সততার অনন্য প্রতীক ইউসুফ মিয়া: অন্ধকার সময়ে আলোর দিশা

প্রকাশিত: ১২:০৫ অপরাহ্ণ, জুলাই ১, ২০২৬

সততার অনন্য প্রতীক ইউসুফ মিয়া: অন্ধকার সময়ে আলোর দিশা

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০১ জুলাই ২০২৬ : বিন্দু চাষার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা অবলম্বনে—

বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই শুনি প্রতারণা, অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাস হারিয়ে যাওয়ার গল্প। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই চোখে পড়ে নানা নেতিবাচক ঘটনার খবর। ফলে অনেকেই মনে করেন, সমাজে সততা, নৈতিকতা এবং মানবিকতা যেন দিন দিন বিরল হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য সাধারণ মানুষ আছেন, যাদের অসাধারণ সততা ও মানবিকতা নীরবে সমাজকে আলোকিত করে যাচ্ছে। তারা প্রচারের আলোয় আসেন না, বড় কোনো পদ-পদবির অধিকারী নন, কিন্তু তাদের কর্ম ও চরিত্র আমাদের জন্য হয়ে ওঠে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।

Manual3 Ad Code

শ্রীমঙ্গলের একজন সিএনজি চালক ইউসুফ মিয়া তেমনই একজন মানুষ। তার পরিচয় খুবই সাধারণ—তিনি পেশায় একজন সিএনজি অটোরিকশা চালক। শহরের পাশের একটি গ্রামে তার বসবাস। জীবনের প্রয়োজনে কখনো বিদেশেও কাজ করেছেন বলে জানা যায়। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি একজন সৎ, দায়িত্বশীল এবং মানবিক মানুষ।

ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে খুব সাধারণ মনে হতে পারে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে সামাজিক মূল্যবোধের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

এক ভোরবেলা স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে শ্রীমঙ্গল বাসস্ট্যান্ডে যান লেখক বিন্দু চাষা। গন্তব্য ছিল মিরপুরের নতুন ব্রিজ এলাকা। খুব ভোর হওয়ায় বাস বা অন্যান্য যানবাহন সহজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এমন সময় ইউসুফ মিয়ার সিএনজি অটোরিকশা এসে হাজির হয়। পরিবারের সবাই সেই সিএনজিতে উঠে গন্তব্যের দিকে রওনা দেন।

Manual3 Ad Code

কামাইছড়া এলাকায় নেমে হঠাৎ খেয়াল হলো, কাপড়-চোপড়সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা একটি ব্যাগ সিএনজির পেছনে রয়ে গেছে। ব্যাগটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সামগ্রীও ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, সিএনজির নম্বর জানা নেই, চালকের পূর্ণ পরিচয় জানা নেই, এমনকি তিনি কোন স্ট্যান্ডের চালক সেটিও জানা নেই।

ব্যাগ হারিয়ে যাওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। লেখক আবার শ্রীমঙ্গল শহরে ফিরে যান। বিভিন্ন সিএনজি স্ট্যান্ডে খোঁজ করেন। কিন্তু ভোরবেলা হওয়ায় অধিকাংশ স্ট্যান্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা তখনও উপস্থিত ছিলেন না। অনেকের কাছে জানতে চেয়েও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। একজন চালক জানান, ভোরে মাত্র কয়েকজন সিএনজি চালক রাস্তায় বের হন। কিন্তু তাদের কারো যোগাযোগ নম্বরও তার কাছে ছিল না।

এক পর্যায়ে লেখক নিজের একটি পরিচয়পত্র একজন চালকের কাছে রেখে অনুরোধ করেন, যদি কোনোভাবে সেই ব্যাগ বা চালকের সন্ধান পাওয়া যায়, তাহলে যেন তাকে জানানো হয়। এরপর নিরুপায় হয়ে তিনি বাড়ি ফিরে যান।

সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ধরে নেন, হারানো জিনিস আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষ করে কোনো পরিচয়, নম্বর বা নির্দিষ্ট তথ্য না থাকলে আশার আলো আরও ক্ষীণ হয়ে যায়। কিন্তু এখানেই ঘটনার মোড় বদলে যায়।

সেদিন বিকেলে লেখক যখন হবিগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিক্ষাদান করছিলেন, তখন একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে স্বস্তির খবর—“আপনার ব্যাগ আমার গাড়িতেই আছে।”

নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমার নাম ইউসুফ মিয়া।”

কথা প্রসঙ্গে জানা যায়, লেখক যে পরিচয়পত্রটি একজন চালকের কাছে রেখে এসেছিলেন, সেটির মাধ্যমেই ইউসুফ মিয়া তার যোগাযোগ নম্বর সংগ্রহ করেন। এরপর নিজ উদ্যোগে ফোন করে ব্যাগটির খবর দেন এবং সুবিধামতো সময় এসে নিয়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেন।

এখানেই শেষ নয়। কয়েক দিন পর শ্রীমঙ্গলের উকিলবাড়ি রোডে দেখা হলে ইউসুফ মিয়া নিজ হাতে ব্যাগটি ফিরিয়ে দেন। ব্যাগের কোনো জিনিসপত্রে হাত দেওয়া হয়নি, কিছুই হারায়নি। সবকিছু ছিল অক্ষত।

কৃতজ্ঞতাস্বরূপ লেখক তাকে কিছু আপ্যায়নের অনুরোধ করেন। কিন্তু ইউসুফ মিয়া বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। অনেক অনুরোধের পর সামান্য কিছু অর্থ গ্রহণ করেন, সেটিও মূলত তার সন্তানদের জন্য কিছু কিনে নেওয়ার উদ্দেশ্যে। জানা যায়, তার চার কন্যা সন্তান রয়েছে। স্নেহ ও ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে তিনি নিজের সিএনজির নাম রেখেছেন—“চারকন্যা পরিবহন”।

এই ঘটনা নিছক একটি হারানো ব্যাগ ফিরে পাওয়ার গল্প নয়। এটি আমাদের সমাজে সততা, বিশ্বাস এবং মানবিকতার উপস্থিতির এক উজ্জ্বল দলিল।

আজকের পৃথিবীতে বস্তুগত উন্নয়ন যত দ্রুত ঘটছে, নৈতিক মূল্যবোধের প্রশ্ন ততই আলোচনায় উঠে আসছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা অনেক ক্ষেত্রে কমে গেছে। এমন বাস্তবতায় ইউসুফ মিয়ার মতো মানুষেরা আমাদের মনে করিয়ে দেন—সততা এখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বরং সমাজের নানা স্তরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব মানুষই নৈতিকতার প্রকৃত ধারক।

Manual1 Ad Code

আমাদের সমাজে প্রায়ই পেশাভিত্তিক নানা নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু ইউসুফ মিয়ার ঘটনা প্রমাণ করে, মানুষের পরিচয় তার পেশা নয়; তার প্রকৃত পরিচয় তার চরিত্র ও মূল্যবোধ। একজন সিএনজি চালকও তার সততা দিয়ে এমন উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারেন, যা সমাজের অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তির জন্যও অনুসরণীয় হতে পারে।

সামাজিক আস্থার ভিত্তি গড়ে ওঠে এমন ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে। একজন মানুষ যখন হারানো জিনিস ফিরিয়ে দেন, তখন তিনি শুধু একটি ব্যাগ ফেরত দেন না; তিনি মানুষের প্রতি মানুষের বিশ্বাসও ফিরিয়ে দেন। তিনি সমাজকে জানান যে সততা এখনো বেঁচে আছে, মানবিকতা এখনো নিঃশেষ হয়ে যায়নি।

এ ধরনের মানুষদের গল্প জাতীয়ভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন। কারণ সমাজে ইতিবাচক উদাহরণ যত বেশি প্রচার পাবে, ততই নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হবে। তারা শিখবে যে সফলতার চেয়ে সততা বড়, অর্থের চেয়ে মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যক্তিগত লাভের চেয়ে নৈতিক দায়িত্ব অনেক বেশি সম্মানজনক।

ইউসুফ মিয়া কোনো পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি নন, কোনো আলোচিত ব্যক্তিত্বও নন। তিনি আমাদের আশপাশের একজন সাধারণ মানুষ। কিন্তু তার এই সাধারণ কাজই তাকে অসাধারণ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছে। তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সত্যিকার মহত্ত্ব পদবিতে নয়, বরং চরিত্রে।

Manual7 Ad Code

আমাদের সমাজে ইউসুফ মিয়াদের সংখ্যা যত বাড়বে, ততই শক্তিশালী হবে পারস্পরিক বিশ্বাসের বন্ধন। দুর্নীতি, প্রতারণা ও অবিশ্বাসের বিপরীতে তারা হয়ে উঠবেন নৈতিকতার নীরব সৈনিক। তাদের উপস্থিতিই আমাদের আশ্বস্ত করে—মানুষের ভেতরের ভালোত্ব এখনো হারিয়ে যায়নি।

সততার এই অনন্য প্রতীক ইউসুফ মিয়ার প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। তার মতো মানুষদের কারণেই মানবিকতার আলো আজও নিভে যায়নি। সমাজের প্রতিটি স্তরে এমন মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক—এই প্রত্যাশাই রইল।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ