অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই, ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

প্রকাশিত: ৪:০৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২৬

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই, ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

Manual2 Ad Code
  • বাংলা একাডেমির সভাপতির মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে শোকের ছায়া

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৫ জুলাই ২০২৬ : প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

রবিবার (৫ জুলাই ২০২৬) দুপুরে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। তাঁর মৃত্যুতে দেশের সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, দুপুরে অসুস্থ হয়ে পড়লে অধ্যাপক ফজলুল হককে রাজধানীর মিরপুরের একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুপুর আড়াইটা থেকে তিনটার মধ্যে তিনি মারা যান।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, “স্যার দুপুরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি। আমরা বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে তাঁর বাসভবনে যাচ্ছি। পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে দাফন, জানাজা ও রাষ্ট্রীয়-সামাজিক শ্রদ্ধা নিবেদনের বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে।”

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, সাহিত্যসমালোচক ও শিক্ষাবিদ। রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি, জাতীয়তাবাদ, ভাষা, সাহিত্য এবং মুক্তচিন্তা নিয়ে তাঁর দীর্ঘ গবেষণা ও লেখালেখি তাঁকে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষ করে রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতিকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্লেষণের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন।

Manual7 Ad Code

১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জ জেলার পাকুন্দিয়া উপজেলার পাকুন্দিয়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশব ও কৈশোরের শিক্ষা শেষে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীকালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে সাহিত্য, ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন ছিলেন প্রাজ্ঞ ও অনুকরণীয়, তেমনি একজন গবেষক ও লেখক হিসেবে ছিলেন গভীর বিশ্লেষণধর্মী।

বাংলা ভাষার সর্বস্তরে ব্যবহার নিশ্চিত করা, ভাষাভিত্তিক জাতীয় চেতনার বিকাশ এবং স্বাধীন চিন্তার প্রসারে তিনি আজীবন কাজ করে গেছেন। ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল সুস্পষ্ট এবং যুক্তিনির্ভর। প্রবন্ধ, গবেষণা ও বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।

Manual4 Ad Code

তিনি দীর্ঘদিন ‘সুন্দরম’ ও ‘লোকায়ত’ নামে দুটি সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য **‘একুশে ফেব্রুয়ারি আন্দোলন’, ‘রাজনীতি দর্শন’, ‘সাহিত্য চিন্তা’, ‘সংস্কৃতির সহজ কথা’**সহ দুই দশকেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ বই রয়েছে। এসব গ্রন্থে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য ও রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে তাঁর গভীর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে।

এ ছাড়া তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘ইতিহাসের আলোকে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’, **‘স্বদেশচিন্তা’**সহ একাধিক মূল্যবান গ্রন্থ, যা গবেষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পাঠকের কাছে সমানভাবে সমাদৃত।

সাহিত্য ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ সাহিত্য-গবেষণা জীবনে তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়ে বাংলাদেশের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

২০২৪ সালের অক্টোবরে সরকার তাঁকে তিন বছরের জন্য বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়। সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি বাংলা একাডেমির গবেষণা, প্রকাশনা, ভাষা-উন্নয়ন এবং তরুণ গবেষকদের সম্পৃক্ত করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

ব্যক্তিজীবনে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক একটি মর্মান্তিক ঘটনার সাক্ষী ছিলেন। তাঁর একমাত্র ছেলে, বিশিষ্ট প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন, ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটে নিজ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হন। সেই শোক বুকে নিয়েই তিনি পরবর্তী সময়েও লেখালেখি, গবেষণা ও সমাজচিন্তার কাজ অব্যাহত রাখেন।

ওয়ার্কার্স পার্টির শোক

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি কমরেড মাহমুদুল হাসান মানিক এবং ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কমরেড নূর আহমেদ বকুল।

এক যৌথ শোকবার্তায় তাঁরা বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন দেশের একজন বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ ও শিক্ষক। ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং প্রগতিশীল সমাজচিন্তার বিকাশে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাঁর মৃত্যুতে দেশ একজন সাহসী ও সৃজনশীল চিন্তাবিদকে হারাল। নেতৃবৃন্দ তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শোক

Manual5 Ad Code

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।

Manual5 Ad Code

এক শোকবার্তায় তিনি বলেন, “অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তবুদ্ধির অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর। রাষ্ট্র, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর বিশ্লেষণ আমাদের জাতীয় চিন্তার ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি ছিলেন একজন নীতিবান শিক্ষক, নির্ভীক বুদ্ধিজীবী এবং দেশপ্রেমিক চিন্তক। তাঁর মৃত্যু বাংলাদেশের সাহিত্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি করল।”

তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী ও অসংখ্য গুণগ্রাহীর প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।

দেশের সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিকর্মী, গবেষক এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছেন। তাঁদের মতে, তিনি শুধু একজন প্রাবন্ধিক নন; তিনি ছিলেন স্বাধীন চিন্তার এক বলিষ্ঠ প্রতিনিধি, যার লেখনী ও চিন্তাধারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ