মোড়কেই স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা: অতিরিক্ত চিনি-লবণ শনাক্তে বাধ্যতামূলক এফওপিএল চায় বিশেষজ্ঞরা

প্রকাশিত: ৪:৩০ অপরাহ্ণ, মে ৯, ২০২৬

মোড়কেই স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা: অতিরিক্ত চিনি-লবণ শনাক্তে বাধ্যতামূলক এফওপিএল চায় বিশেষজ্ঞরা

Manual3 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৯ মে ২০২৬ : বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগের বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বাড়তে থাকায় মোড়কজাত খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ক্ষতিকর চর্বি শনাক্তে কার্যকর ‘ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) ব্যবস্থা চালুর দাবি জোরালো হয়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, গবেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলেছেন, খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনের অংশে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা যুক্ত করা হলে ভোক্তারা সহজেই বুঝতে পারবেন কোন পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে। এতে অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি রোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।

Manual6 Ad Code

শনিবার (৯ মে ২০২৬) সকালে রাজধানীর বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত “জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ও ভোক্তা অধিকার নিশ্চিতে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং: বিদ্যমান আইন ও নীতি” শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এসব দাবি উঠে আসে।

সভাটির আয়োজন করে সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ), পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্ক, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট এবং সিটিজেন নেটওয়ার্ক–সিনেট।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ প্রক্রিয়াজাত ও প্যাকেটজাত খাদ্যে পুষ্টি-তথ্য থাকলেও তা এত ছোট অক্ষরে লেখা থাকে বা এত জটিলভাবে উপস্থাপন করা হয় যে সাধারণ ভোক্তাদের পক্ষে তা বোঝা কঠিন। ফলে মানুষ না বুঝেই অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও চর্বিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ করছেন। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের লক্ষ্য করে রঙিন মোড়ক ও আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যপণ্যের বিপণন বাড়ছে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

‘৭১ শতাংশ মৃত্যু অসংক্রামক রোগে’

অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আমল। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক রোগের কারণে ঘটে। ৩০ থেকে ৭০ বছর বয়সীদের মধ্যে এসব রোগে অকালমৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ। এই বাস্তবতায় অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং কার্যকর একটি উদ্যোগ।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তারা যখন কোনো খাদ্যপণ্যের মোড়কের সামনেই বড় আকারে ‘অতিরিক্ত চিনি’, ‘অতিরিক্ত লবণ’ বা ‘অতিরিক্ত চর্বি’ ধরনের সতর্কবার্তা দেখতে পাবেন, তখন তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। একই সঙ্গে খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের উপাদান পরিবর্তন করে তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদনে উৎসাহিত হবে।

শিশুদের লক্ষ্য করে বিপণন নিয়ে উদ্বেগ

বক্তারা বলেন, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শিশুদের আকৃষ্ট করতে অস্বাস্থ্যকর খাবারের আগ্রাসী বিপণন চালানো হচ্ছে। চকোলেট, চিপস, কোমল পানীয়, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারকে ‘মজাদার’ বা ‘এনার্জি ফুড’ হিসেবে প্রচার করা হলেও এগুলোর স্বাস্থ্যঝুঁকি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় না।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেন, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত পানীয় শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত ও অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে শিশুদের অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাকটিভিটি ডিসঅর্ডার (এডিএইচডি)-এর ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। পাশাপাশি স্থূলতা, ডায়াবেটিস, দাঁতের ক্ষয় এবং আচরণগত সমস্যাও বাড়ছে।

দ্রুত বাড়ছে চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণ

আলোচনা সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, বাংলাদেশে চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৬ সালে এ হার ছিল ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, যা ২০২২ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তরুণদের মধ্যে সফট ড্রিংকস ও উচ্চ চিনিযুক্ত পানীয় গ্রহণের প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে, যা ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

বক্তারা আরও বলেন, অসংক্রামক রোগে আক্রান্ত পরিবারগুলোর স্বাস্থ্য ব্যয় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ ব্যয়ের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রশ্নেও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি হয়ে উঠেছে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন বক্তারা

সভায় বক্তারা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে কার্যকরভাবে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু হয়েছে। চিলি, মেক্সিকো, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের মতো দেশগুলোতে মোড়কের সামনের অংশে কালো রঙের সতর্ক চিহ্ন ব্যবহার করে জানিয়ে দেওয়া হয় কোনো পণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে কি না। এসব দেশে ভোক্তাদের সচেতনতা যেমন বেড়েছে, তেমনি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও পণ্যের উপাদান পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে।

Manual6 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে সহজবোধ্য ও কার্যকর সতর্কবার্তা চালু করা প্রয়োজন। শুধুমাত্র পুষ্টিগুণের তালিকা নয়, বরং বড় আকারে দৃশ্যমান স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকলে সাধারণ মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

Manual6 Ad Code

‘রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা’

বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী জনগণের পুষ্টির মানোন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্য রক্ষা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নিরাপদ খাদ্য আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধিমালা সংশোধন করে বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং চালু করা উচিত।

তারা বলেন, বর্তমানে বাজারে অনেক খাদ্যপণ্যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ব্যবহার করা হয়। ‘লো ফ্যাট’, ‘হেলদি’, ‘ন্যাচারাল’ বা ‘ফর্টিফায়েড’ ধরনের শব্দ ব্যবহার করে পণ্যের ইতিবাচক দিক তুলে ধরা হলেও একই পণ্যে অতিরিক্ত চিনি বা লবণ থাকার বিষয়টি আড়াল করা হয়। বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা থাকলে এই বিভ্রান্তিকর বিপণন অনেকাংশে কমে আসবে।

আইন সংশোধনের দাবি

সভা থেকে দ্রুত কার্যকর, স্পষ্ট ও বাধ্যতামূলক ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানানো হয়। বক্তারা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা ও ভোক্তা অধিকার রক্ষায় এখনই উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে অসংক্রামক রোগের বোঝা আরও বাড়বে।

তারা আরও বলেন, এফওপিএল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর নির্দেশনা অনুসরণ, স্বাধীন বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড নির্ধারণ এবং খাদ্য শিল্পের অযাচিত প্রভাবমুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে জনগণকে সচেতন করতে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

বিশিষ্টজনদের অংশগ্রহণ

আলোচনা সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক উপদেষ্টা ও উবিনীগের নির্বাহী পরিচালক ফরিদা আখতার।

Manual8 Ad Code

নীতি বিশ্লেষক কামরুননিছা মুন্নার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন পাবলিক হেলথ ল’ ইয়ার্স নেটওয়ার্কের সদস্য-সচিব ব্যারিস্টার নিশাত মাহমুদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাইফুর রহমান, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারী, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক মো. বজলুর রহমান, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুলতান মুহাম্মদ বান্না, ব্যারিস্টার বিভতি তরফদার, অ্যাডভোকেট মমতাজ পারভীন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট মো. শাহাদত হোসেন, অ্যাডভোকেট মারুফ উল আবেদ, অ্যাডভোকেট শাহানেওয়াজ পাটয়ারী, অ্যাডভোকেট শাহদাত হোসাইন, অ্যাডভোকেট নিশাত তামান্না ঐথি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মো. মোস্তফা খান, ডাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আমিরুল ইসলাম, সেতু ফাউন্ডেশনের পরিচালক শাগুফতা সুলতানা, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের হেড অব প্রোগ্রাম সৈয়দা অনন্যা রহমান, টিসিআরসির প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর ফারহানা জামান লিজা এবং সিএলপিএর পরামর্শক অধ্যাপক আ ফ ম সারোয়ার প্রমুখ।

জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপের তাগিদ

সভায় অংশগ্রহণকারী বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একদিকে অপুষ্টি, অন্যদিকে অতিপুষ্টি ও অসংক্রামক রোগ— এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যকর খাদ্য নির্বাচন সহজ করতে কার্যকর লেবেলিং ব্যবস্থা চালু করা সময়ের দাবি।

তাদের মতে, ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং শুধু একটি তথ্য প্রদানের ব্যবস্থা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি-উপকরণ। এটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তারা সচেতন হবেন, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস পাবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ