সিলেট ১০ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:২৯ অপরাহ্ণ, মে ১০, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক| শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ১০ মে ২০২৬ : বাংলাদেশ চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মেজবাহ উদ্দীন আহমেদের সাম্প্রতিক এক টেলিভিশন টকশোতে চা-শ্রমিকদের নিয়ে দেওয়া বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন। সংগঠনটির দাবি, চেয়ারম্যানের বক্তব্যে চা-শ্রমিকদের সম্পর্কে নেতিবাচক, বিভ্রান্তিকর ও অবমাননাকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা শ্রমিকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে এবং তাদের মধ্যে মানসিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে।
রোববার (১০ মে ২০২৬) দুপুরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল শহরে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সদর দপ্তর ‘লেবার হাউস’-এর মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের অর্থ সম্পাদক পরেশ কালিন্দী, বালিশিরা ভ্যালির সভাপতি বিজয় হাজরা, কার্যকরী সভাপতি বৈশিষ্ট্য তাঁতী, জুড়ি ভ্যালির সভাপতি কমল বোনার্জী, সাংগঠনিক সম্পাদক কন্ঠ তাঁতী, স্টাফ দুলাল হাজরাসহ বিভিন্ন চা-বাগানের পঞ্চায়েত নেতৃবৃন্দ।
সংবাদ সম্মেলনে নৃপেন পাল বলেন, এটিএন বাংলার চট্টগ্রাম কেন্দ্রের ‘মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ চা-বোর্ড চেয়ারম্যান চা-শ্রমিকদের দৈনিক কর্মঘণ্টা, উৎপাদনশীলতা এবং বাগান ব্যবস্থাপনা নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিনি অভিযোগ করেন, চেয়ারম্যান শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এমন ধারণা দিয়েছেন যে তারা নিয়মিতভাবে পূর্ণ কর্মঘণ্টা কাজ করেন না এবং মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা কাজ করেই দায়িত্ব শেষ করেন। অথচ বাস্তবে চা-শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের চা-শিল্পকে টিকিয়ে রেখেছেন।
নৃপেন পাল বলেন, “চা-শ্রমিকরা প্রতিদিন নির্ধারিত নিয়মে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তারা না থাকলে দেশের চা-শিল্প আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে পারত না। অথচ দেশের চা-বোর্ডের চেয়ারম্যান একতরফাভাবে মালিকপক্ষের অবস্থানকে সমর্থন করে শ্রমিকদের দায়ী করেছেন। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন, চেয়ারম্যান তার বক্তব্যে দাবি করেছেন যে দেশের অনেক চা-শিল্প লোকসানে রয়েছে এবং শ্রমিকদের কাজের অনীহা উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নের মতে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন বাগানে এখনো মজুরি, প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থ পরিশোধ, আবাসন, চিকিৎসাসেবা ও শ্রমিক কল্যাণসংক্রান্ত বহু সমস্যা বিদ্যমান। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানিসহ (এনটিসি) বিভিন্ন বাগানে শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয় সংবাদ সম্মেলনে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “চা-শ্রমিকদের দোষারোপ করে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের চা উৎপাদনের অবস্থান নিয়ে গর্ব করা এক ধরনের আত্মবিরোধী অবস্থান। যদি শ্রমিকরা সত্যিই মাত্র ৩ বা ৪ ঘণ্টা কাজ করতেন, তাহলে কীভাবে বাংলাদেশ বিশ্বে চা উৎপাদনে অষ্টম অবস্থানে পৌঁছেছে?”
সংগঠনটির নেতারা অভিযোগ করেন, চা-বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্যে চা-শ্রমিকদের জীবনসংগ্রামকে খাটো করে দেখা হয়েছে। তাদের মতে, প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চা-শ্রমিকরাই দেশের চা-শিল্পের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে আসছেন। সেই শ্রমিকদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে এমন মন্তব্য করা অনভিপ্রেত এবং তা শ্রমিক সমাজে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের বক্তব্য প্রত্যাহার এবং শ্রমিকদের কাছে দুঃখ প্রকাশের দাবি জানায়। পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, সম্মান ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শ্রমিক নেতারা বলেন, দেশের চা-শিল্পের উন্নয়নে শ্রমিকদের অবদানকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শ্রমিকরা অত্যন্ত কম মজুরিতে কঠোর পরিবেশে কাজ করছেন। অথচ তাদের জীবনমান উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আবাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলো এখনো অবহেলিত।
শ্রমিক অসন্তোষ ও শিল্পের বাস্তবতা
সংবাদ সম্মেলনে শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা বলেন, গত কয়েক বছরে চা-শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও কর্মবিরতি হয়েছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মজুরি এখনো নিশ্চিত হয়নি। পাশাপাশি অনেক বাগানে স্বাস্থ্যসেবা, স্যানিটেশন, নিরাপদ আবাসন ও শিক্ষা সুবিধার ঘাটতি রয়েছে।
তারা বলেন, চা-শিল্পকে টেকসই করতে হলে শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকদের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে শিল্পের সংকটের দায় তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমস্যার সমাধান নয়। বরং শ্রমিক, মালিক ও সরকারের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে চা-শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান; একাত্তর টিভির মৌলভীবাজার প্রতিনিধি আহমেদ ফারুক মিল্লাদ, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি ও দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকার প্রতিনিধি দীপঙ্কর ভট্টাচার্য লিটন, প্রথম আলোর প্রতিনিধি শিমুল তরফদার, আরটিভির প্রতিনিধি চৌধুরী ভাস্কর হোম, ডেইলি অবজারভারের প্রতিনিধি রূপম আচার্য, দৈনিক সকালের খবরের প্রতিনিধি রাজেশ ভৌমিকসহ অন্য সাংবাদিকরা।
চা-শ্রমিকদের বাস্তবতা আড়াল করা হয়েছে: সৈয়দ আমিরুজ্জামান
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে এক প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক উপদেষ্টা, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, চা-বোর্ড চেয়ারম্যানের বক্তব্য “বিভ্রান্তিকর, অবিবেচনাপ্রসূত ও চা শ্রমিকদের জন্য অবমাননাকর”। তিনি বলেন, “জাতীয় টেলিভিশনে চা-শ্রমিকদের নিয়ে যেভাবে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। শ্রমিকরা দৈনিক মাত্র ১৮৭ টাকা মজুরিতে অমানবিক পরিবেশে কাজ করছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নির্ধারিত নিরিখ পূরণ করতে তাদের ৮ ঘণ্টারও বেশি সময় শ্রম দিতে হয়।”
তিনি আরও বলেন, অধিকাংশ চা-বাগানে নিরাপদ কর্মপরিবেশের অভাব রয়েছে। বিশুদ্ধ পানীয় জল, বিশ্রামের স্থান কিংবা রোদ-বৃষ্টি থেকে সুরক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেই অনেক জায়গায়। এমন পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করা তাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও বঞ্চনার ইতিহাসকে অপমান করার শামিল।
সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “চা-শ্রমিকদের কাজের প্রতি অনীহা আছে বা তাদের জীবনযাত্রা অনেক উন্নত—এ ধরনের বক্তব্য বাস্তবতাকে আড়াল করার চেষ্টা। দেশের চা-শিল্পের বৃহত্তর স্বার্থে বাংলাদেশ চা-বোর্ড চেয়ারম্যানের উচিত তার বক্তব্য প্রত্যাহার করা।”

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি