দেশসেরা হওয়ার অনুভূতি!✨

প্রকাশিত: ৭:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ৭, ২০২২

দেশসেরা হওয়ার অনুভূতি!✨

Manual5 Ad Code

বিশ্বপ্রিয় ভট্টাচার্য কাব্য |

চিন্তার চাষে আমার যাত্রা শুরু ২০১৯ সালে। সেইবার অদ্ভুত এই নামের সঙ্গে প্রথম বারের মতো পরিচয়। প্রথম দফাতেই গবেষণা সম্পর্কে আমার পুরো দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। প্রথমে ভাবতাম, প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেই কেবল গবেষণা করা যায়। কিন্তু আমিও যে গবেষণা করতে পারবো তা জেনে খুবই উৎসাহিত হয়ে পড়লাম। সেইবার আমি এবং আমার দল গবেষণা করেছিলাম- চা শ্রমিকের জীবনমান নিয়ে। শ্রমিকদের কাছে জরিপকৃত অবস্থায় একজন খুবই দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন,”এগুলো করে কী লাভ? আমাদের তো আর অবস্থার উন্নতি হবে না।” সেই কথাটা আমার হৃদয়ে দাগ কাঁটে। তারপর আমি এবং আমার দল প্রথমবারের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের গবেষণাপত্র উপস্থাপন করি এবং তাদের অবস্থানকে তুলে ধরি। সেইবার আমাদের গবেষণাপত্রটি পুরস্কার না পেলেও সকলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছিল। ২০২২ সালে এসে তাদের অবস্থার যে উন্নতি হয়েছে সেই আনন্দটা আমাকেও ছুঁয়েছে।

তারপর বলতে গেলে ৩ বছরের ব্যর্থতা। গত বছর কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হওয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারি নি। তখন আমার অবস্থা কিছুটা হয়ে গিয়েছিল ইলন মাস্কের মতো। সেও টানা তিনবার ব্যর্থতার পর হাল ছাড়েনি এবং চতুর্থবারে সফল হয়েছিল। আমিও সেটাকে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করি এবং শেষবারের মতো নিজেকে প্রস্তুত করি। শুরু হয়ে যায় দলগঠন। আমরা চেয়েছিলাম আশেপাশের সাধারণ বিষয়কে নতুনভাবে তুলে ধরতে। আমরা সকলেই মনে করি যে, ফার্মের গরুর তুলনায় দেশি গরুর দুধের পুষ্টি বেশি। কিন্তু তা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করার জন্যই আমরা বেছে নেই,”দেশি গরু ও ফার্মের গরুর দুধের পুষ্টি গুণাগুণের তুলনামূলক যাচাই।”

দীর্ঘ গবেষণার পর আমরা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করতে পারলাম যে – ফার্মের গরুর তুলনায় দেশি গরুর দুধের পুষ্টি বেশি। আমরা বাছাইপর্ব পার করে মূল পর্বের জন্য নির্বাচিত হলাম। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপস্থপনার প্রতীক্ষা। সকলের অনেক আশা নিয়েই পাড়ি দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। তারপর উপস্থিত সেই তিন বছর আগে স্থানে।

Manual6 Ad Code

এবারের আয়োজন ছিলো আরো জমকালো। সারা দেশের ৩০০ জনের অধিক ক্ষুদে গবেষক উপস্থিত ছিল। অনুষ্ঠান শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। শুরুতে জাতীয় সংগীতকে শ্রদ্ধা জানানোর সময় অজান্তেই আবেগী হয়ে পড়ি। তারপর বিজ্ঞ ব্যক্তিদের বক্তৃতা আমার মধ্যে ইতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটায়। এরপর উপস্থাপনা শুরু হতেই আমাদের পালা চলে আসে।
“কী জানি কী হল আজি, জাগিয়া উঠিল প্রাণ। দূর হতে শুনি যেন মহাসাগরের গান।” -কবিগুরুর এই পংক্তি দু’টির মাধ্যমেই নতুন উদ্যমে আমার উপস্থাপনা শুরু করি। দলের প্রত্যেকেরই উপস্থাপনাতে আমাদের গবেষণাটি পূর্ণতা লাভ করে।

তারপর শুরু হয় কুইজের পালা। এটার জন্যও আমার তিন বছরের অপেক্ষা। ১৯-এ অনেক চেষ্টার পরও কুইজে বিজয়ী হতে পারিনি। এমনকি গত বছর অনুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করে কুইজে অংশগ্রহণ না করতে পারা আমাকে কাতর করে তোলে। এবার কুইজে একটা না একটা পুরস্কার অর্জন করার অঙ্গীকার নিয়েই অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু দেখতে দেখতে আমার দলেই সকল বন্ধুরা কুইজে বিজয়ী হয়ে যায়। আর আমি বরাবরই ব্যর্থ হতে থাকি। তারপর সবাই খুব আনন্দে ক্যাম্পাস ঘুরতে থাকে এবং মুহূর্তগুলো ধারণ করতে থাকে। কিন্তু আমি ঠিকই লেগে থাকি এবং হাল ছাড়ি না। দীর্ঘ ব্যর্থতার পর একদম শেষ কুইজে গিয়ে বিজয় লাভে সক্ষম হই! দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়। কিন্তু সেই মুহূর্তকে আর ধারণ করা হয়নি।

কুইজের পালা শেষে চলে যাই বাংলা একাডেমিতে। সেখানেই সমাপনী অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণ হয়। গণমাণ্য ব্যক্তিদের বক্তৃতার পর শুরু হয় পুরস্কার বিতরণের পালা। তৎক্ষণাৎ হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। অপেক্ষা করতে থাকি আমাদের নাম ঘোষণার। ভেবেছিলাম এবারও হবে না। কিন্তু বিজয়ী হিসেবে শুধু “দেশি” শব্দটি শোনার সাথে সাথে আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়ি। মনে হয় সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে। শুধু আমাদের চারজনেরই উৎফুল্লতা এবং দর্শকদের করতালি। তারপর দৌড়ে মঞ্চে ওঠে পুরস্কার গ্রহণের অনুভূতি কোনো ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশ করা সম্ভব নয়!

Manual2 Ad Code

ট্রেন চলছে। বিজয়ী হয়ে বাড়ি ফেরার যাত্রা। সিট নেই, দাঁড়িয়ে রয়েছি। হঠাৎ জানালার দিকে চোখ পড়ল। মনে পড়ে গেল বিজয়ের উদ্দেশ্যে যাত্রার সেই মুহূর্তক্ষণ…
তখন সিট ছিল,
কিন্তু ছিলোনা মোর প্রাণ।
বিজয় আনন্দে এবার, হয়েছি মহীয়ান!

পুনশ্চ: এই অর্জন নিতান্তই আমার নয়। যারা আমার জীবনে কোনো না কোনোভাবে একটু হলেও অবদান রেখেছেন, এ অর্জন তাদের সকলেরই। সকলের প্রতিই আমার বিনম্র শ্রদ্ধা এবং আগামীর জন্য আশীর্বাদ প্রার্থী। ?❤️

#

বিশ্বপ্রিয় ভট্টাচার্য কাব্য
১০ম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থী
ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়
শ্রীমঙ্গল

Manual3 Ad Code

উল্লেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) মিলনায়তনে এ বছর ‘৭ম চিন্তার চাষ খুদে গবেষক সম্মেলনে ‘দেশি গরু ও ফার্মের গরুর দুধের পুষ্টিগুণাগুণের তুলনামূলক যাচাই’ -এই গবেষণা বিষয়ে চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দেশসেরা স্থান অর্জন করে শ্রীমঙ্গলের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ৪জন মেধাবী শিক্ষার্থী। এরা হলো বিশ্বপ্রিয় ভট্টাচার্য কাব্য, নির্ঝর দেব, জুবায়ের আল আরাবিয়ান এবং বিশাল রায়।

Manual3 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ