‘৭১-এর শহীদ পবন কুমার তাঁতীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্যাজেটভুক্তির দাবীতে সংবাদ সম্মেলন

প্রকাশিত: ১:৩২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০২১

‘৭১-এর শহীদ পবন কুমার তাঁতীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গ্যাজেটভুক্তির দাবীতে সংবাদ সম্মেলন

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি || শ্রীমঙ্গল, ১৩ ডিসেম্বর ২০২১ : চা শ্রমিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘৭১-এর শহীদ পবন কুমার তাঁতীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা মর্যাদা দেওয়ার নিমিত্তে অবিলম্বে গ্যাজেটভুক্তির দাবীতে আজ সোমবার (১৩ ডিসেম্বর ২০২১) বেলা ২টায় শ্রীমঙ্গল শহরের ভানুগাছ রোডস্থ পানসী রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘৭১-এর শহীদ পবন কুমার তাঁতী’র সন্তান তপন কুমার তাঁতী। এ সময় এ দাবির সমর্থনে বক্তব্য দেন শহীদের সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শী বীর মুক্তিযোদ্ধা রাম নারায়ণ পাল ও শহীদের বড় ভাই নিরঞ্জন কুমার তাঁতী। এছাড়াও বক্তব্য দেন শহীদের দৌহিত্র পল্লব কুমার তাঁতী, বিবেকানন্দ শিক্ষা ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ধনঞ্জয় গোয়ালা, সমাজকর্মী বিশ্বকেতু তাঁতী, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ (উৎস)-এর উপদেষ্টা মিনা রবিদাস। অনুষ্ঠানের শেষদিকে উপস্থিত হন রাজঘাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিজয় বুনার্জী।

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘৭১-এর শহীদ পবন কুমার তাঁতী’র সন্তান তপন কুমার তাঁতী বলেন, “আমার শহীদ পিতা পবন কুমার তাঁতী এ দেশের একজন মেধাবী মানুষ ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম এ পড়ালেখা বাদ দিয়ে এলাকায় এসে স্থানীয়দের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণের জন্য ভারত চলে যান। ভারত থেকে ফেরত এসে তিনি পাক বাহিনীর অবস্থান ও কার্যক্রম সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত তথ্য সরবরাহ করতেন।

Manual6 Ad Code

তার দেয়া তথ্যে মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর অনেক দূর্গ ধ্বংস করে। এক সময় রাজাকারদের মাধ্যমে পাক বাহিনী তার পিতাকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ও অন্যান্য তথ্য আদায়ে পাক বাহিনী তার পিতাকে এক সপ্তাহ ধরে অমানুষিক নির্যাতন করে। সর্বশেষ তথ্য আদায় করতে না পেরে পাক বাহিনী শ্রীমঙ্গল ওয়াপদা অফিসে তার পিতাকে ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর হত্যা করে বালুর স্তুপের মধ্যে পুতে রাখে। পরে তারা তার পিতার লাশ উদ্ধার করে রাজঘাট চা বাগানে স্মৃতি স্তম্ভ করেন।

১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু তার মা পূরবী তাঁতীকে শহীদ মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী হিসেবে এক হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫০ বছর হল আমার মা তার স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির জন্য অফিসে অফিসে ধরনা দিয়ে প্রয়াত হয়েছেন কিন্তু স্বীকৃতি আদায় করতে পারেননি। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসময় তিনি প্রধানমন্ত্রী ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট জোর দাবী জানান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার পিতার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি বা মর্যাদা দেওয়ার নিমিত্তে অবিলম্বে গ্যাজেটভুক্তির।

Manual3 Ad Code

 

Manual4 Ad Code

উল্লেখ্য যে, “বাংলাদেশের চা-শ্রমিকদের মধ্যে প্রথম গ্রাজুয়েট, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও ‘৭১-এর ৫ ডিসেম্বর পবন কুমার তাঁতী শহীদ হন। তাঁর এই অসামান্য অবদান ও অাত্মদান সরকারিভাবে স্বীকৃতি না পাওয়া দুঃখজনক। বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
শহীদ পবন কুমার তাঁতী বিকম পাস করেছিলেন। চা-শ্রমিকদের সকলের কাছে এটা গর্বের হলেও কর্তৃপক্ষ ব্যাপারটা পছন্দ করেনি।
কেননা বাগানে শিক্ষার বিস্তার তাদের কাছে হুমকিস্বরূপ মনে হয়েছিল। তাছাড়া ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। যেটা চা-বাগান কর্তৃপক্ষের নজর এড়ায়নি।
পবন কুমার তাঁতী কমিউনিস্ট নেতা মফিজ আলীর নেতৃত্বাধীন চা শ্রমিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে চা-বাগান এলাকায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন।
একাত্তরের মার্চে পবন তাঁতী ঢাকায় ছিলেন এমএড কোর্স করতে। ২৫ মার্চ রাতে গণহত্যা শুরু হলে তিনি ঢাকা ত্যাগ করেন এবং খুব কষ্ট করে বাগানে ফিরে যান।
সেখানে যেয়ে তিনি পরিবারের সদস্য ও শ্রমিকদের সাথে যুদ্ধে যাওয়া ও নিরাপদ আশ্রয়ের কথা আলোচনা করেন। তার এই মিটিং-এর কথা পাকসেনাদের কানে যায় এবং একদিন সকালে সেনারা এসে পবন তাঁতীসহ পরিবারের সকলকে লাইনে দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং তাদের ঘরে অস্ত্র খুঁজতে থাকে।
অস্ত্র না পেয়ে বন্দুকের নল দিয়ে তারা পবন তাঁতীকে আঘাত করে। তবে ঐ দফায় প্রাণে না মেরে তার সার্টিফিকেট ও পুরনো চিঠিপত্রের বাক্স নিয়ে পাকসেনারা চলে যায়।
পবন তাঁতী ইচ্ছা করলেই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য দেশ ছেড়ে চলে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি দেশে থেকে শ্রমিকদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত করার জন্য কাজ করতে থাকেন।
এরই এক পর্যায়ে তিনি কালিঘাট বস্তিতে আসেন। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পবন তাঁতীর উপর নজর রাখতে এবং পাকিস্তানি সেনারা কালিঘাট বস্তিতে এসে তার পরিবারের সদস্যদের উপর অত্যাচার শুরু করলে পরিবারের অন্যদের বাঁচানোর স্বার্থে তার কাকা পবন তাঁতীকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দেন।
তাকে শ্রীমঙ্গল থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুমাস ধরে তার উপর চলে অমানবিক নির্যাতন। কখনো চলেছে চাবুক, কখনো গরম ছেঁকা, কখনো গরম পানি গায়ে ঢেলে দেওয়া, কখনোবা পা উপরে আর মাথা নিচে দিয়ে ঝুঁলিয়ে রাখা হতো।
এভাবে শরীরের সব শক্তি নিঃশেষ হলে ৫ ডিসেম্বর রাতে শ্রীমঙ্গলে ওয়াপদা অফিসের বধ্যভূমিতে নিয়ে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।”

Manual5 Ad Code

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ