বৈষম্যহীন-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে: কমরেড মেননের ৮০তম জন্মোৎসবে বক্তারা

প্রকাশিত: ৫:৫১ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০২৩

বৈষম্যহীন-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লড়াইয়ে তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে: কমরেড মেননের ৮০তম জন্মোৎসবে বক্তারা

Manual1 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ১৮ মে ২০২৩ : বৈষম্যহীন, অসাম্প্রদায়িক ও সাম্যের সমাজ গড়ার লক্ষ্যে রাজনীতি করেছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন। এই লড়াই চালিয়ে নিতে তরুণ প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। কমরেড রাশেদ খান মেননের মতো যাঁরা দেশের জনগণের জন্য ত্যাগ, তিতিক্ষা ও আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাঁদের ইতিহাস তরুণদের সামনে তুলে ধরতে হবে।

কমরেড রাশেদ খান মেননের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বৃহস্পতিবার (১৮ মে ২০২৩) বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত জন্মোৎসব ও সম্মিলন সভায় অতিথিরা এসব কথা বলেন।
‘৮০তে জনতার মেনন’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ৮০তে জনতার মেনন উদ্‌যাপন জাতীয় কমিটি।

বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের অন্যতম শীর্ষনেতা মেননের জন্মদিনে নানা আয়োজনে উৎসব ও সম্মিলন সভা দেশের প্রগতিশীল রাজনীতির ইতিহাসে এক প্রেরণাদায়ী সংযোজন।
এ আয়োজনে সমবেত হয়েছিলেন রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতারা।

Manual6 Ad Code

এই অনুষ্ঠানে ‘৮০তে জনতার মেনন’ শীর্ষক একটি স্মারক গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সেখানে মামুনুর রশীদ নির্মিত ‘মহাজীবনের এক জীবন’ শিরোনামে প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। যেখানে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ মেননের জীবন ও কর্মের নানা অধ্যায় উঠে আসে।

ষাটের দশকের ছাত্রনেতা, ডাকসুর ভিপি রাশেদ খান মেনন এখন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। এছাড়াও তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি।

মেননের বাবা ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার আব্দুল জব্বার খান। মেননের ভাই-বোনদের মধ্যে রয়েছেন সাদেক খান, এনায়েত উল্লাহ খান, সেলিমা রহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান ও শহীদুল্লাহ খান।

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের আয়োজনে ‘ও আলোর পথযাত্রী’ গানের সঙ্গে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে জন্মদিনের অনুষ্ঠানের সূচনা করেন কমরেড মেনন৷

Manual8 Ad Code

পরে বর্ণিল আলোকচ্ছটায় ফুটিয়ে তোলা হয় কমরেড মেননের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন৷ দলীয় নেতার উদ্দেশে মানপত্র পাঠ করেন কমরেড মুস্তফা লুৎফুল্লাহ এমপি।

Manual1 Ad Code

অনুষ্ঠানের আলোচনা পর্বে ছিলেন ডাকসুতে কমরেড মেননের সঙ্গে জিএসের দায়িত্বে থাকা মতিয়া চৌধুরী। তারা তখন এক ছাত্র সংগঠনে থাকলেও এখন রয়েছেন ভিন্ন রাজনৈতিক দলে।

সংসদ উপনেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মতিয়া চৌধুরী বলেন, “কোনো আত্মদানই বৃথা যায় না। একটি স্বাধীন দেশে নিশ্বাস নিয়ে যাচ্ছি, এটি আমাদের বড় অর্জন। সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযাত্রী হিসেবে রয়েছেন রাশেদ খান মেনন৷”

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বর্ষীয়ান রাজনীতিক আমির হোসেন আমু বলেন, “বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ইতিহাসের নাম রাশেদ খান মেনন৷। বাংলাদেশে প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে এক অবিচল সংগ্রামী নেতৃত্বের নাম মেনন। বর্তমান ছাত্রসমাজের দিকে তাকিয়ে হতাশ হতে হয়। বিগত দিনে ছাত্ররাজনীতি করে যাঁরা এখনো সম্মান অক্ষুণ্ন রেখেছেন, তাঁদের মতো হতে হবে। তরুণদের সামনে রাশেদ খান মেননদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।”

“আমরা বিভিন্ন সময়ে যে রাজনৈতিক জোট গড়েছি, সেসব জোটের বক্তব্য লেখার দায়িত্ব পড়ে মেননের কাঁধে৷ তিনি এমনভাবে সেসব বক্তব্য লিখেন, তাতে শরিক দলের প্রত্যেকে মনে করে আন্দোলনের মূল কথা উঠে এসেছে৷ কারও কোনো সংশয় থাকে না৷”

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, “পঁচাত্তর পরবর্তী সময়ে সামরিকতন্ত্রের বিপক্ষে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যে লড়াই, সাম্প্রদায়িকতা-রাজাকার-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই, তাদের ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র ঠেকানোর যে লড়াই, তাতে মুন্সীয়ানা দেখিয়েছেন মেনন ভাই।

“রাজনৈতিক সংকট সমাধানে তাকে আমি সর্বজ্ঞ বলে মনে করি৷ তাকে আমি জাঁদরেল ছাত্রনেতা হিসেবে দেখি, সমাজতন্ত্রের পথে সংগ্রামী নেতা হিসেবে দেখি।”

সিপিবির সাবেক সভাপতি মনজুরুল আহসান খান বলেন, “মেনন ভাইয়ের রাজনীতির পথ ও পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের অনেক পার্থক্য থাকতে পারে৷ কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক মিল৷ আমার বিশ্বাস, রাশেদ খান মেনন সবগুলো বাম দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাম আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন৷”

ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, “অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে কখনও সরে আসেননি৷ যখনই সাম্প্রদায়িকতার উত্থান হয়েছে, মেনন ভাইকে আমি কখনো চুপ করে বসে থাকতে দেখিনি৷”

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নেতা মামুনুর রশীদ বলেন, “আজকে দেশের রাজনীতিতে যখন অস্থিরতা, ভয়াবহ সংকট চলছে তা উত্তরণে রাশেদ খান মেনন সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেবেন, দায়িত্ব পালন করবেন৷”

অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, “রাশেদ খান মেননের সংগ্রাম ধর্মীয় উন্মাদনা, সাম্প্রদায়িকতা ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে; তার লড়াই বৈষম্যের বিরুদ্ধে, সমাজ বদলের পক্ষে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে৷”

মেননের স্ত্রী সংসদ সদস্য লুৎফুন নেসা খান বলেন, “জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়ত বৈষম্যহীন এক সমাজ ও সমাজতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি (মেনন) নিজেকে নিয়োজিত রাখবেন।”

Manual7 Ad Code

সবশেষে নিজের জন্মজয়ন্তীতে অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে মেনন বলেন, “এই ৮০ বছর বয়সে এসে যদি জীবন ভারাক্রান্ত করে রাখি, তবে এ দেশের জনগণের প্রতি অবিচার হবে৷ এ দেশের জনগণের প্রতি আমার রক্তের ঋণ রয়েছে, আমি তা শোধ করে যাব।

“আমার আশি বছরের সবচেয়ে গর্ব, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলাম আমি৷ আমি বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানীর ছত্রছায়ায় রাজনীতি করেছি৷ আমাদের সময়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ ও সহমর্মিতা ছিল৷”

তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে প্রবীণ এই রাজনীতিক বলেন, “সামনের পথের দায়িত্ব নিতে হবে তরুণদের৷ আজকে আত্মত্যাগের রাজনীতির বদলে প্রাধান্য পেয়েছে পাওয়ার রাজনীতি৷ দেশ ও তরুণ সমাজ তাই বিপথগামী৷ সেখান থেকে বের হতে না পারলে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার উপাদানগুলো সত্যিকার অর্থে বাস্তবায়িত হবে না।”

মেননকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছিলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মোজাফফর হোসেন পল্টু, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়া, জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, গণতন্ত্রী পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাহাদাৎ হোসেন, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ-বিএসডি) আহ্বায়ক রেজাউর রশীদ খান রেজা, ঐক্য ন্যাপ সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লাহ তারেক, ন্যাপ (একাংশ) সভাপতি এনামুল হক, নাট্যব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত ও মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির।

ঢাকায় উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত লি জ্যাং- কিউন এবং চীন দূতাবাসের একজন কাউন্সেলর অনুষ্ঠানে এসে মেননকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান৷

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ