ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন জরুরি: জাতীয় কৃষক সমিতির সমাবেশে মানিক

প্রকাশিত: ৭:৩৬ অপরাহ্ণ, মে ৯, ২০২৬

ক্ষতিগ্রস্ত ধানচাষিদের পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন জরুরি: জাতীয় কৃষক সমিতির সমাবেশে মানিক

Manual1 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৯ মে ২০২৬ : দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর এলাকায় সাম্প্রতিক অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি ও নদ-নদীর পানি বৃদ্ধিতে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ, খাদ্য সহায়তা ও কৃষি পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে জাতীয় কৃষক সমিতি। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ও কৃষক নেতা কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক বলেছেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকরা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভরসা। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগে তাদের জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হলেও কার্যকর ও টেকসই পুনর্বাসন উদ্যোগের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

Manual5 Ad Code

শনিবার (৯ মে) বিকেল ৪টায় রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জাতীয় কৃষক সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। কর্মসূচিতে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কৃষক নেতা কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক দীপংকর সাহা দীপু।

Manual7 Ad Code

সমাবেশ শেষে একটি র‍্যালি তোপাখানা রোড প্রদক্ষিণ করে জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

হাওরে ভয়াবহ ফসলহানি

সমাবেশে বক্তারা বলেন, চলতি মৌসুমে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টির কারণে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও সম্পূর্ণ, কোথাও আংশিকভাবে ফসল নষ্ট হয়েছে। ফলে লাখো কৃষক পরিবার বছরের একমাত্র প্রধান ফসল হারিয়ে চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

সভাপতির বক্তব্যে মাহমুদুল হাসান মানিক বলেন, “হাওরাঞ্চল দেশের খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। এখানকার বোরো ধান জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। এবারও বহু কৃষক তাদের স্বপ্নের ফসল ঘরে তুলতে পারেননি।”

তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় কৃষকরা ব্যাপক ফসলহানির শিকার হলেও সরকার এখনো পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে পারেনি। এতে কৃষক পরিবারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে। তিনি অবিলম্বে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যূনতম ২০ হাজার টাকা করে নগদ সহায়তা প্রদানের দাবি জানান।

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবি

সমাবেশে কৃষক নেতারা বলেন, মধ্যস্বত্বভোগী ও বাজার সিন্ডিকেটের কারণে কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষকরা লাভজনক দাম পাচ্ছেন না। বক্তারা সরকারি উদ্যোগে সরাসরি ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের কাছ থেকে ধান ক্রয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

মাহমুদুল হাসান মানিক বলেন, “কৃষকের উৎপাদিত ধানের লাভজনক মূল্য নিশ্চিত করতে হবে। খোদ কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান ক্রয়ের কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। ধান সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত প্যাডি সাইলো নির্মাণ এবং কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণ সহজলভ্য করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, সার, বীজ, কীটনাশক ও সেচ সুবিধা নিশ্চিত না করলে আগামী মৌসুমে কৃষকরা নতুন করে চাষাবাদে আগ্রহ হারাতে পারেন। এতে জাতীয় খাদ্য উৎপাদনও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

ঋণের বোঝায় বিপর্যস্ত কৃষক পরিবার

মানববন্ধনে বক্তারা জানান, হাওরাঞ্চলের বহু কৃষক এনজিও, ব্যাংক ও স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছিলেন। কিন্তু আকস্মিক বন্যায় ফসল নষ্ট হওয়ায় এখন তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতারা অভিযোগ করেন, প্রতিবছর দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে অধিকাংশ কৃষক পর্যাপ্ত সহায়তা পান না। ফলে তারা ঋণ, খাদ্যসংকট ও জীবিকার অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যান।

বক্তারা বলেন, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী অনেক এলাকায় ধান কাটার আগেই ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা আধাপাকা ধান কেটে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও অতিবৃষ্টি ও পানি বৃদ্ধির কারণে তা সম্ভব হয়নি।

জরুরি সহায়তা ও পুনর্বাসনের দাবি

সমাবেশ থেকে সরকারের কাছে কয়েকটি জরুরি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

Manual2 Ad Code

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ন্যায্য ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান,
জরুরি ভিত্তিতে নগদ আর্থিক সহায়তা,
আগামী মৌসুমে বিনামূল্যে বীজ, সার ও কৃষি উপকরণ সরবরাহ,
কৃষিঋণ মওকুফ অথবা সহজ শর্তে পুনঃতফসিল,
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ছয় মাসের খাদ্য সহায়তা,
গবাদিপশুর জন্য বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ,
সংগৃহীত পাকা ধান সংরক্ষণের ব্যবস্থা,
হাওরাঞ্চলে প্যাডি সাইলো নির্মাণ,
কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণে সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি।

নেতৃবৃন্দ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত পুনর্বাসন না করা হলে আগামী মৌসুমে আবাদ ব্যাহত হতে পারে। এতে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর গুরুত্বারোপ

কৃষক নেতারা বলেন, প্রতিবছর অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি ও বাঁধ ভাঙনের কারণে হাওরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ফসলহানি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল তাৎক্ষণিক ত্রাণ বা সহায়তা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও টেকসই অবকাঠামো উন্নয়ন।

তারা হাওরাঞ্চলে টেকসই ও স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, আধুনিক পানি ব্যবস্থাপনা, নদী খনন, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানান।

জাতীয় কৃষক সমিতির নেতারা বলেন, “দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে হাওরাঞ্চলের কৃষকদের টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এজন্য সরকারের দ্রুত, কার্যকর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।”

অসম বাণিজ্য চুক্তির বিরোধিতা

সমাবেশে বক্তারা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে বিদ্যমান অসম বাণিজ্য চুক্তিরও সমালোচনা করেন। তাদের অভিযোগ, এ ধরনের চুক্তি দেশের কৃষি ও কৃষক স্বার্থের পরিপন্থী এবং দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

বক্তারা বলেন, বিদেশি কৃষিপণ্য ও বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষাকারী নীতির ফলে দেশীয় কৃষকরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। তাই কৃষি ও কৃষকের স্বার্থবিরোধী যেকোনো অসম চুক্তি বাতিল করতে হবে।

বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের অংশগ্রহণ

সমাবেশে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেতমজুর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রাজু, জাতীয় কৃষক সমিতির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মোস্তফা আলমগীর রতনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।

এছাড়া উপস্থিত ছিলেন জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা হবিবর রহমান, তানভীর রুসমত, সাইদুর রহমান, রাজিয়া সুলতানা, জাতীয় শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় নেতা সাব্বাহ আলী খান কলিন্স, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মুর্শিদা আখতার নাহার, বাংলাদেশ নারী মুক্তি সংসদের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শিউলি শিকদার, সহ-সাধারণ সম্পাদক সাহানা ফেরদৌসি লাকী, বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সাধারণ সম্পাদক তাপস দাস এবং বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি অতুলন দাস আলো।

কৃষক নেতারা অভিযোগ করেন, দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তা কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব, পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের সমস্যা হয়ে রয়েছে। এজন্য ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন ও সহায়তা বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিও জানান তারা।

Manual8 Ad Code

খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, হাওরাঞ্চল দেশের বোরো ধানের অন্যতম প্রধান উৎপাদন এলাকা। এ অঞ্চলে উৎপাদিত ধান জাতীয় খাদ্য ভাণ্ডারে বড় অবদান রাখে। ফলে বড় আকারে ফসলহানি হলে তার প্রভাব শুধু কৃষকের জীবিকাতেই নয়, সামগ্রিক খাদ্য বাজার ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাওরাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। ফলে অকাল বন্যা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকিও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ বাস্তবতায় কৃষকদের জন্য বিশেষ দুর্যোগ বীমা, আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা এবং কৃষি পুনর্বাসনের স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে।

বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

মানববন্ধন থেকে জাতীয় কৃষক সমিতির নেতারা সরকারের প্রতি দ্রুত দাবিগুলো বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। অন্যথায় সারাদেশে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা।

বক্তারা বলেন, “কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। হাওরের কৃষকদের রক্ষা করা মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে রক্ষা করা।”

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি

আন্দোলনের কর্মসূচি সফল হওয়ায় সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় কৃষক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং আরপি নিউজের সম্পাদক কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “প্রতিবছরই হাওরাঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।”

তিনি আরও বলেন, “ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচাতে সরকার কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ