ফিল্ড হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে;

Manual8 Ad Code

৩. স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে হামে ৪০০-এর অধিক শিশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে;

৪. জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে সরকারি বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং চিকিৎসা খাতকে সম্পূর্ণ সরকারীকরণের আওতায় আনতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের সংকট

দলটির নেতৃবৃন্দের মতে, দেশের স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, জনবল সংকট এবং বাজেট ঘাটতির কারণে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশুস্বাস্থ্য, টিকাদান এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

তারা অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের নানা দাবি থাকলেও বাস্তবে গ্রামীণ হাসপাতাল ও কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসক, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি প্রকট। এর ফলে হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগও বড় আকারে ছড়িয়ে পড়ছে।

নেতৃবৃন্দ বলেন, “জনস্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উপেক্ষা করে উন্নয়নের গল্প শোনানো হলেও বাস্তবে শিশুদের জীবন নিরাপদ নয়। এই সংকট শুধু স্বাস্থ্য খাতের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণেরও সংকট।”

তারা আগামী জাতীয় বাজেটে শিশুস্বাস্থ্য খাতে বিশেষ বরাদ্দ, বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা এবং জরুরি স্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার দাবি জানান।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন, স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার ঘাটতির কারণে হামের সংক্রমণ দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ায় শিশুদের ঝুঁকি বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রতিরোধে টিকাদানই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। যদি জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তারা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, মোবাইল মেডিকেল টিম গঠন, গণসচেতনতা বৃদ্ধি এবং টিকাদান কর্মসূচিকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

Manual3 Ad Code

মানববন্ধন ঘিরে রাজনৈতিক গুরুত্ব

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনস্বাস্থ্য ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয়তা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু মৃত্যুর মতো সংবেদনশীল বিষয়কে সামনে এনে সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলও এতে প্রতিফলিত হচ্ছে।

তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, জনস্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় রাজনৈতিক বিরোধের বাইরে গিয়ে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ টিকাদান, শিশুস্বাস্থ্য ও মহামারি প্রতিরোধের মতো বিষয়গুলো সরাসরি জনগণের জীবন ও নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।

Manual2 Ad Code

এদিকে আগামী ১৬ মে জাতীয় প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিতব্য মানববন্ধন ও সমাবেশে বিভিন্ন বামপন্থি সংগঠন, সামাজিক সংগঠন এবং স্বাস্থ্য অধিকারকর্মীদের অংশগ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। আয়োজকরা কর্মসূচি সফল করতে সর্বস্তরের জনগণের প্রতি অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ