সিলেট ৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৩৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৫, ২০২৬
সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার থেকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার—প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন অনুপ্রেরণা
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার), ০৫ জুলাই ২০২৬ : মৌলভীবাজারের চা বাগানের এক শ্রমজীবী পরিবার থেকে উঠে এসে ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন মনোজ কুমার যাদব।
এর আগে তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগ পান। তাঁর এই ধারাবাহিক সাফল্য শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দেশের চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক অগ্রযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মনোজের সাফল্যের খবরে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন চা বাগান এলাকায় আনন্দের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় শিক্ষক, শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং চা শ্রমিক পরিবারের সদস্যরা এটিকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানদের জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ী মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।
শ্রমজীবী পরিবার থেকে জাতীয় পর্যায়ের সাফল্য
মনোজ কুমার যাদবের বাড়ি মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার চাম্পারায় চা বাগানে। সীমিত আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক বাস্তবতা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি অধ্যবসায়, মেধা, সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, চা বাগানের শ্রমিক পরিবার থেকে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এমন সাফল্য বিরল। ফলে তাঁর অর্জন শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি গোটা চা শ্রমিক সমাজের জন্য গর্বের বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃতিত্বপূর্ণ শিক্ষাজীবন
মনোজ কুমার যাদব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা (Department of Social Welfare and Research) বিভাগ থেকে ২০২২ সালে সম্মান (অনার্স) এবং ২০২৩ সালে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি অর্জন করেন। উভয় পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন।
সহপাঠী ও শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিশ্রমী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং দায়িত্বশীল শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরু থেকেই তিনি সরকারি চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি একাডেমিক উৎকর্ষ বজায় রেখেছিলেন।
ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর মনোজ সোনালী ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। রাষ্ট্রায়ত্ত এই ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি বিসিএসের প্রস্তুতি চালিয়ে যান। পরবর্তীতে ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে নতুন এক সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চাকরির পাশাপাশি পরিকল্পিত প্রস্তুতি, অধ্যবসায় ও সময় ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তিনি তরুণদের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
শিক্ষিত ও সমাজসেবামূলক পারিবারিক পরিবেশ
মনোজের বাবা ধনঞ্জয় যাদব ন্যাশনাল টি কোম্পানির অবসরপ্রাপ্ত টিলা ক্লার্ক। তিনি ২০১৬ সালে দীর্ঘ ৩২ বছরের চাকরি শেষে অবসর গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশ টি এস্টেট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সক্রিয় সদস্য এবং দীর্ঘদিন ইউনিট রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে তিনি ‘বিবেকানন্দ প্রান্তিক শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠন’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, সচেতনতা ও সামাজিক উন্নয়নে কাজ করছেন।
মনোজের মা দেওন্তি রানী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ভাড়াউড়া চা বাগানের মন্দিরভিত্তিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। পরিবারে শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব, নৈতিক মূল্যবোধ এবং অধ্যবসায়ের পরিবেশ মনোজের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি বলে স্থানীয়রা মনে করেন।
মেধাবী ভাই-বোনের পরিবার
তিন ভাই-বোনের মধ্যে মনোজ একমাত্র ছেলে।
বড় বোন দেবকী রানী যাদব অর্থনীতিতে সম্মান ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজে ল্যাব সহকারী হিসেবে কর্মরত।
ছোট বোন দেবশ্রী যাদব পূর্ণ শিক্ষাবৃত্তি (ফুল স্কলারশিপ) নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এনআইটি) বর্ধমান থেকে ২০২৫ সালে বায়োটেকনোলজিতে বি.টেক ডিগ্রি কৃতিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
স্থানীয়দের মতে, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের শিক্ষা ও পেশাগত সাফল্য চা বাগানের অন্যান্য পরিবারের জন্যও ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
শ্রম, নেতৃত্ব ও সমাজসেবার উত্তরাধিকার
মনোজের পরিবারে সমাজসেবা ও নেতৃত্বের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে।
তাঁর দাদী প্রভারতী গোয়ালা চাম্পারায় চা বাগান হাসপাতালে ড্রেসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দাদা প্রয়াত তারা প্রসাদ গোয়ালা একই হাসপাতালে ড্রেসার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নের যে চেতনা পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়েছে, মনোজের সাফল্য তারই ধারাবাহিক বহিঃপ্রকাশ।
বাবার প্রতিক্রিয়া
ছেলের এই অর্জনে আবেগাপ্লুত মনোজের বাবা ধনঞ্জয় যাদব বলেন, “ছেলের এই সাফল্য শুধু আমাদের পরিবারের নয়, পুরো চা শ্রমিক সমাজের অর্জন। অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সে এগিয়েছে। আজ তার সেই পরিশ্রমের ফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমি চাই, চা বাগানের আরও অনেক ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসুক।”»
বিশিষ্টজনদের অভিনন্দন
৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ায় মনোজ কুমার যাদবকে অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।
তিনি বলেন, “চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের সন্তান হিসেবে মনোজের এই অর্জন অত্যন্ত গর্বের। এটি প্রমাণ করে, মেধা ও পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন হলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সন্তানরাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সক্ষম।”»
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা
চা বাগানের মেডিকেল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠন Inception: A Platform of Medical & University Tea Students তাদের ফেসবুক পেজে এক অভিনন্দন বার্তায় জানায়, মনোজ কুমার যাদবের এই অর্জন কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও দায়িত্ববোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সংগঠনটি তাদের বার্তায় উল্লেখ করে, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার অগ্রযাত্রায় তিনি একটি অনুকরণীয় উদাহরণ স্থাপন করেছেন। তাঁর সাফল্য চা বাগানের তরুণদের মধ্যে উচ্চশিক্ষা, মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতা এবং রাষ্ট্রসেবার প্রতি নতুন আস্থা ও প্রত্যাশা সৃষ্টি করবে।
সংগঠনের পক্ষ থেকে মনোজের উত্তরোত্তর সাফল্য এবং রাষ্ট্র ও সমাজের উন্নয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান কামনা করা হয়।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন আশার আলো
শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের চা শ্রমিক সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। সেই বাস্তবতায় মনোজ কুমার যাদবের মতো একজন তরুণের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া একটি সামাজিক পরিবর্তনের ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
স্থানীয় শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও সমাজকর্মীরা মনে করছেন, তাঁর এই অর্জন চা শ্রমিক পরিবারের সন্তানদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি করবে, আত্মবিশ্বাস জোগাবে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক শিক্ষার্থীকে বিসিএস, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক ও অন্যান্য জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে।
চা বাগানের সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্য থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে মনোজ কুমার যাদব প্রমাণ করেছেন—পরিশ্রম, মেধা ও দৃঢ় প্রত্যয় থাকলে প্রান্তিকতা কোনো বাধা নয়; বরং সাফল্যের পথ নির্মাণের শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি