হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর ৭০৭তম ওরস শরীফ শুরু, লাখো মানুষের ঢল

প্রকাশিত: ৪:৩৮ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২৬

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর ৭০৭তম ওরস শরীফ শুরু, লাখো মানুষের ঢল

Manual2 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | সিলেট, ০৭ মে ২০২৬ : সিলেটের আধ্যাত্মিক রাজধানীখ্যাত হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর পবিত্র মাজারে শুরু হয়েছে ৭০৭তম বার্ষিক পবিত্র ওরস শরীফ।

বৃহস্পতিবার (৭ মে ২০২৬) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মাজারের গিলাফ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় এ আয়োজন। দিনভর দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত হাজার হাজার আহলে বায়েতপন্থী ভক্ত-আশেকান, ধর্মপ্রাণ মুসল্লি ও অনুসারীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো দরগাহ এলাকা।

ওরস উপলক্ষে মাজার শরীফ ও আশপাশের এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। ভক্তরা ‘লালে লাল, বাবা শাহজালাল’ স্লোগানে মাজার প্রাঙ্গণ মুখরিত করে তোলেন। শুক্রবার ভোরে আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুইদিনব্যাপী এ ধর্মীয় আয়োজন ও উৎসবের।

গিলাফ বদলের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সূচনা

প্রতিবছরের ন্যায় এবারও গিলাফ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ওরসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মাজার কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করে গিলাফ পরিবর্তন করা হয়। পরে দেশ-বিদেশ থেকে আগত ভক্তরা মাজার জিয়ারত করেন এবং বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।

মাজার শরীফের খাদেম শামুন মাহমুদ খান সাংবাদিকদের জানান, সকাল থেকে হাজারো মানুষ মাজারে সমবেত হন। তিনি বলেন, “গিলাফ বদলানোর মধ্য দিয়ে পবিত্র ওরস শরীফের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন এলাকা থেকে আগত ভক্তদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে পুরো দরগাহ এলাকা প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে উঠেছে।”

Manual4 Ad Code

তিনি আরও জানান, এ পর্যন্ত শতাধিক গরু ও খাসি দান হিসেবে পাওয়া গেছে, যা দিয়ে ভক্তদের জন্য শিরনি ও খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।

লাখো মানুষের সমাগম

ওরস উপলক্ষে সিলেট নগরীতে বিরাজ করছে উৎসব ও আধ্যাত্মিক আবহ। মাজার শরীফ এলাকায় লাখো মানুষের সমাগম হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এ আয়োজনকে কেন্দ্র করে সিলেটে এসেছেন।

ভক্তরা মাজার জিয়ারতের পাশাপাশি মিলাদ মাহফিল, কোরআনখানি ও বিশেষ দোয়া-মোনাজাতে অংশ নিচ্ছেন। অনেকে মানত পূরণে গরু, খাসি ও অন্যান্য সামগ্রী দান করছেন। দরগাহ এলাকায় অস্থায়ী দোকানপাট, খাবারের স্টল এবং ধর্মীয় সামগ্রীর দোকান বসেছে।

ওরসে অংশ নিতে আসা ভক্তদের একজন মো. আব্দুস সালাম বলেন, “শাহজালাল (রহ.)-এর দরবারে আসলে মনে এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করে। প্রতি বছরই ওরসে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করি।”

আরেক ভক্ত সুমাইয়া আক্তার বলেন, “দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ এখানে আসে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, মুসলিম ঐক্যেরও এক বড় মিলনমেলা।”

আখেরি মোনাজাতে শেষ হবে ওরস

মাজার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুক্রবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। মোনাজাত পরিচালনা করবেন দরগাহ মাজার মসজিদের মোতোয়ালি ফতেউল্লাহ আল আমান। মোনাজাত শেষে শিরনি বিতরণের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হবে ৭০৭তম পবিত্র ওরস শরীফ।

ওরস উপলক্ষে ধর্মীয় আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, হামদ-নাত ও জিকির মাহফিলেরও আয়োজন করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে উপহার

Manual7 Ad Code

পবিত্র ওরস শরীফ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে একটি গরু উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে। সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী সোমবার বিকেলে মাজারের মোতাওয়াল্লি ফতেউল্লাহ আল আমানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই উপহার হস্তান্তর করেন।

এ সময় আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষ থেকে পবিত্র এই ওরস উপলক্ষে গিলাফ পাঠানো হয়েছে। আমি তার প্রতিনিধি হিসেবে তা মাজারে ছড়িয়েছি।”

মাজার কর্তৃপক্ষ প্রধানমন্ত্রীর এই উপহারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে বিশেষ দোয়া করা হয়।

কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা

ওরসকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মো. মঞ্জুরুল আলম বলেন, “ভক্ত-অনুরাগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন।”

মাজার শরীফ এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ চৌকি, সিসিটিভি ক্যামেরা ও পর্যবেক্ষণ টিম। ভিড় নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন বিপুল সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক।

Manual1 Ad Code

খাদেম শামুন মাহমুদ খান জানান, ওরসে আগত অতিথিদের সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই হাজারের বেশি স্বেচ্ছাসেবক নিয়োজিত রয়েছেন। এছাড়া মেডিকেল টিম, ফায়ার সার্ভিস এবং বিদ্যুৎ বিভাগের পৃথক টিম সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

Manual7 Ad Code

ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা

বাংলাদেশের ইতিহাসে হজরত শাহজালাল (রহ.) অন্যতম প্রভাবশালী সুফি সাধক হিসেবে পরিচিত। ১৪শ শতকে ইসলাম প্রচারের জন্য তিনি সিলেটে আগমন করেন এবং আধ্যাত্মিক সাধনা ও মানবসেবার মাধ্যমে এ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত সিলেট দরগাহ আজও দেশের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।

প্রতি বছর তাঁর ওরস শরীফকে ঘিরে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। ধর্মীয় অনুশীলনের পাশাপাশি এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সম্প্রীতিরও এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়।

এবারের ৭০৭তম পবিত্র ওরস শরীফেও ভক্তদের উপস্থিতি, ধর্মীয় আবহ এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় সিলেট নগরী যেন নতুন এক প্রাণচাঞ্চল্যে জেগে উঠেছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ