স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে পরিবেশ সুরক্ষায় টেকসই উদ্যোগের আহ্বান

প্রকাশিত: ৮:৩০ অপরাহ্ণ, জুন ৪, ২০২৬

স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করে পরিবেশ সুরক্ষায় টেকসই উদ্যোগের আহ্বান

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ০৪ জুন ২০২৬ : “বর্তমানে বিশ্ব এক গভীর জলবায়ু সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ এবং জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়ের মতো নানা পরিবেশগত সংকট দেশের মানুষের জীবন-জীবিকা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।”

এ প্রেক্ষাপটে পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবেশ ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা।

Manual8 Ad Code

বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) সকাল ১১টায় বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন (সিডাব্লিউএফ), ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবীইং বাংলাদেশ (আইডাব্লিউবি) এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ (ডাব্লিউবিবি) ট্রাস্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত “জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ আগামীর নিরাপত্তা” শীর্ষক এক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্টের পরিচালক গাউস পিয়ারীর সভাপতিত্বে এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপক নাঈমা আক্তারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাদারীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান।

আলোচক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ, চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরি এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ সুমন।

জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি

আলোচনায় বক্তারা বলেন, পরিবেশ উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে দেশে বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলেও সেগুলোর অনেকগুলোই প্রকল্পনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বিত নয়। ফলে এসব উদ্যোগের সুফল অনেক ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায় না। বিশেষ করে স্থানীয় পর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলো সমাধানে স্থানীয় জনগণের মতামত ও অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নেওয়ার কারণে অনেক উদ্যোগ টেকসই ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়।

বক্তারা মনে করেন, পরিবেশ সুরক্ষায় কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনতে হলে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি সংগঠন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, নারী, শিশু ও তরুণ সমাজের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় বাস্তবতা ও জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে পরিকল্পনা ও নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা সহজ হবে এবং পরিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) সাধারণ সম্পাদক মেজবাহ সুমন বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে দেশের প্রান্তিক জনগণ, নারী, শিশু এবং তরুণ প্রজন্ম। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার কারণে সুপেয় পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। একই সঙ্গে কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বলেন, বনাঞ্চল ধ্বংস ও জীববৈচিত্র্যের অবক্ষয়ের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় তহবিল গঠন করা হলেও এর সুবিধা অনেক সময় উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জনগণের কাছে পর্যাপ্তভাবে পৌঁছায় না। এ কারণে স্থানীয় মানুষের চাহিদা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

পরিবেশ শিক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে

Manual6 Ad Code

চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শাহ ইসরাত আজমেরি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নারী ও শিশুদের ওপর। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক বিকাশ হুমকির মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া উচিত। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই প্রকৃতি, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়েও পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।

শাহ ইসরাত আজমেরি বলেন, “প্রতিটি মানুষ যদি অন্তত একটি করে গাছ রোপণ করে এবং তার পরিচর্যার দায়িত্ব নেয়, তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” তিনি স্কুল-কলেজ পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষা, জলবায়ু সচেতনতা কর্মসূচি এবং ব্যবহারিক কার্যক্রম আরও জোরদার করার আহ্বান জানান।

অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিবেশগত সংকট বাড়াচ্ছে

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে গ্রামাঞ্চল থেকে মানুষের শহরমুখী প্রবণতা বাড়ছে। এর ফলে নগর এলাকায় জনসংখ্যার চাপ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নগর ব্যবস্থাপনা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

তিনি বলেন, উন্নয়নের সঠিক দর্শন অনুসরণ না করে অনেক ক্ষেত্রে তথাকথিত আধুনিকায়নের নামে কাচনির্ভর ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঠ, পার্ক, খেলার জায়গা এবং জলাধার দখল ও ভরাট করে ফেলার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ড. মাহমুদ বলেন, এসব কারণে নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং জনদুর্ভোগ ক্রমাগত বাড়ছে। তিনি পরিবেশগত বিপর্যয়কে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পরিকল্পনাগত ব্যর্থতার ফল হিসেবে উল্লেখ করেন।

তার মতে, ইতোমধ্যে যে উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে তা পুরোপুরি পরিবর্তন করা সম্ভব না হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে নগর সবুজায়ন, গণপরিসর সম্প্রসারণ, উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ এবং জলাধার বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি।

Manual4 Ad Code

সরকারের বহুমুখী উদ্যোগের কথা তুলে ধরলেন এমপি আনিছুর রহমান

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আনিছুর রহমান বলেন, পরিবেশ উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

তিনি জানান, জলাবদ্ধতা নিরসন, নগর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা সম্প্রসারণ, নগর সবুজায়ন এবং মাঠ-পার্ক সংরক্ষণে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এছাড়া শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, নদী দখলমুক্তকরণ, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জলাশয় সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

Manual2 Ad Code

তিনি আরও বলেন, টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে সরকারের একার পক্ষে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়। এজন্য নাগরিক সমাজ, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা প্রয়োজন।

জবাবদিহিতা ও বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্ব

সভাপতির বক্তব্যে গাউস পিয়ারী বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কার্যকর বাস্তবায়ন এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরে শহরকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রাধান্য পেয়েছে। এ প্রবণতা থেকে বের হয়ে এসে বিকেন্দ্রীকরণকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান, সেবা ও উন্নয়নের সুযোগ বৃদ্ধি পায় এবং নগরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে।

তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে কেবল পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং সামগ্রিক টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি জাতীয় ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ।

সম্মিলিত উদ্যোগেই নিরাপদ ভবিষ্যৎ

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ আগামীর নিরাপত্তা” শুধু বিশ্ব পরিবেশ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য নয়; বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলার জরুরি আহ্বান। পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি, সরকার ও বেসরকারি খাত—সবার সমন্বিত ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

বক্তাদের মতে, স্থানীয় জনগণের অভিজ্ঞতা ও মতামতের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণ, পরিবেশ শিক্ষা বিস্তার, সবুজায়ন বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং টেকসই উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ জলবায়ু সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব রাষ্ট্র হিসেবে এগিয়ে যেতে পারে। আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ, সুস্থ ও টেকসই বাংলাদেশ গঠনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ