পাবনা জেলখানায় – বন্দী পলায়ন ও হত্যাকান্ড

প্রকাশিত: ৭:৪৮ পূর্বাহ্ণ, মে ৬, ২০২২

পাবনা জেলখানায় – বন্দী পলায়ন ও হত্যাকান্ড

Manual6 Ad Code

আমিরুল ইসলাম রাঙা |

১৯৭৩ সালে পাবনা জেলখানায় বন্দী পলায়ন ও বন্দীদের হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল। ঘটনাটি তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে বহুল আলোচিত ঘটনা ছিল। এই ঘটনাটি নিয়ে দেশে এবং বিদেশে খুবই আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছিল। জাতীয় রাজনীতিতে এই ঘটনা নিয়ে একে অপরকে দোষারূপ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে প্রচার মাধ্যেমে এই বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। সেই সময় বিরোধী দল জাসদ এই ঘটনার জন্য সরকারী দলকে দায়ী করেছে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে বহুবার বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক করেছে। বিএনপি বলেছে তৎকালীন সরকার জেলখানা থেকে বন্দীদের বের করে এনে হত্যা করেছিলো। আর আওয়ামী লীগ বলেছে – তারা বন্দীদের হত্যা করেনি। সেদিন প্রকৃত ঘটনা কি ঘটেছিল সেটা আজও উদঘাটন হয়নি। আজ থেকে অনেক বছর আগের সেই ঘটনার সাথে জড়িত বন্দী, হত্যাকারী এবং হত্যাকান্ড থেকে বেঁচে যাওয়া অনেকে এখনো বেঁচে আছে । বেঁচে আছে আমার মত অনেক সাক্ষী। যারা সেই সময়ে পাবনা জেলখানায় বন্দী ছিলাম। সেই আলোচিত জেল পালানোর ঘটনাটি স্মৃতিচারণ করে আজকের প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে চাই।

১৯৭৩ সালের ২১ মার্চ গভীর রাতে আটঘরিয়ার বেরুয়ান গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী আমাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পাবনা মানসিক হাসপাতাল চত্বরে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে এনে আমাকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। ২৩ মার্চ রক্ষীবাহিনী আমাকে আটঘরিয়া থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। ২৪ মার্চ আটঘরিয়া থানা পুলিশ আমাকে পাবনা জেলখানায় হস্তান্তর করে। জেলগেটে যখন আমাকে নেওয়া হয়, তখন জেলখানার ভিতরে থাকা রাজনৈতিক সহযোদ্ধা ও ঘনিষ্ট বন্ধুরা এসে আমাকে বরন করেন। সে সময় খুব অসুস্থ থাকায় আমাকে সরাসরি জেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। রক্ষীবাহিনীর নির্মম নির্যাতনে আমার শরীরের কোন জায়গা অক্ষত ছিলো না। গায়ের জামা আর শরীরের মাংশ সব একাকার হয়েছিল। মাথায় প্রায় ১০ স্থানে ফেটে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল। শরীরের অনেক জায়গায় মাংস থেতলে হাড় দেখা যাচ্ছিল।

জেলগেট থেকে আমাকে জেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। জেল হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন বনওয়ারীনগর-ফরিদপুর থানার ডাঃ আবু তাহের। কম্পাউন্ডার হিসেবে ছিলেন পাবনা শহরের পৈলানপুর এলাকার কারাবন্দী মির্জাউল হোসেন তারা এবং ঈশ্বরদীর পঞ্চাশোর্ধ মুক্তিযোদ্ধা মতিউর রহমান মতি। তারা ভাই আমার বড় ভাইয়ের সহপাঠী এবং তাঁর ঘনিষ্ট বন্ধু। তারা ভাই তাঁর বাবা ইয়াকুব আলী ও ছোট ভাই কেরু সহ জেলখানায় আটক ছিলেন। জেলখানায় তখন প্রায় দেড় হাজারের মতো বন্দী আটক ছিল। যার মধ্যে ৯৫ ভাগ বন্দী ছিল স্বাধীনতা বিরোধী। যুদ্ধবন্দী হিসেবে ছিলেন পাকিস্তানী মিলিশিয়া বাহিনী, অবাঙালী বিহারী, রাজাকার -আলবদর, শান্তি কমিটি সদস্য আর নক্সালপন্হী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা।

Manual2 Ad Code

প্রায় দেড় হাজার বন্দীর মধ্যে ১৯/২০ জনের মত ছিল মুক্তিযোদ্ধা বন্দী। যারা জাসদ রাজনীতি করার অপরাধে আটক হয়েছিলেন। এদের মধ্যে কয়েকজন ভিন্ন অপরাধেও অভিযুক্ত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা বন্দীরা হলেন, পাবনার দক্ষিন রাঘবপুর এলাকার আহমেদ করিম, মঞ্জু, দিলালপুর মহল্লার মুন্নু, সরোয়ার, টেংকে বাবলু, আটুয়ার আবদুল কুদ্দুস (ঘি কুদ্দুস), নয়নামতির নুরুল ইসলাম নুরু, পৈলানপুরের আবদুল লতিফ সেলিম, আবদুল্লাহ হেল কাফী, শেখর, রফিক, রাধানগরের বাদশা, স্বপন, ঈশ্বরদীর আমিনুল ইসলাম চুনু সরদার, খায়রুজ্জামান বাবু ও পাকশীর সদরুল হক সুধা। এছাড়া ভিন্ন মামলায় রাধানগরের মুক্তিযোদ্ধা আলম ও ছমির উদ্দিন, শালগাড়ীয়ার নবীর উদ্দিন এবং টেবুনিয়ার দেরব আলী জেলে আটক ছিলেন। অল্পদিনের মধ্যে আটঘরিয়ার মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার জাসদ নেতা আনোয়ার হোসেন রেনু, আব্দুস সাত্তার, জহুরুল ইসলাম, মিয়ার উদ্দিন, মন্টু ও আব্দুল জলিল জেলে আসলেন। সুজানগরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আহসান হাবীব, আটঘরিয়ার পয়গাম হোসেন পাঁচু, রাধানগরের মমিনুর রহমান বরুন, সাঁথিয়ার মধু এবং মোহাম্মদ আলী আটক হলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ১৫ জন মুক্তিযোদ্ধা বন্দীকে ১নং ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল।

আমি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। আমার সম্পূর্ন সুস্থ হতে অনেকদিন লেগেছিল। তখন জেলখানায় বন্দী মুক্তিযোদ্ধা এবং জাসদের নেতাকর্মীদের একটু আলাদা সুযোগ সুবিধা দেওয়া হতো। যেমন আমাদের থাকা খাওয়ার কোন অসুবিধা ছিলোনা। পাবনা শহরের মধ্যে বাড়ী এমন ৮/৯ জনের খাবার বাড়ী থেকে দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তখন দুইবেলা বাড়ী থেকে আসা খাবার আমরা ১৪/১৫ জন একসাথে খেতাম। মুক্তিযোদ্ধা বন্দীদের ১ নং ওয়ার্ডে রাখা হয়েছিল। তাদের জন্য অনেক সুবিধা দেওয়া হতো। যেমন সন্ধ্যার আগে সমস্ত বন্দীদের রুম তালাবদ্ধ করলেও গরমের অজুহাতে মুক্তিযোদ্ধা বন্দীদের সন্ধ্যার পরে তাদের রুমে আটকানো হতো। যখন তখন বাইরের আত্মীয় স্বজনদের সাথে সাক্ষাৎ করানোর সুযোগ দেওয়া হতো। সুযোগ সুবিধা কিছু আইনে পাওয়া যেতো আর কিছু ভয় করে দেওয়া হতো।

আমি জেলে যাবার কিছুদিনের মধ্যে জেল থেকে পালানোর পরিকল্পনা শুরু হলো। প্রায়ই আলোচনা হতো। জেলখানায় আমরা নিরাপদ নয়। যেকোন সময় এখান থেকে বের করে কিংবা কোর্টে নিয়ে যাবার সময় সরকারীদলের লোকেরা আমাদের মেরে ফেলতে পারে। দেশে তখন আইন -শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল খুবই খারাপ। তাই আমাদের মত সংগ্রামী যোদ্ধাদের জেলে মারা যাবার চাইতে বাইরে বের হয়ে শত্রুর সাথে লড়াই করে মারা যাওয়া উচিত। এইসব বিষয় নিয়ে ভেবে আমাদের পালানোর সিদ্ধান্ত হবে সঠিক। প্রথমে সিদ্ধান্ত হলো বাইরে থাকা আমাদের অনুসারীরা এই ব্যাপারে সহযোগিতা করবে। নিদিষ্ট দিনে সন্ধ্যার পর জেলখানার উত্তর প্রাচীর ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হবে। বাইরে একটি জিপগাড়ী রেডী থাকবে। কেউ বুঝে উঠার আগেই আমরা দৌড়ে গাড়ীতে উঠে পালিয়ে যাবো। এসব পরিকল্পনা চুড়ান্ত করে বাস্তবায়ন করার আগেই ঘটে গেল এক বড় ধরনের বিপত্তি। কয়েক দিনের মধ্যেই পাকশীর সদরুল হক সুধা, পাবনার আহমেদ করিম এবং মঞ্জু এদের কারাদণ্ড হয়ে যায়। এরপর তাঁদের দ্রুত রাজশাহী সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেবার পর এসব পরিকল্পনা থেমে যায়।

Manual2 Ad Code

এরপর বেশ কিছুদিন পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। এবার ডিনামাইট মেরে প্রাচীর উড়িয়ে নয় বরং বের হবে প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে। তার আগে বলে নেওয়া ভাল সবাই কিন্তু জেল পালানোর পক্ষে ছিলনা। এমন কি পালানোর পর মারা গেছে –এমন কয়েকজনও পালানোর বিরুদ্ধে ছিল। আমি নিজেও শুরু থেকে জেল পালানোর বিরুদ্ধে ছিলাম। আমাদের মধ্যে দুই একজন অরাজনৈতিক বন্ধু পালানোর পরিকল্পনা অব্যাহত রাখে। আমি জেলে যাবার ৩/৪ মাস পর সম্ভবতঃ জুন/জুলাই মাসের ঘটনা। একটানা ২০/২৫ দিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল। একটানা বৃষ্টিতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। ঠিক এমনি একটি দিনে জেল পালানোর সেই ঘটনাটি চুড়ান্ত রুপ নিল।

Manual2 Ad Code

ঘটনার দিন ১নং ওয়ার্ডে ছিল ১১জন। আমি ছিলাম হাসপাতালে। এদিন বিকালে আমরা একসাথে খাওয়া দাওয়া করলাম। আমাদের বাড়ীর খাবারের সাথে কিছু ষ্পেশাল রান্না করা খাবার ছিল। ১ নং ওয়ার্ডে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম। আমি তারা ভাই, মতি ভাই, ঘি কুদ্দুস সহ একসাথে খেয়ে বিদায় নিলাম। জেল পালানোর উদ্যোক্তা এবং পরিকল্পনাকারীরা আমাদের বাদ দিয়েই কানাঘুষা করছিল। আমি তখন কিছুটা আঁচ করলেও বুঝতে পারি নাই আজ রাতেই অঘটন ঘটবে। রাত আটটার দিকে জেলখানায় পাগলা ঘন্টা বেজে উঠে। অবিরাম ঘন্টা বেজে চলছে। মুহুর্তের মধ্যে অসংখ্য পুলিশ জেলখানার মধ্যে ঢুকে পড়ে। ডিসি অফিসের সাইরেন অবিরত বেজে চলছে। বাইরে প্রশাসনের ব্যাপক তৎপরতা। পুলিশ ভিতরে ঢুকে ১নং ওয়ার্ডের সামনে এসে হৈচৈ করছে। তারা অশ্রাব্য গালিগালাজ করছিল। উত্তেজিত পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলার হুমকি দিচ্ছিল। প্রশাসনের উর্ধতন কর্মকর্তারা সব জেলের ভিতরে। হাসপাতালের সামনে এসে চেঁচামেচি করা হচ্ছিল। একশ্রেনীর উত্তেজিত জেল পুলিশ, জেলগেটে রক্ষীবাহিনী সহ নানা জনের হৈচৈ শোনা যাচ্ছিল। তখন একভাবে পাগলা ঘন্টা বেঁজেই চলছিল। জেলের ভিতরে তন্নতন্ন করে খোঁজা হচ্ছিল কোন বন্দী পালিয়ে আছে কিনা। সারারাত আতঙ্ক ও ভয় নিয়ে কাটানোর পরেও ৫০ হাত দুরে থেকে বুঝতে পারছিনা কি ঘটেছে আর কি ঘটবে। তিনদিন কোন বন্দীকে ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে জানতে পারি কারারক্ষী সাত্তারের সহযোগিতায় ১নং ওয়ার্ড থেকে ৭জন বন্দী পালিয়ে গেছে। ৪ জন বের হতে পারে নাই। পালিয়ে যাওয়া ৭ জন হলো সেলিম, শেখর, বাদশা, রফিক, স্বপন, সরোয়ার ও টেংকে বাবলু। বের হতে পারে নাই , চুনু সরদার, মুন্নু, কাফি এবং নুরুল ইসলাম নুরু। পালিয়ে যাওয়া সাতজনের মধ্যে সেলিমের নেতৃত্বে পাঁচ জন উত্তর দিকে এবং বাবলু ও সরোয়ার আরেকদিকে পালিয়ে যায়। পরেরদিন আটঘরিয়া উপজেলার শ্রীকান্তপুর গ্রামের পাশে সেলিম সহ ৫ জন আওয়ামী লীগের কর্মীদের হাতে ধরা পড়ে। তারপর তাদের রাধানগর ইছামতি স্কুল পাড়ায় এক ক্যাম্পে এনে আটক রাখা হয়। কথিত অভিযোগে জানা যায়, সন্ধ্যার পরে নির্মানাধীন পলিটেকনিকের পশ্চিম প্রাচীরের পাশে তাদের হত্যার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। পথে সেলিম সবাইকে ফাঁকি দিয়ে আবার পালিয়ে যায়। এরপর বাকী ৪ জন যথাক্রমে শেখর, বাদশা, স্বপন, রফিককে সেখানেই নৃশঃসভাবে হত্যা
করা হয়।

Manual6 Ad Code

নির্মম সেই ইতিহাসের আরেক চমকপ্রদ অধ্যায় হলো সেদিনের পালিয়ে বেঁচে যাওয়া আব্দুল লতিফ সেলিম বর্তমানে পাবনা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডিপুটি কমান্ডার আর সেই নৃশংস হত্যাকান্ডের কথিত অন্যতম প্রধান হত্যাকারী ঐ সংসদের আরেক কমান্ডার। পালিয়ে যাওয়া আর ২ জনের একজন সরোয়ার এখনো বেঁচে আছে। সেও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডিপুটি কমান্ডার। জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া আরেকজন টেংকে বাবলু কিছুদিন আগে মারা গেছে। ঘটনার সাথে সম্পর্কিত মুক্তিযোদ্ধা নয়নামতির নুরুল ইসলাম নুরু বেঁচে আছেন। কাফি দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকা বসবাস করেন। জেল থেকে মুক্তিলাভের পর মারা গেছেন, ঈশ্বরদীর চুনু সরদার, পাবনা শহরের মুন্নু ভাই। আর এখনো বেঁচে আছি আমি, সেই কালো ইতিহাসের এক অধম সাক্ষী ! (সমাপ্ত)

লেখক পরিচিতি –

আমিরুল ইসলাম রাঙা
রাধানগর মজুমদার পাড়া
পাবনা।
২৯ মে ২০১৫

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ