সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলায় মস্কোয় ৩য় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ফোরাম শুরু

প্রকাশিত: ৭:২২ পূর্বাহ্ণ, মে ২৫, ২০২৬

সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলায় মস্কোয় ৩য় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ফোরাম শুরু

Manual4 Ad Code
সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ঐক্যের ডাক

বিশেষ প্রতিনিধি | মস্কো (রাশিয়া), ২৫ মে ২০২৬ : সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংগ্রাম জোরদার করার নিমিত্তে ঐক্যের ডাক দিয়ে রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে শুরু হয়েছে পাঁচদিনব্যাপী ৩য় আন্তর্জাতিক ফ্যাসিবাদ-বিরোধী ফোরাম।

বিশ্বের শতাধিক দেশের রাজনৈতিক দল, শ্রমিক সংগঠন, শান্তি আন্দোলন, বামপন্থী শক্তি, বুদ্ধিজীবী ও আন্তর্জাতিক সংহতি সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এই ফোরামকে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমাবেশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

পাঁচ দিনব্যাপী এই সম্মেলন আগামী ২৮ মে পর্যন্ত চলবে। ফোরামের মূল আলোচ্যসূচির মধ্যে রয়েছে—বিশ্বব্যাপী ফ্যাসিবাদী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী শক্তির উত্থান, চলমান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্তর্জাতিক সংহতি এবং আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনের নতুন কৌশল নির্ধারণ।

ফোরামের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেন রাশিয়ান ফেডারেশনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআরএফ) নেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান কমরেড গেনাদি জ্যুগানভ। তিনি মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের আত্মত্যাগের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে বলেন, আজও বিশ্ব এমন এক সংকটময় সময় অতিক্রম করছে, যেখানে ১৯৪৫ সালের মতোই ঐক্য, সাহস এবং রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রয়োজন রয়েছে।

“নাৎসিবাদকে পরাজিত করতে যেমন ঐক্য লেগেছিল, আজও তেমন ঐক্য দরকার”

উদ্বোধনী ভাষণে কমরেড জ্যুগানভ বলেন, “আজকের বিশ্ব আবারও ফ্যাসিবাদ, উগ্র জাতীয়তাবাদ, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের হুমকির মুখোমুখি। নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় সোভিয়েত জনগণ যে আত্মত্যাগ করেছিল, বর্তমান প্রজন্মের সামনে সেই ইতিহাস পুনরায় স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি।”

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। তাঁর ভাষায়, “১৯৪৫ সালের মে মাসে যখন সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে ফ্যাসিস্ট শক্তিকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিল, তখন প্রতি দশজন সৈন্যের মধ্যে সাতজনই ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি ও কমসোমলের সদস্য।”

কমরেড জ্যুগানভ বলেন, মহান দেশপ্রেমিক যুদ্ধে বিজয় কেবল সামরিক শক্তির ফল ছিল না; এটি ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, জনগণের ঐক্য এবং কমিউনিস্ট রাজনৈতিক সংগঠনের শক্তির ফলাফল। তিনি বলেন, “ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে কমিউনিস্টদের অবদান ছিল নির্ধারণমূলক। ইতিহাসকে বিকৃত করার যেকোনো প্রচেষ্টা মানবজাতির জন্য বিপজ্জনক।”

ইউক্রেন সংকট ও ‘বান্দেরা জাতীয়তাবাদ’ প্রসঙ্গ

রাশিয়ার কমিউনিস্ট নেতা তাঁর বক্তব্যে ইউক্রেন পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় সংকট হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন, পশ্চিমা শক্তিগুলো দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে উগ্র জাতীয়তাবাদী ও রুশবিরোধী শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে।

কমরেড জ্যুগানভ আরও বলেন, সোভিয়েত আমলে ইউক্রেন ছিল একটি শিল্পোন্নত ও সমৃদ্ধ প্রজাতন্ত্র, যেখানে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও জাহাজ নির্মাণসহ বহু উন্নত শিল্প গড়ে উঠেছিল। তিনি বলেন, “ইউক্রেন ছিল সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার একটি সফল মডেল। সেখানে শিক্ষিত, দক্ষ এবং সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ জনগোষ্ঠী বসবাস করত। কিন্তু আজ সেই ভূখণ্ডকে যুদ্ধ, ঘৃণা ও নাৎসিবাদী মতাদর্শের পরীক্ষাগারে পরিণত করা হয়েছে।”

Manual6 Ad Code

তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ইউক্রেনে ‘বান্দেরা আদর্শ’-এর বিস্তার ঘটানো হয়েছে এবং সেটিকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “একসময়ের সমৃদ্ধ অঞ্চলকে আজ একটি রক্তক্ষরণময় সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে।”

“বিশ্বব্যাপী অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চলছে”

ফোরামে বক্তব্য রাখতে গিয়ে কমরেড জ্যুগানভ বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে “বৈশ্বিক অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, “সন্ত্রাসবাদ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক আধিপত্য ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রামে জনগণের ঐক্য গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।”

তিনি অংশগ্রহণকারীদের উদ্দেশে বলেন, “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে শুধু সামরিক শক্তি নয়, ইতিহাসের শিক্ষা, রাজনৈতিক চেতনা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জনগণকে ঐক্যবদ্ধ না করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিজয় অর্জন সম্ভব নয়।”

রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির এই নেতা আরও বলেন, গত এক শতাব্দী ধরে বৃহৎ পুঁজিবাদী শক্তিগুলো বিভিন্ন দেশে ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে। তাঁর মতে, বিশ্বব্যাপী সংঘাত, অভ্যুত্থান, সামরিক হস্তক্ষেপ ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পেছনে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ভূমিকা রয়েছে।

প্রদর্শনীতে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী বার্তা

ফোরামের অংশ হিসেবে একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। প্রদর্শনীতে গত একশ বছরে বিভিন্ন সামরিক হস্তক্ষেপ, যুদ্ধ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও তথাকথিত “রঙিন বিপ্লব”-এর ইতিহাস তুলে ধরা হয়।

আয়োজকরা বলেন, গত শতকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ হস্তক্ষেপে অন্তত ৩৫টি রাষ্ট্র আক্রান্ত হয়েছে এবং প্রায় ৫০টি দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে।

প্রদর্শনীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক দলিল, নাৎসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ছবি, সোভিয়েত লাল ফৌজের অবদান এবং সমকালীন যুদ্ধবিরোধী প্রচারণার নানা উপস্থাপনাও স্থান পেয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ইতিহাসের পুনর্মূল্যায়ন এবং যুদ্ধবিরোধী আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

আন্তর্জাতিক বামপন্থী ও শান্তি আন্দোলনের মিলনমেলা

ফোরামে অংশ নিয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট ও শ্রমিক শ্রেণির পার্টি, ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি, শান্তিকর্মী ও গবেষকরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বামপন্থী শক্তির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার বিষয়টি বিভিন্ন অধিবেশনে গুরুত্ব পাচ্ছে।

সম্মেলনের প্রাথমিক অধিবেশনগুলোতে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা ফ্যাসিবাদ, সামরিক জোটের সম্প্রসারণ, অর্থনৈতিক অবরোধ, দখলদারিত্ব ও বহুজাতিক করপোরেট আধিপত্যের বিরুদ্ধে সমন্বিত আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের চলমান সংঘাত, পশ্চিমা সামরিক জোটের ভূমিকা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং যুদ্ধ অর্থনীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। একই সঙ্গে, তারা আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনের নতুন সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

Manual3 Ad Code

এই আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশ থেকেও প্রতিনিধি অংশ নিয়েছেন। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সভাপতি কমরেড সাজ্জাদ জহির চন্দন সম্মেলনে উপস্থিত রয়েছেন। তিনি বিভিন্ন বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক শান্তি, গণতন্ত্র, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার এবং সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রশ্নে সংহতির অবস্থান তুলে ধরেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

আন্তর্জাতিক ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান

ফোরামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা হচ্ছে—ফ্যাসিবাদ, যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক ঐক্য গড়ে তোলা। সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্ব থেকেই অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা একটি সমন্বিত আন্তর্জাতিক ফ্রন্ট গঠনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

সম্মেলনে গৃহীত প্রাথমিক সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, বর্তমান সময়ে বিশ্বব্যাপী উগ্র জাতীয়তাবাদ, যুদ্ধনীতি, অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সংগঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের বামপন্থী, গণতান্ত্রিক ও শান্তিকামী শক্তির মধ্যে সাংগঠনিক সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্মেলনের বাকি অধিবেশনগুলোতে আন্তর্জাতিক শান্তি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা, যৌথ রাজনৈতিক ঘোষণা, সাংগঠনিক কৌশল এবং বৈশ্বিক যুদ্ধবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হবে। আগামী বছরের জন্য একটি কৌশলগত রূপরেখা ও যৌথ ঘোষণা চূড়ান্ত করা হবে বলেও আয়োজকরা জানিয়েছেন।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ফোরামের তাৎপর্য

Manual1 Ad Code

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বিশ্বে যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সামরিক জোটের বিস্তার এবং ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণ ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন মস্কোর এই ফোরাম আন্তর্জাতিক বামপন্থী ও যুদ্ধবিরোধী রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

তাদের মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সংকট, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং নতুন ধরনের রাজনৈতিক মেরুকরণ বিশ্বকে আবারও অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ফ্যাসিবাদবিরোধী ও শান্তিকামী শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফোরামের আলোচনায় অংশ নেওয়া প্রতিনিধিদের অনেকেই মনে করেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত আরও তীব্র হবে এবং সে কারণেই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংগঠিত রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

Manual5 Ad Code

মস্কোর এই আন্তর্জাতিক ফোরাম তাই কেবল একটি রাজনৈতিক সম্মেলন নয়; বরং চলমান বৈশ্বিক সংঘাত ও শক্তির পুনর্বিন্যাসের প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে একটি বৃহত্তর আদর্শিক বিতর্কের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ