ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের অমর শহীদ দীনেশ গুপ্ত

প্রকাশিত: ১:৩৫ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ৭, ২০২৬

ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রামের অমর শহীদ দীনেশ গুপ্ত

Manual1 Ad Code
  • আত্মত্যাগ, আদর্শ ও ইতিহাসের এক দীপ্ত অধ্যায়

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৭ জুলাই ২০২৬ : ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাঁদের আত্মত্যাগ কেবল একটি সময়কে নয়, পরবর্তী প্রজন্মের স্বাধীনতার চেতনাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত সেই বিরল বীরদের একজন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লবের পথ বেছে নিয়ে তিনি মাত্র উনিশ বছর বয়সে ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে ওঠেন। ১৯৩১ সালের ৭ জুলাই আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। আজ তাঁর শাহাদাতের ৯৫তম বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি এই মৃত্যুঞ্জয়ী বিপ্লবীকে।

দীনেশ গুপ্তের জীবন কেবল একজন তরুণ বিপ্লবীর ব্যক্তিগত সাহসিকতার কাহিনি নয়; এটি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মমর্যাদা, প্রতিবাদ ও আত্মত্যাগের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

শৈশব ও বেড়ে ওঠা

দীনেশ গুপ্ত জন্মগ্রহণ করেন ১৯১১ সালের ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) এক সম্ভ্রান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর পিতা সতীশচন্দ্র গুপ্ত ছিলেন ডাক বিভাগের কর্মকর্তা এবং মাতা বিনোদিনী দেবী ছিলেন স্নেহশীলা ও ধর্মপ্রাণ নারী। পরিবারে তাঁর ডাকনাম ছিল “নসু”। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয় সন্তান।

পিতার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন স্থানে বসবাসের সুযোগ হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গৌরীপুর পাঠশালায়। পরে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল দুর্দমনীয় সাহস, নেতৃত্বের গুণ, বাগ্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মনোভাব। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, বিপ্লবী সংগঠনের কর্মকাণ্ড এবং ব্রিটিশ শাসনের নির্মমতা তাঁর রাজনৈতিক চেতনাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

বিপ্লবী জীবনের সূচনা

স্কুলজীবনেই তিনি গোপন বিপ্লবী সংগঠন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (Bengal Volunteers)-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯২৬ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি মেদিনীপুরে বড় ভাইয়ের কাছে যান এবং সেখানে বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। দলের নির্দেশে কখনও ঢাকা, কখনও মেদিনীপুর—উভয় স্থানেই সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন।

১৯২৮ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষায় অংশ নিলেও উত্তীর্ণ হতে পারেননি। কিন্তু পড়াশোনার সাময়িক ব্যর্থতা তাঁকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। বরং তিনি মেদিনীপুরে সংগঠন সম্প্রসারণ, নতুন সদস্য সংগ্রহ এবং তরুণদের আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

একই সময়ে কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে সংগঠিত বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের কর্মকাণ্ড আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। দীনেশ গুপ্ত অল্প সময়ের মধ্যেই সংগঠনের অন্যতম দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য কর্মীতে পরিণত হন।

মেদিনীপুরে বিপ্লবী সংগঠন গঠন

মেদিনীপুর তখন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দীনেশ গুপ্ত সেখানে সাংগঠনিক দক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং সামরিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একদল সাহসী তরুণকে গড়ে তোলেন। তাঁর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিপ্লবীদের মাধ্যমে পরবর্তীকালে জেলার তিনজন ব্রিটিশ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট—জেমস পেডি, রবার্ট ডগলাস এবং বি.ই.জে. বার্জ—হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এসব ঘটনা ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেয় এবং বিপ্লবী আন্দোলনকে নতুন মাত্রা দেয়।

রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান: ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

Manual5 Ad Code

ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বরের রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান একটি মাইলফলক। তৎকালীন কারা বিভাগের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এন.এস. সিম্পসন বিপ্লবী বন্দিদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতনের জন্য কুখ্যাত ছিলেন। তাঁকে লক্ষ্য করেই পরিকল্পিত হয় এই ঐতিহাসিক অভিযান।

বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত—এই তিন তরুণ বিপ্লবী ইউরোপীয় পোশাক পরে কলকাতার প্রশাসনিক সদর দপ্তর রাইটার্স বিল্ডিংয়ে প্রবেশ করেন। সুযোগ বুঝে তাঁরা সিম্পসনকে গুলি করে হত্যা করেন।

এরপর শুরু হয় দীর্ঘ গোলাগুলি। ব্রিটিশ পুলিশের বিপুল বাহিনীর সঙ্গে তিন তরুণ বিপ্লবী অসীম সাহসিকতার সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যান। তাঁদের গুলিতে ব্রিটিশ পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আহত হন। কিন্তু একসময় গোলাবারুদ প্রায় শেষ হয়ে আসে।

বন্দি হওয়ার পরিবর্তে আত্মোৎসর্গের সিদ্ধান্ত নেন তিন বিপ্লবী। বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড সেবন করেন। বিনয় ও দীনেশ নিজেদের গুলি করেন। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁদের হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিনয় বসু কয়েকদিন পর শহীদ হন। কিন্তু দীনেশ বেঁচে যান এবং তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।

বিচার ও ফাঁসি

ব্রিটিশ সরকার দীনেশ গুপ্তের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ, হত্যাকাণ্ড এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ পরিচালনার অভিযোগ আনে। বিচার ছিল অনেক ইতিহাসবিদের মতে ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে।

১৯৩১ সালের ৭ জুলাই কলকাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল মাত্র উনিশ বছর।

Manual8 Ad Code

ফাঁসির মঞ্চেও তিনি অসীম সাহস ও আত্মবিশ্বাসের পরিচয় দেন। মৃত্যুকে তিনি ব্যক্তিগত পরাজয় হিসেবে নয়, স্বাধীনতার সংগ্রামে এক অনিবার্য আত্মত্যাগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।

দীনেশ গুপ্তের চিঠি: এক বিপ্লবীর অন্তর্জগৎ

Manual7 Ad Code

কারাগারে বন্দি অবস্থায় দীনেশ গুপ্ত তাঁর পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশে বেশ কয়েকটি চিঠি লিখেছিলেন। এসব চিঠিতে একদিকে যেমন মৃত্যুকে নির্ভয়ে গ্রহণ করার মানসিক দৃঢ়তা প্রকাশ পেয়েছে, অন্যদিকে ফুটে উঠেছে দেশপ্রেম, মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি ও আদর্শের প্রতি অবিচল নিষ্ঠা।

বাংলা সাহিত্যে এই চিঠিগুলো বিশেষ মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ বহু মনীষী তাঁর আত্মত্যাগ ও মানসিক দৃঢ়তার প্রশংসা করেছিলেন।

ইতিহাসে তাঁর অবদান

দীনেশ গুপ্তের আত্মত্যাগ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সশস্ত্র ধারাকে নতুন অনুপ্রেরণা দিয়েছিল। তাঁর জীবন প্রমাণ করে যে স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিক দাবি নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও জাতীয় অস্তিত্বের প্রশ্ন।

রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান ব্রিটিশ প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল যে ভারতীয় তরুণ সমাজ ভয়কে জয় করতে শিখেছে। এই অভিযানের পর উপমহাদেশে বিপ্লবী আন্দোলনের প্রতি সাধারণ মানুষের সহানুভূতি ও সমর্থন আরও বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে দীনেশ গুপ্ত

যদিও দীনেশ গুপ্ত ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, তাঁর জন্মভূমি বর্তমান বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জ। ফলে বাংলাদেশের ইতিহাসেও তিনি সমানভাবে স্মরণীয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তরাধিকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ—এসব আন্দোলনের পেছনে যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা ও আত্মত্যাগের ঐতিহ্য কাজ করেছে, দীনেশ গুপ্তদের সংগ্রাম সেই ধারারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আজকের প্রজন্মের জন্য শিক্ষা

বর্তমান প্রজন্মের কাছে দীনেশ গুপ্ত কেবল ইতিহাসের একটি নাম নন; তিনি আদর্শ, সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় যে অন্যায়, শোষণ ও দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হলে দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, সংগঠিত শক্তি এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা প্রয়োজন।

স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে হলে দীনেশ গুপ্ত, বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং তাঁদের সমসাময়িক বিপ্লবীদের জীবন ও সংগ্রাম নতুন প্রজন্মের কাছে আরও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা জরুরি।

আপনার দেওয়া ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশযোগ্য একটি দীর্ঘ, বিস্তৃত, অক্ষরবৃত্ত ছন্দের কবিতা রচনা করা সম্ভব। তবে একটি বিষয় আগে উল্লেখ করা জরুরি—আপনার লেখায় কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য ও বানানগত অসঙ্গতি রয়েছে (যেমন “ব্রিটিশ”, “পড়াশোনা”, “মৃত্যুবরণ”, “অলিন্দ”, “রাইটার্স বিল্ডিং” ইত্যাদি বানান; এছাড়া কিছু ঘটনার বর্ণনায় ইতিহাসবিদদের মধ্যে ভিন্নমতও রয়েছে)। জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশের আগে তথ্যগুলো নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া ভালো।

বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত স্মরণে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

শহীদ বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত
— সৈয়দ আমিরুজ্জামান |

জুলাই আজও রক্তমাখা, ইতিহাসের পাতা,
বঙ্গমায়ের বুকের মাঝে জাগে অগ্নিগাথা।
আলিপুরের কালো প্রাচীর আজও যেন কাঁদে,
এক তরুণের শেষ প্রহর ঝরে অশ্রুবাদে।

ফাঁসির মঞ্চ দুলে উঠেছিল ভোরের আলো ফোটে,
মৃত্যুকে সে আলিঙ্গন করল হাসিমুখের নোটে।
শৃঙ্খল ভাঙার শপথ বুকে, অবিচল দৃপ্ত প্রাণ,
দেশের তরে জীবন দিল অমর সেই সন্তান।

ঢাকার মাটি জন্ম দিল যে দুর্জয় এক বীর,
মুন্সিগঞ্জের শিশুর চোখে জ্বলে স্বাধীন নীড়।
সতীশচন্দ্রের ঘরের ছেলে, বিনোদিনীর প্রাণ,
দেশের টানে হয়ে উঠল অগ্নিশপথ জান।

শৈশবজুড়ে দুরন্ত হাওয়া, বুকে সাহস ঢেউ,
অন্যায়ের সামনে দাঁড়াত, ভয়কে মানত না কেউ।
কলেজিয়েটের উঠোন জুড়ে জেগে উঠল মন,
দেশের জন্য বাঁচবে সে—এই ছিল সাধন।

শৃঙ্খল দেখে রক্ত ফুটত, অন্যায় দেখলে ক্ষোভ,
পরাধীনতার অন্ধকারে জ্বলত মুক্তির রৌদ্ররূপ।
বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স ডাকে সাড়া দিল প্রাণ,
বিপ্লবীদের সারিতে সে নিল অগ্নিদান।

ঢাকা ছেড়ে মেদিনীপুর—সংগঠনের ডাক,
স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে অনল জ্বালার পাক।
যুবকদের সে শেখাল কেমন শপথ নিতে হয়,
দেশের তরে মৃত্যুও যে জনতারই জয়।

অস্ত্রধারণ পাপ নয় যখন মাতৃভূমি কাঁদে,
শৃঙ্খল যদি রক্ত চায় অত্যাচারের ফাঁদে।
স্বাধীনতার মূল্য দিতে লাগে বুকের রক্ত,
এই বাণী সে লিখে গেল ইতিহাসের শক্ত।

যে হাতে ছিল বইয়ের পাতা, সেই হাতে আজ অস্ত্র,
অন্যায়েরই দুর্গ ভাঙার দৃঢ় অগ্নিযন্ত্র।
যে চোখে ছিল ভবিষ্যতের সোনালি স্বপ্নরেখা,
সেই চোখে আজ স্বাধীনতার অগ্নিশপথ লেখা।

কলকাতার রাইটার্স তখন সাম্রাজ্যের আসন,
সেখানে ছিল অত্যাচারের অহংকারের শাসন।
সিম্পসনেরই নিষ্ঠুর হাতে বন্দিশালার ক্ষত,
অগণিত প্রাণ কেঁদেছিল নির্মম অত্যাচারসত্ত্ব।

বিনয়, বাদল, দীনেশ তখন এক শপথে বাঁধা,
দেশমায়েরই মুক্তির ডাকে মৃত্যুও নয় বাধা।
ইউরোপীয় বেশে তারা ঢুকল দৃপ্তপায়ে,
স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ লুকিয়ে হৃদয়ছায়ে।

হঠাৎ যেন বজ্র নেমে এল রাইটার্সের ঘরে,
অত্যাচারের প্রহরীরা কেঁপে উঠল তরে।
গর্জে উঠল আগুনগোলা, কাঁপল অট্টালিকা,
দাসত্ব ভাঙার ডাক শুনে জাগল ভারতভূমি।

চারদিক জুড়ে বন্দুক গর্জে, ধোঁয়ায় ঢাকা পথ,
তিনটি তরুণ দাঁড়িয়ে রইল অটল অবিরত।
জীবন যেন ক্ষুদ্র হলো স্বাধীনতার তরে,
মৃত্যুকেও তারা হাসিমুখে নিল বক্ষে ধরে।

গুলি যখন শেষের পথে, রক্ত ঝরে ক্ষণ,
তবু তাঁদের চোখে ছিল বিজয়েরই স্বপন।
বন্দি হয়ে লাঞ্ছিত হবে—এ কি মানা যায়?
স্বাধীনতার যোদ্ধাদের সে শিক্ষা নয়।

বাদল খেল বিষের পেয়ালা, শেষ করিল প্রাণ,
বিনয় নিজের রক্তে লিখল অমরতার গান।
দীনেশও গুলি চালাল নিজের কপালপানে,
তবু নিয়তি বাঁচিয়ে রাখল ইতিহাসের টানে।

কারাগারের শীতল কক্ষে শুরু হলো ক্ষণ,
বিচার নামে প্রহসনের নিষ্ঠুর আয়োজন।
রায়ের কালি শুকোয়নি যে, জানা ছিল ফল,
ফাঁসির দড়ি অপেক্ষাতে দাঁড়িয়ে অবিচল।

সাতই জুলাই এল শেষে ভোরের আলোয় ধীরে,
কারারক্ষী নীরব হলো মৃত্যুমঞ্চের নীড়ে।
শৃঙ্খল পরে এগিয়ে গেল তরুণ অগ্নিবীর,
মুখে তখন মাতৃভূমির অমর জয়ের নীর।

ফাঁসির দড়ি চুম্বন করে বলল নীরব বাণী—
“স্বাধীনতার সূর্য উঠবেই, মুছবে অন্ধকারখানি।
আমার প্রাণের বিনিময়ে যদি জাগে দেশ,
তবে মৃত্যুই জীবনের শ্রেষ্ঠ পবিত্র রেশ।”

ঝুলে গেল দেহ, থামল শ্বাস, থামেনি ইতিহাস,
শহীদেরই রক্তে লেখা স্বাধীনতার আভাস।
যে রক্তধারা গঙ্গা-পদ্মা মিলিয়ে দিল স্রোত,
আজও তারই লাল পতাকা জাগায় নতুন জ্যোত।

স্বাধীনতা একদিন এল বহু রক্তস্রোতে,
অগণিত প্রাণ জেগে রইল ইতিহাসের নোটে।
সেই কাতারে দীপ্ত হয়ে দীনেশ নামটি রয়,
প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে দেয় সাহসের পরিচয়।

আজও যখন অন্যায়েরই বিষদাঁত জাগে,
আজও যখন স্বার্থলোভী মানুষ মানবতাকে ভাগে,
দীনেশ তখন মনে করায় অগ্নিশপথ নতুন—
দেশের আগে কিছু নয়, এ জীবনও তুচ্ছ গুণ।

বাংলাদেশ আর ভারতভূমি—ইতিহাসের সেতু,
রক্তের ঋণ ভুলে গেলে নিভে যাবে জ্যোতির রথ।
যে তরুণের প্রাণের দামে জেগেছে স্বাধীন বাণী,
তাঁরই নামে শ্রদ্ধার অঞ্জলি অর্পণ করে প্রাণী।

মুন্সিগঞ্জের মাটি বলে—”আমার সন্তান জাগে”,
কলকাতার কারাপ্রাচীর নীরব সুরে ডাকে।
আলিপুরের বাতাস এখনো শুনে সেই উচ্চারণ—
“দেশের জন্য মৃত্যুই শ্রেষ্ঠ জীবনের সমর্পণ।”

হে দীনেশ, তোমার স্মৃতি নিভে যাওয়ার নয়,
যতদিন এই বাংলা বেঁচে, ততদিন তোমার জয়।
তোমার রক্ত সূর্য হয়ে উদিত হবে নিত্য,
স্বাধীনতার প্রতিটি গান তোমারই অমৃতস্মৃতি।

আজকের এই শ্রদ্ধাঞ্জলি কেবল নয় স্মরণ,
এ আমাদের প্রতিজ্ঞাপত্র, নবজাগরণের ধ্বনন।
অন্যায়েরই সামনে যেন মাথা নত না হয়,
সত্যের পথে জীবন দিলেই ইতিহাস অক্ষয়।

তোমার নামে জাগুক আবার মানবতার দীপ,
স্বাধীনতার পবিত্র বাণী ছড়িয়ে যাক অনুপম রূপ।
শহীদ তুমি—তাই নয় শুধু, তুমি যুগের ডাক,
তোমার জীবন শেখায় কেমন স্বাধীনতার পাক।

জুলাই এলেই বাংলার আকাশ রক্তিম হয়ে যায়,
ফাঁসির দড়ি ফুলের মালা হয়ে ইতিহাস গায়।
বীরের মৃত্যু শেষ নয় কোনো, শুরু অমর পথ,
দীনেশ তুমি দীপশিখা, তুমি স্বাধীন রথ।

যতদিন সূর্য উঠবে, নদী বহবে বেগে,
ততদিন তোমার আত্মদান জাগবে মানুষের রণে।
বঙ্গমাতা মাথা তুলে উচ্চারণ করবে নাম—
“দীনেশ গুপ্ত, তুমি অমর; স্বাধীনতার ধ্রুবধাম।”

Manual6 Ad Code

উপসংহার

মাত্র উনিশ বছরের জীবনে দীনেশ গুপ্ত যে সাহস, আত্মত্যাগ এবং আদর্শিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন, তা উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর ফাঁসি ব্রিটিশ শাসনের কাছে হয়তো একটি বিপ্লবীর জীবনাবসান ছিল, কিন্তু ইতিহাসের বিচারে সেটি ছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে এক অমর আত্মবলিদান।

আজ তাঁর ৯৫তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই তরুণ বিপ্লবীকে, যিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন—দেশপ্রেমের শক্তি কোনো সাম্রাজ্যবাদী শাসনের চেয়েও অনেক বেশি স্থায়ী।

বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত অমর থাকবেন ইতিহাসে, স্বাধীনতার সংগ্রামে এবং বাঙালির জাতীয় চেতনায়।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ