কমরেড রনো আগামীতেও বামপন্থীদের লড়াইয়ের প্রেরণা: সেলিম

প্রকাশিত: ৮:৫৫ অপরাহ্ণ, মে ১২, ২০২৬

কমরেড রনো আগামীতেও বামপন্থীদের লড়াইয়ের প্রেরণা: সেলিম

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১২ মে ২০২৬ : বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, “বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার গভীর সংকট, উগ্র ডানপন্থার উত্থান এবং ফ্যাসিবাদী রাজনীতির বিস্তারের বিপরীতে বামপন্থাই আজ মানুষের সামনে বিকল্প শক্তি হিসেবে ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। তিনি বলেন, “কমরেড হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন বাস্তববাদী মানুষ। এ কারণেই তিনি আমৃত্যু আশাবাদী রাজনীতিবিদ ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে বামপন্থার অপরিহার্যতা নিয়ে তিনি কখনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি। কমরেড হায়দার আকবর খান রনো আগামীতেও বামপন্থীদের লড়াইয়ের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন। এমন এক যুগসন্ধিক্ষণে তিনি বেঁচে থাকলে সমাজ ও রাজনৈতিক আন্দোলন আরও উপকৃত হতো।”

মঙ্গলবার (১২ মে ২০২৬) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনের মিলনায়তনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) আয়োজিত বিশিষ্ট মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, দেশের শীর্ষ বামপন্থী রাজনীতিক, সিপিবির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক উপদেষ্টা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত স্মরণসভায় প্রধান আলোচকের বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

স্মরণসভায় সভাপতিত্ব করেন সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন। সভায় আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক কমরেড আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড মিহির ঘোষ, প্রগতি লেখক সংঘের সহ-সভাপতি জাকির হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিপিবির প্রেসিডিয়াম সদস্য কমরেড জলি তালুকদার।

‘রনো ছিলেন সংগ্রামী রাজনীতির প্রতীক’

কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম থেকে শুরু করে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন সাহসী ও লড়াকু নেতৃত্বের প্রতীক। তিনি বলেন, “একই আদর্শে আমরা রাজনীতি শুরু করেছিলাম। উত্তাল ষাটের দশক থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আপসহীনভাবে মানুষের মুক্তির রাজনীতিতে অবিচল ছিলেন। তিনি শুধু একজন সংগঠক ছিলেন না, ছিলেন চিন্তকও। সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে তিনি সবসময় বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করতেন।”

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময়ে যখন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন, যুদ্ধ, বৈষম্য ও গণতন্ত্রহীনতা বাড়ছে, তখন কমরেড রনোর মতো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের প্রয়োজনীয়তা আরও গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। তার মতে, তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে রনোর জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন সংগ্রামের পথনির্দেশনা হয়ে থাকবে।

Manual6 Ad Code

‘আজীবন বিপ্লবী ছিলেন রনো’

Manual5 Ad Code

স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বাসদের সাধারণ সম্পাদক কমরেড খালেকুজ্জামান বলেন, “কমরেড হায়দার আকবর খান রনো আজীবন নিজেকে বিপ্লবী রাজনীতির কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সজ্জন, বিনয়ী ও সংস্কৃতিমনা মানুষ।” তিনি বলেন, রনোর মধ্যে রাজনৈতিক দৃঢ়তার পাশাপাশি সাহিত্য, কবিতা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য ও দর্শনের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

খালেকুজ্জামান বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল বিষয়গুলো তিনি অত্যন্ত সহজ ও সাবলীল ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে তুলে ধরতে পারতেন। মার্কসবাদকে জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাসকে দলিলবদ্ধ করার ক্ষেত্রে তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

Manual7 Ad Code

তিনি আরও বলেন, “মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি লিখে গেছেন। গণমানুষের মুক্তির প্রশ্ন, শ্রমিক-কৃষকের অধিকার, রাষ্ট্র ও সমাজের বৈষম্য, আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংকট—এসব বিষয় নিয়ে তার ধারাবাহিক লেখালেখি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ হয়ে থাকবে।”

‘রনোর বই ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল’

সভাপতির বক্তব্যে সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, কমরেড রনো ছিলেন একাধারে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক, সংগ্রামী রাজনীতিক এবং গণমানুষের নেতা। তিনি বলেন, “তার ‘উত্তাল ষাটের দশক’ গ্রন্থটি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস বুঝতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল। তার লেখার মধ্য দিয়ে সেই সময়ের গণআন্দোলন, ছাত্র-জনতার সংগ্রাম এবং মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে অনুধাবন করা যায়।”

Manual6 Ad Code

তিনি বলেন, ইতিহাসে সাধারণ মানুষের অবদানকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরার ক্ষেত্রে রনোর লেখনী ছিল ব্যতিক্রমী। রাষ্ট্রক্ষমতার ইতিহাসের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম, গণআন্দোলনের শক্তি এবং প্রগতিশীল রাজনীতির ধারাকে তুলে ধরেছেন।

কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের সঙ্গেও কমরেড রনোর নিবিড় সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তন, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে তিনি গভীর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি তার নীতি ও আদর্শে অবিচল ছিলেন।

রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের স্মরণ

স্মরণসভায় বক্তারা বলেন, হায়দার আকবর খান রনো কেবল একজন রাজনৈতিক সংগঠক ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন গবেষক, লেখক ও চিন্তাবিদ। বাংলাদেশের বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম এবং সমাজতান্ত্রিক দর্শন নিয়ে তার বহু গ্রন্থ ও প্রবন্ধ রাজনৈতিক কর্মী, গবেষক ও পাঠকমহলে সমাদৃত।

বক্তারা আরও উল্লেখ করেন, রাজনীতিতে মতাদর্শিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিজীবনে সততা এবং সাংগঠনিক জীবনে শৃঙ্খলার যে অনন্য উদাহরণ কমরেড রনো রেখে গেছেন, তা বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার বিষয়। তার রাজনৈতিক জীবন নতুন প্রজন্মকে সংগ্রামী ও মানবিক রাজনীতির পথে অনুপ্রাণিত করবে বলেও তারা মত দেন।

নতুন প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে রাজনীতিতে আদর্শিক সংকট, সুযোগসন্ধানিতা এবং গণবিচ্ছিন্নতার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, সেখানে কমরেড রনোর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক কর্মীদের সামনে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার রাজনৈতিক চর্চা ছিল গণমানুষকেন্দ্রিক এবং মুক্তিকামী। তিনি সবসময় বিশ্বাস করতেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো প্রগতিশীল পরিবর্তন সম্ভব নয়।

বক্তারা বলেন, বামপন্থী আন্দোলনের ইতিহাসে কমরেড রনো একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবেন। তার চিন্তা, রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে প্রাসঙ্গিক হয়ে থাকবে দীর্ঘদিন।

স্মরণসভা শেষে কমরেড হায়দার আকবর খান রনোর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। পরে তার জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ