সিলেট ২রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৮ই আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২৬
হোলি আর্টিজান হামলা: দেশের নিরাপত্তা ইতিহাসের গভীর ক্ষত ও স্থায়ী সতর্কবার্তা
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০১ জুলাই ২০২৬ : ঢাকার গুলশানের কূটনৈতিক এলাকার লেকপাড়ে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল জনপ্রিয় রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারি। আজ সেখানে বহুতল আবাসিক ভবন। সময় বদলেছে, স্থান বদলেছে, কিন্তু ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সেই ভয়াল রাতের স্মৃতি এখনো দেশের মানুষের মনে তীব্রভাবে জাগ্রত। এক দশক পেরিয়ে গেলেও হোলি আর্টিজান হামলা শুধু একটি সন্ত্রাসী আক্রমণের ঘটনা নয়; এটি দেশের নিরাপত্তা, সমাজ, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার এবং উগ্রবাদবিরোধী লড়াইয়ের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায়।
আজ সেই হামলার ১০ বছর পূর্ণ হলো। এক দশক পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, হোলি আর্টিজান ছিল কেবল একটি জঙ্গি হামলা নয়—এটি ছিল দেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য এক বড় পরীক্ষা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তির জন্য এক গভীর ধাক্কা এবং সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা উগ্রবাদের নতুন রূপ উন্মোচনের ঘটনা।
যে রাতে বদলে গিয়েছিল দেশের বাস্তবতা
২০১৬ সালের ১ জুলাই ছিল শুক্রবার। ইফতারের পর ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। সন্ধ্যার পরপরই অস্ত্র, চাপাতি ও বিস্ফোরকসদৃশ উপকরণ নিয়ে কয়েকজন তরুণ রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করে এবং শুরু হয় ভয়াবহ জিম্মি সংকট।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় পুলিশ। পরে র্যাব, বিজিবি, সোয়াট ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
রাতেই জিম্মিদের উদ্ধারে এগিয়ে গেলে হামলাকারীদের হামলায় নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার রবিউল করিম এবং বনানী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সালাহউদ্দিন খান। আহত হন আরও অনেকে।
রাতভর গুলশানের সড়কে অপেক্ষা করেন জিম্মিদের স্বজনেরা। ভেতরে থাকা প্রিয়জনেরা জীবিত না মৃত—কেউ কোনো নিশ্চিত তথ্য পাচ্ছিলেন না। পুরো দেশ টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠায় রাত কাটায়।
অপারেশন থান্ডারবোল্ট: অবসান, কিন্তু শুরু দীর্ঘ শোকের
পরদিন ২ জুলাই সকাল ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে শুরু হয় ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’। সাঁজোয়া যান দিয়ে দেয়াল ভেঙে কমান্ডোরা রেস্তোরাঁয় প্রবেশ করেন।
অভিযান দ্রুত শেষ হলেও ভেতরে অপেক্ষা করছিল ভয়াবহ দৃশ্য।
জীবিত উদ্ধার করা হয় ১৩ জনকে। কিন্তু উদ্ধার করা হয় ২০ জন জিম্মির মরদেহ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক। পুলিশের দুই কর্মকর্তাসহ নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ২২ জনে।
এই হামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্থান করে নেয়।
নিহতদের স্মৃতি: সংখ্যার আড়ালে মানুষের গল্প
হোলি আর্টিজানের নিহতদের তালিকা শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবার, একটি স্বপ্ন, একটি অসমাপ্ত জীবন।
বাংলাদেশি তরুণ ফারাজ হোসেন, অবিন্তা কবির ও ইশরাত আখন্দ মানবিক সাহসিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। ভারতীয় নাগরিক তারিশি জৈনও ছিলেন সেই নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন ইতালির নয়জন নাগরিক এবং জাপানের সাতজন নাগরিক, যাঁদের অনেকেই বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা ও বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন।
তাঁদের মৃত্যু শুধু মানবিক বিপর্যয় ছিল না; আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, কূটনৈতিক আস্থা এবং বিদেশিদের নিরাপত্তা সম্পর্কে নতুন প্রশ্নও তৈরি করেছিল।
ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করে হত্যা
তদন্ত ও জীবিত উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বয়ান থেকে উঠে আসে হামলার সবচেয়ে নির্মম দিকগুলোর একটি।
হামলাকারীরা জিম্মিদের ধর্মীয় পরিচয় যাচাই করেছিল। কেউ ধর্মীয় আয়াত বা সুরা পড়তে পারলে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন বেঁচে যান। অন্যদিকে বিদেশি নাগরিকদের অনেককে গুলি করে ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়।
এই নির্মমতা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদবিরোধী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে।
আইএসের দায় স্বীকার, বিতর্কের সূচনা
হামলার সময়ই আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দায় স্বীকার করে। তাদের কথিত প্রচারমাধ্যম ‘আমাক নিউজ’ হামলার ছবি প্রকাশ করে।
তবে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে বলা হয়, হামলাটি পরিচালনা করেছে আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ নব্য জেএমবি-সংশ্লিষ্ট একটি নেটওয়ার্ক।
এই বিতর্ক দীর্ঘদিন আলোচনায় ছিল—হামলাটি কি আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় হয়েছিল, নাকি দেশীয় নেটওয়ার্ক আইএসের মতাদর্শ ব্যবহার করেছিল? তদন্তে শেষ পর্যন্ত দেশীয় নেটওয়ার্কের ভূমিকাই প্রধান হিসেবে উঠে আসে।
চার মাসের বেশি প্রস্তুতি
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, হামলার প্রস্তুতি কয়েক মাস ধরে চলে।
গাইবান্ধার সাঘাটায় একাধিক বৈঠকে কূটনৈতিক এলাকায় বড় ধরনের হামলার পরিকল্পনা করা হয়। হামলার সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব পান কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশি তামিম আহমেদ চৌধুরী।
হামলার জন্য নির্বাচিত হয় পাঁচ তরুণ—রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, খায়রুল ইসলাম পায়েল এবং শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।
পরবর্তীতে তাঁদের ছবি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়।
শিক্ষিত ও সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের উগ্রবাদে জড়ানো
হোলি আর্টিজান হামলার সবচেয়ে আলোচিত দিক ছিল হামলাকারীদের সামাজিক পটভূমি।
রোহান, নিবরাস ও সামেহ ছিলেন শহরের পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী। তাঁরা সচ্ছল পরিবারের সন্তান ছিলেন এবং অনেকের ভবিষ্যৎ ছিল উজ্জ্বল।
এই ঘটনা সমাজে প্রচলিত একটি ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে দেয়—উগ্রবাদ শুধু দরিদ্র বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমস্যা নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, অনলাইন প্রচারণা, পরিচয় সংকট, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, গোপন নেটওয়ার্ক এবং মতাদর্শিক প্রভাব তরুণদের উগ্রপন্থায় টেনে নিতে পারে।
‘হিজরত’-এর নামে নিখোঁজ হওয়ার প্রবণতা
হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজন তরুণ ঘটনার আগে পরিবার ছেড়ে চলে যান।
পরিবারগুলো থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তাঁদের খুঁজছিল। কিন্তু পরে জানা যায়, তাঁরা উগ্রবাদী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
এই অভিজ্ঞতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন সতর্কবার্তা হয়ে ওঠে। আচরণগত পরিবর্তন, হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা, চরমপন্থী মতাদর্শের প্রতি আকর্ষণ কিংবা অনলাইন গোপন যোগাযোগ—এসব বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে আসে।
কেন লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল হোলি আর্টিজান
তদন্তে দেখা যায়, হামলাকারীরা এমন একটি স্থান খুঁজছিল যেখানে বিদেশিদের উপস্থিতি বেশি এবং আন্তর্জাতিক প্রচার পাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
হোলি আর্টিজান ছিল বিদেশি নাগরিকদের কাছে জনপ্রিয়। কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এর প্রতীকী গুরুত্বও ছিল অনেক বেশি।
হামলার আগে একাধিকবার রেস্তোরাঁটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। শুক্রবার সন্ধ্যার ভিড়, অবস্থান এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই এটি চূড়ান্ত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছিল।
হামলার পর পাল্টে যায় রাষ্ট্রীয় কৌশল
হোলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে বড় পরিবর্তন আসে।
দেশজুড়ে ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়। ২০১৬ সালের আগস্টে নারায়ণগঞ্জে অভিযানে নিহত হন তামিম আহমেদ চৌধুরী। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে নব্য জেএমবির বহু সদস্য ও সংগঠককে গ্রেপ্তার বা নিহত করা হয়।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কার্যক্রমও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়।
একই সঙ্গে অনলাইন উগ্রবাদ, নিখোঁজ তরুণদের তালিকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম এবং গোয়েন্দা নজরদারি নতুন গুরুত্ব পায়।
মামলা, বিচার ও রায়
হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়। তদন্তে বলা হয়, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া পাঁচজন ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে। তবে পরিকল্পনা, অর্থায়ন, প্রশিক্ষণ ও লজিস্টিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত কয়েকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়।
২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে উচ্চ আদালতে তাঁদের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করা হয়।
এক দশক পর: কী শিখল বাংলাদেশ?
হোলি আর্টিজান হামলার পর গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ওই মাত্রার আর কোনো হামলা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক দুর্বল করার দাবি করে।
তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সন্ত্রাসী সংগঠনের কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব হলেও উগ্রবাদী মতাদর্শ মোকাবিলা অনেক বেশি দীর্ঘমেয়াদি কাজ।
প্রযুক্তিনির্ভর প্রচারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচয় সংকট, মানসিক বিচ্ছিন্নতা এবং চরমপন্থী বয়ানের বিস্তার এখনো উদ্বেগের বিষয়।
স্থায়ী সতর্কবার্তা হিসেবে হোলি আর্টিজান
এক দশক পরে হোলি আর্টিজান কেবল একটি ট্র্যাজেডির নাম নয়। এটি স্মরণ করিয়ে দেয় যে উগ্রবাদ সমাজের যেকোনো স্তরে প্রবেশ করতে পারে এবং এর প্রভাব সীমান্ত, ধর্ম কিংবা শ্রেণি অতিক্রম করে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং নাগরিক সমাজ—সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে নতুন প্রজন্ম উগ্রবাদী প্ররোচনার শিকার না হয়।
গুলশানের সেই রাত বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বেদনাময় অধ্যায় হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল অস্ত্রের নয়, সচেতনতা, শিক্ষা, সামাজিক সংযোগ এবং মানবিক মূল্যবোধেরও লড়াই।
আজও যখন জুলাই আসে, মেঘে ভিজে নগরী,
লেকের জলে কাঁপন তুলে সন্ধ্যা নামে ধীর,
তখন হঠাৎ মনে পড়ে এক বিভীষণ রাত,
বাংলাদেশের ইতিহাসে রক্তমাখা নীর।
গুলশানের সেই পথটি আজও আছে নীরব,
গাছের ছায়া, বাতাস, জল—সবই যেন চেনা,
তবু কোথাও লুকিয়ে থাকে দীর্ঘশ্বাসের ঢেউ,
একটি রাতের অগ্নিচিহ্ন মুছে যায় না যেন।
যেখানে ছিল অতিথিদের প্রিয় আড্ডার ঘর,
হাসির ভেতর গল্পেরা নিত আপন ঠিকানা,
সেইখানেই নেমে এসেছিল উন্মত্ত অন্ধকার,
মানবতার বুকের ওপর হিংস্রতার থাবা।
সন্ধ্যা ছিল সাধারণই, ইফতারের পরক্ষণ,
দেশি-বিদেশি অতিথিরা বসেছিলেন শান্ত,
কেউবা খুঁজে পেয়েছিলেন কর্মদিবসের বিরাম,
কেউবা ছিলেন ভ্রমণ শেষে ক্লান্ত অথচ কান্ত।
কেউ এসেছিলেন দূর ইতালি, কেউবা জাপান দেশ,
কেউ ছিলেন এই বাংলারই স্বপ্নময় তরুণ,
কে জানত যে কয়েক ক্ষণে রক্তাক্ত হবে রাত,
কে জানত যে নিভে যাবে কত শত আলোকধুন।
হঠাৎ তখন ছিন্ন হলো স্বাভাবিকতার সুর,
অস্ত্র হাতে উগ্রতার দল ঢুকে পড়ল ত্বরায়,
মানুষকে আর মানুষ বলে দেখল না তারা,
ঘৃণার আগুন বহন করে এল মৃত্যুমায়ায়।
চারদিকজুড়ে ছড়িয়ে গেল আতঙ্কিত সংবাদ,
নিরাপত্তার বলয় ঘিরে জমল উৎকণ্ঠা,
স্বজনেরা পথের ধারে প্রার্থনায় দাঁড়ালেন,
কেউ জানেন না কার জীবনে নামবে কোন ক্রান্তা।
রাতের বুকে গুলির শব্দ কাঁপিয়ে দিল ঢাকাকে,
সাইরেন ভেসে গেল দূর থেকে আরও দূরে,
অপেক্ষার সেই প্রতিটি ক্ষণ হয়েছিল দীর্ঘ,
অশ্রু যেন জমেছিল সব মানুষেরই সুরে।
দায়িত্বে যারা এগিয়ে গেল জীবন হাতে নিয়ে,
কর্তব্যের পথ রাঙিয়ে দিল আত্মত্যাগের রক্ত,
তাঁদের নাম উচ্চারণে আজও মাথা নত,
রাষ্ট্র জানে, নাগরিকও রাখে শ্রদ্ধার শক্ত।
তারপর এলো ভোরের আলো, অভিযানের ক্ষণ,
বন্দি সময় ভেঙে দিতে নামল সাহসী দল,
প্রাণ বাঁচানোর প্রত্যয়ে তারা প্রবেশ করল,
কিন্তু ততক্ষণে ইতিহাসে নেমেছে বিষজল।
যখন দেখা গেল ভেতরকার নির্মম দৃশ্যপট,
স্তব্ধ হলো জনপদ আর স্তব্ধ হলো মন,
বিশটি নিরীহ প্রাণ তখন রক্তাক্ত নীরব,
মানবতার হৃদয়জুড়ে নেমে এলো শোকধ্বনন।
ইতালির সেই নাগরিকেরা, জাপানের কর্মী,
ভারতের এক তরুণী আর বাংলার সন্তান,
সবাই মিলে এক মানবিক পরিবারের অংশ,
মৃত্যু এসে কেড়ে নিল তাদের স্বপ্নগান।
ক্লাউদিয়া, ভিনচেনসো আর মার্কোর অসমাপ্ত দিন,
নাদিয়ার সব ভবিষ্যৎ আর সিমোনার হাসি,
ক্রিস্তিয়ানের পথচলা আর মারিয়ার প্রত্যাশা,
রক্তের দাগে লিখে গেল এক বেদনাভাষী।
দূর জাপানের উন্নয়নের বন্ধুরা যে এসেছিলেন,
বাংলার পথে সেতু গড়ার স্বপ্ন নিয়ে হাতে,
তাঁদের জীবন থেমে গেল নিষ্ঠুরতার ছুরিতে,
মানবসভ্যতা কেঁদেছিল গভীর শোকরাতে।
আর ছিল বাংলার বুকের তিনটি উজ্জ্বল নাম,
ফারাজ, অবিন্তা, ইশরাত—স্মৃতির দীপশিখা,
যতদিন এই দেশ থাকবে, ততদিন তাঁদের,
ভালোবাসার ইতিহাসে জ্বলবে অনির্বাণ লেখা।
ফারাজ যেন সাহসের এক আলোকিত প্রতীক,
বন্ধুত্বের মানবিকতা যিনি রেখেছেন উঁচু,
বিপদের মুখোমুখি হয়েও ছাড়েননি আপনজন,
তাঁর স্মৃতি আজও আমাদের করে দৃঢ় পিছু।
কিন্তু শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, ছিল আরও প্রশ্ন,
কীভাবে কিছু তরুণ মন হারাল পথের দিশা?
কেন তারা ঘৃণার ডাকে সমর্পণ করল প্রাণ,
কেন তারা অন্ধকারে দেখল মুক্তির আশা?
যারা ছিল সচ্ছল ঘরের, শিক্ষার আলোয় বড়,
যাদের সামনে খোলা ছিল জীবনের বিস্তার,
কী এমন বিষ ঢুকেছিল নীরব অন্তরালে,
যে তারা বেছে নিল শেষ পর্যন্ত অন্ধকার?
এ প্রশ্ন শুধু পরিবারের নয়, সমগ্র সমাজের,
শিক্ষাঙ্গন আর রাষ্ট্রেরও আত্মসমালোচনা,
উগ্রবাদের বীজ যে গোপনে জন্ম নেয় কখন,
সেটি বোঝার দায় আমাদের, এ বড় প্রজ্ঞাপন।
ইন্টারনেটের অদৃশ্য জাল, বিকৃত ভাষ্য, প্ররোচনা,
পরিচয়ের সংকট কিংবা বিচ্ছিন্নতার ক্ষত,
সব মিলিয়ে তৈরি করে বিপজ্জনক আবহ,
যেখানে যুক্তি হারিয়ে ফেলে বিবেকেরই রথ।
যুবকের চোখে স্বপ্ন থাকে, প্রশ্ন থাকে বহু,
সেই প্রশ্নের উত্তর যদি পায় না আলোর পথে,
তবে কোনো ছদ্মবেশী ডাক টেনে নিতে পারে,
অমানবিক এক গহ্বরের অচেনা অন্ধ রথে।
তাই হোলি আর্টিজানের শিক্ষা শুধু শোক নয়,
এ এক কঠিন সতর্কবার্তা আগামী দিনের,
মানুষকে মানুষ বানানোর দায় যে অবিরাম,
গণতন্ত্রের, শিক্ষার, সংস্কৃতির, মানব নীতির।
পরবর্তী দিনগুলো জুড়ে চলেছিল অভিযান,
ভেঙে দেওয়া হয়েছে বহু গোপন আস্তানা,
আইনের হাতে ধরা পড়েছে নেপথ্যের সহায়,
রাষ্ট্র দিয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী দৃঢ় মানা।
তবু শুধু অস্ত্র ধরলেই শেষ হয় না লড়াই,
ভাবনার ভেতর জন্ম নেয় যে ঘৃণার বিস্তার,
সেটি রুখতে প্রয়োজন হয় মানবিক শিক্ষা,
প্রয়োজন মুক্ত চিন্তার, সহনশীলতার দ্বার।
ধর্ম কখনো শেখায় না নিরপরাধের হত্যা,
কোনো বিশ্বাস বলে না ঘৃণাই শ্রেষ্ঠ পথ,
যে মতবাদ মানুষকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে,
সে মতবাদ শেষ পর্যন্ত ডেকে আনে ক্ষত।
এক দশক পেরিয়ে গেছে, সময় অনেক দূর,
তবু সেই রাত ভেসে ওঠে জুলাইয়ের বাতাসে,
স্বজনহারা চোখের জলে, স্মৃতিস্তম্ভের ফুলে,
নীরব প্রার্থনার শব্দে, ইতিহাসের পাশে।
আজ যেখানে বহুতল ঘর, ব্যস্ত মানুষের চলা,
সেখানে মাটির গভীরে আছে কত স্মরণ,
অদৃশ্য এক শোকস্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে যেন,
মানবতার পক্ষে লেখা অনন্ত উচ্চারণ।
যারা চলে গেছেন সেদিন, তাঁরা শুধু সংখ্যা নন,
প্রত্যেকেই এক পৃথিবী, এক পরিবার, এক স্বপ্ন,
একটি জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অগণন,
হাসি-কান্না, ভালোবাসা, ভবিষ্যতের যাপন।
তাঁদের স্মরণ মানে শুধু ফুল দেওয়া নয়,
মানুষের মর্যাদাকে আরও উঁচুতে ধরা,
তাঁদের স্মরণ মানে ঘৃণার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো,
অন্যায়ের অন্ধকারে আলোর প্রদীপ জ্বলা।
তাঁদের স্মরণ মানে শিশুকে শেখানো আবার,
ভিন্নতা মানেই শত্রু নয়, ভিন্নতা সৌন্দর্য,
সহাবস্থানের শক্তিতেই টিকে থাকে পৃথিবী,
মানবিকতার পথেই লুকায় সভ্যতার গৌরব।
আজও যখন জুলাই আসে, লেকের জলে ঢেউ,
সন্ধ্যা নামে ধীরে ধীরে নগরীর আকাশে,
আমরা তখন মাথা নত করে স্মরণ করি,
যাঁরা রয়ে গেছেন চিরকাল ইতিহাসের পাশে।
বাংলাদেশ যেন শেখে সেই রাত্রির শিক্ষা,
কখনো যেন না ফেরে এমন বিভীষিকা,
যেন তরুণের হাতে থাকে জ্ঞানের আলোকশিখা,
যেন ঘৃণার বদলে জাগে মানবতার দীক্ষা।
যেন কোনো মা আর না খোঁজেন হারানো সন্তান,
যেন কোনো পথ না যায় উগ্রতার ঠিকানায়,
যেন কোনো রক্তাক্ত রাত ভেঙে না দেয় স্বপ্ন,
যেন শান্তির সূর্য ওঠে প্রতিটি প্রভাতবেলায়।
স্মৃতি তোমার বেদনার, তবু স্মৃতি প্রয়োজন,
ভুলে গেলে ইতিহাস আবার ফিরে আসে,
তাই আমরা মনে রাখি গুলশানের সেই রাত,
মানবতার পক্ষে দাঁড়াই দৃঢ় প্রত্যয়ে ভাসে।
এক দশক পরে আজও উচ্চারিত হোক শপথ—
ঘৃণার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে এই দেশ,
মানুষের জয়, জীবনের জয়, সহমর্মিতার জয়,
বাংলাদেশের আকাশজুড়ে উঠুক সেই আবেশ।
আর যারা হারিয়ে গেছেন সেই রাত্রির শেষে,
তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই নীরব অশ্রুজলে,
তাঁদের স্মৃতি থাকুক জাগ্রত বিবেক হয়ে,
বাংলার প্রতিটি হৃদয়, প্রতিটি অনন্ত কলে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি