মৌলভীবাজারে জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন

প্রকাশিত: ৪:৫১ অপরাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৬

মৌলভীবাজারে জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের উদ্বোধন

Manual5 Ad Code
  • শিক্ষা, গবেষণা ও জনসেবার বহুমুখী কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে স্থাপনাটি

নিজস্ব প্রতিবেদক | মৌলভীবাজার, ০৭ জুলাই ২০২৬ : মৌলভীবাজারে বহুল প্রতীক্ষিত জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে।

সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত চারতলা বিশিষ্ট এই আধুনিক স্থাপনাটি শুধু নামাজ আদায়ের স্থান নয়; ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা, ইমাম প্রশিক্ষণ, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিভিন্ন জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনার একটি সমন্বিত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই ২০২৬) দুপুর ১২টায় সদর উপজেলার জগন্নাথপুর এলাকায় নির্মিত মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের ফিতা কেটে এবং ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এর উদ্বোধন করেন মৌলভীবাজার-৩ আসনের সংসদ সদস্য এম নাসের রহমান।

অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলের সভাপতিত্বে গেস্ট অব অনার হিসেবে বক্তব্য দেন চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মো. মুমিনুল হক।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মো. মনিরুল ইসলাম, জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. ফয়জুল করিম ময়ূন, জেলা পরিষদের প্রশাসক মিজানুর রহমান, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মামুন আল ফারুক, জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপন, মডেল মসজিদ প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মাদ ফেরদৌস-উজ-জামান এবং গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ফয়সাল রহমান।

এছাড়া বক্তব্য দেন মৌলভীবাজার টাউন কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা সামসুল ইসলাম এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশন মৌলভীবাজারের উপপরিচালক ফারুক আলম।

Manual8 Ad Code

অনুষ্ঠান শেষে যোহরের নামাজ আদায়, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে উপস্থিত অতিথি ও মুসল্লিদের মধ্যে শিরনি বিতরণ করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে অতিথিরা মসজিদ প্রাঙ্গণে বিভিন্ন ফলজ গাছের চারা রোপণ করেন।

‘মসজিদ হবে সমাজ গঠনের কেন্দ্র’

বক্তারা বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সময় মসজিদ ছিল শুধু ইবাদতের স্থান নয়; রাষ্ট্র পরিচালনা, শিক্ষা, বিচার এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডেরও কেন্দ্র। আধুনিক প্রেক্ষাপটে সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করেই জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।

তাঁরা বলেন, এই কেন্দ্র থেকে ইসলামি শিক্ষা, গবেষণা, নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশ, সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক চেতনা ও জনসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার পাশাপাশি সমাজে শান্তি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায়ও এ কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তাঁরা আশা প্রকাশ করেন।

দীর্ঘ আড়াই বছর পর বাস্তবায়ন

ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের আওতায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে মৌলভীবাজার শহরের উপকণ্ঠে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে জগন্নাথপুর এলাকায় নির্মাণকাজ শুরু হয়।

প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে গণপূর্ত অধিদপ্তর। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মার্ক বিল্ডার্স লিমিটেড নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে। প্রকল্পটি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন কারণে কাজ বিলম্বিত হয়। পরবর্তীতে কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি করে ২০২৬ সালের জুন মাসে নির্মাণকাজ শেষ করা হয়।

প্রায় ৪৫.৭৯ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত চারতলা বিশিষ্ট এই আইকনিক স্থাপনায় ব্যয় হয়েছে প্রায় ১৭ কোটি টাকা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় ১৮ কোটি ৬১ লাখ টাকা হলেও বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যয় ও চুক্তিমূল্যে পরিবর্তন এসেছে।

Manual8 Ad Code

আধুনিক সব সুবিধা

গণপূর্ত বিভাগ ও ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে, জেলা মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রয়েছে—

– শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে একসঙ্গে হাজারো মুসল্লির নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা।
– পুরুষ ও নারীদের জন্য পৃথক নামাজের স্থান।
– আধুনিক অজুখানা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা।
– মৃতদেহ গোসলের কক্ষ।
– বিশাল গাড়ি পার্কিং।
– সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ও গবেষণা কক্ষ।
– কোরআন হিফজ, শিশু শিক্ষা ও দীনি দাওয়াহ কার্যক্রমের জন্য পৃথক ব্যবস্থা।
– ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও হজযাত্রীদের নিবন্ধন এবং প্রশিক্ষণের সুবিধা।
– অতিথিশালা ও বিদেশি দর্শনার্থীদের জন্য আবাসন।
– প্রতিবন্ধীবান্ধব নামাজের ব্যবস্থা।
– ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসন।
– ইসলামিক ফাউন্ডেশনের জেলা কার্যালয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিস।
– জেনারেটর কক্ষ, রান্নাঘর, দৃষ্টিনন্দন সীমানা প্রাচীর এবং সুউচ্চ মিনার।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমে আসবে গতি

Manual3 Ad Code

এতদিন ভাড়া ভবনে পরিচালিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মৌলভীবাজার জেলা কার্যালয় এখন থেকে এই মডেল মসজিদে স্থানান্তরিত হবে। জেলা পর্যায়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সব কার্যক্রম এখান থেকেই পরিচালিত হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মসজিদভিত্তিক গণশিক্ষা, ইমাম প্রশিক্ষণ, ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তার, কোরআন শিক্ষা এবং বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনায় এ কেন্দ্র নতুন মাত্রা যোগ করবে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝেই স্থাপত্যের নতুন আকর্ষণ

Manual3 Ad Code

মসজিদটির একদিকে বিস্তীর্ণ হাওর, অন্যদিকে সবুজ পাহাড়ি টিলা ও বনাঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে হাওরের পানিতে ঘেরা মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে স্থাপনাটি নতুন পর্যটন আকর্ষণ হিসেবেও পরিচিতি পাবে বলে স্থানীয়দের ধারণা। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক দিয়ে চলাচলকারী দূরপাল্লার যাত্রীরাও সহজেই মসজিদটির নান্দনিক স্থাপত্য উপভোগ করতে পারবেন।

স্থানীয়দের মতে, এই মডেল মসজিদ নির্মাণের ফলে জগন্নাথপুরসহ আশপাশের এলাকার সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

জনবল নিয়োগ এখনো বাকি

তবে উদ্বোধন হলেও মসজিদে এখনও পেশ ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মাসের ১৮ জুলাইয়ের মধ্যে এসব পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে। এরপর পূর্ণাঙ্গভাবে মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সব কার্যক্রম চালু হবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ