স্নাতক ডিগ্রিধারী প্রতি তিনজনের একজন চাকরি পায় না, ২৯% তরুণ স্নাতক বেকার বেশি ঢাকা বিভাগে

প্রকাশিত: ৯:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৫

স্নাতক ডিগ্রিধারী প্রতি তিনজনের একজন চাকরি পায় না, ২৯% তরুণ স্নাতক বেকার বেশি ঢাকা বিভাগে

Manual5 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ : বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ ডিগ্রি নিয়েও বেকার হয়ে আছে। কর্মবাজারে নিরক্ষর শ্রমিকের সংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ, অন্যদিকে স্নাতক ডিগ্রিধারী প্রতি তিনজনের একজন চাকরি পাচ্ছেন না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে উঠে এসেছে এই চিত্র।

Manual3 Ad Code

বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫) তা বিবিএসের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই চিত্র শুধু বেকারত্ব নয়, বরং কর্মসংস্থানের কাঠামো, বৈষম্য ও ভবিষ্যৎ সংকটের সংকেত। জরিপ বলছে, বেকার স্নাতক ও ছদ্ম বেকার বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে।

জরিপে দেখা যায়, দেশে মোট কর্মে নিয়োজিত জনসংখ্যা ৬৯.০৯ মিলিয়ন। এর মধ্যে সাক্ষর ৫৬.০৭ মিলিয়ন হলেও নিরক্ষর ১৩.০২ মিলিয়ন, অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ।

এই নিরক্ষর কর্মশক্তি বাংলাদেশের অর্থনীতির উৎপাদনশীলতায় বড় সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে। বিশেষ করে শিল্প ও সেবা খাতে দক্ষতা ঘাটতির জন্য অনেকে কাজ পেলেও প্রাপ্য আয়ে পৌঁছাতে পারছেন না।

বিবিএসের সংজ্ঞা অনুসারে, কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে যাঁরা সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা মজুরি/বেতন বা পারিবারিক কাজে নিযুক্ত থাকেন, তাঁদের কর্মে নিয়োজিত ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক ঘণ্টার কাজ জীবিকা নির্বাহের জন্য কতটা যথেষ্ট? আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যেখানে এই সংজ্ঞা মেনে চলে, সেখানে বাংলাদেশে এক ঘণ্টা কাজ মানেই টিকে থাকার নিশ্চয়তা নয়।

ফলে দেশে ‘ছদ্ম বেকারত্ব’ এক ভয়াবহ চেহারা নিয়েছে। জরিপে বলা হয়েছে, প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের যোগ্যতা ও সম্ভাব্য কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাচ্ছে না।
এদিকে বেকারত্বের সরকারি হার জাতীয় পর্যায়ে ৩.৬৬ শতাংশ হলেও সংখ্যার হিসাবে তা ২৬ লাখ ২৪ হাজার। বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি বেকার ঢাকা বিভাগে—ছয় লাখ ৮৭ হাজার। এরপর চট্টগ্রামে পাঁচ লাখ ৮৪ হাজার, রাজশাহীতে তিন লাখ ৫৭ হাজার, খুলনায় তিন লাখ ৩১ হাজার।

Manual1 Ad Code

সবচেয়ে কম বেকার আছে ময়মনসিংহ বিভাগে এক লাখ চার হাজার।

দেশে যত বেকার আছে, তাদের মধ্যে সাড়ে ১৩ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী এবং ৭.১৩ শতাংশ উচ্চ মাধ্যমিক পাস। অর্থাৎ প্রতি পাঁচজন বেকারের একজন স্নাতক বা উচ্চ মাধ্যমিক সনদধারী। শুধু তাই নয়, ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুব বেকারদের মধ্যে প্রায় ২৯ শতাংশ স্নাতক। এর মানে দাঁড়ায়, প্রতি তিনজন স্নাতক তরুণের একজন বেকার। শিক্ষা আর কর্মসংস্থানের এই বৈষম্য বাংলাদেশের মানবসম্পদ নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

কর্মক্ষম নারীদের মধ্যে শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৩৮.৪০ শতাংশ, যেখানে পুরুষের ক্ষেত্রে তা প্রায় ৮০ শতাংশ। শহরাঞ্চলের নারীরা তুলনামূলক বেশি পিছিয়ে, পল্লী এলাকায় শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ ৬২ শতাংশ হলেও শহরে তা নেমে এসেছে ৫০ শতাংশে।

দেশে কর্মে নিয়োজিতদের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছে। পল্লী এলাকায় এই হার ৮৭.৫৮ শতাংশ, শহরে ৭৩.৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ বিপুল শ্রমশক্তি এখনো সুরক্ষাহীন, সামাজিক নিরাপত্তা ও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অরাজকতা, নৈরাজ্য, মব ভায়োলেন্স ও অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। যা এখনো বিদ্যমান। আগস্টের শেষের দিকেই দেশের প্রধান শিল্প খাত পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন শুরু হয়। বন্ধ হয় বেশ কিছু বড় শিল্প-কারখানা। ফলে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে।

জরিপে দেখা যায়, কর্মে নিয়োজিতদের সাপ্তাহিক গড় কর্মঘণ্টা জাতীয়ভাবে ৪৮ ঘণ্টা। শিল্প খাতে গড় সময় সবচেয়ে বেশি ৫৩ ঘণ্টা, সেবা খাতে ৫১ ঘণ্টা এবং কৃষিতে ৩৯ ঘণ্টা। বেতনভিত্তিক কর্মীদের মাসিক গড় আয় ১৫ হাজার ৫৫৪ টাকা। পুরুষরা আয় করছে ১৬ হাজার ১০৫ টাকা, আর নারীরা ১২ হাজার ৬৮১ টাকা। শহরে গড় আয় ১৭ হাজার ৭০৮ টাকা হলেও গ্রামে তা ১৪ হাজার ১৩১ টাকায় নেমে এসেছে। আয়ের এই বৈষম্য শ্রমবাজারের আরেকটি স্থায়ী সংকট।

Manual4 Ad Code

জরিপে বলা হয়েছে, দেশে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী যুবদের মধ্যে ২০ লাখ বেকার, যা মোট বেকারের ৭৬ শতাংশ। আরো উদ্বেগজনক হলো, শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণে নেই এমন (নিট) তরুণের সংখ্যা ৮.৫৬ মিলিয়ন, যা যুব জনসংখ্যার ২০ শতাংশের বেশি। এর মধ্যে নারীর সংখ্যা ৫.৭৯ মিলিয়ন, অর্থাৎ প্রতি চারজন তরুণীর একজন কোনো ধরনের শিক্ষায়, প্রশিক্ষণে বা কর্মে যুক্ত নয়।

Manual3 Ad Code

বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বেকারত্বের ধরনও বহুমুখী। সামঞ্জস্যহীনতাজনিত বেকারত্ব দেখা যায় উত্তরবঙ্গ ও হাওর অঞ্চলে, যেখানে চাহিদামাফিক দক্ষ জনশক্তির সরবরাহ নেই। আবার বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা বা মহামারি-পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছে বাণিজ্যচক্রজনিত বেকারত্ব। প্রযুক্তির বিকাশে অনেকে চাকরি হারিয়েছে, যেটি কাঠামোগত বেকারত্ব হিসেবে চিহ্নিত।

 

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ