সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৯:৪৯ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৮, ২০২৫
মহাবিশ্বের প্রতিটি নক্ষত্র, গ্রহ, গ্যালাক্সি—এমনকি আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপও যে শক্তির দ্বারা পরিচালিত হয়, তার নাম মহাকর্ষ (Gravity)। এটি সেই মৌলিক শক্তি, যা অদৃশ্য হলেও সর্বত্র বিরাজমান, নিঃশব্দে সৃষ্টি করে বিশ্বজগতের বিন্যাস, ভারসাম্য ও গতির সুর।
মহাকর্ষ কী এবং কীভাবে কাজ করে
প্রকৃতিতে চারটি মৌলিক বল রয়েছে—
১. তড়িৎচৌম্বক বল (Electromagnetic Force)
২. দৃঢ় নিউক্লীয় বল (Strong Nuclear Force)
৩. দুর্বল নিউক্লীয় বল (Weak Nuclear Force)
৪. মহাকর্ষ বল (Gravitational Force)
এর মধ্যে মহাকর্ষই সবচেয়ে দুর্বল, কিন্তু সবচেয়ে দীর্ঘপথে কার্যকর। এটি এমন একটি আকর্ষণ বল, যা ভরযুক্ত যে কোনো দুই বস্তুর মধ্যে কাজ করে।
আইজ্যাক নিউটন এই বলের গাণিতিক রূপটি ব্যাখ্যা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত সূত্রে—
সূত্র : F= Gm1m2/ d²
F হলো মহাকর্ষীয় বল,
G হলো মহাকর্ষ ধ্রুবক,
m₁ ও m₂ হলো দুটি বস্তুর ভর,
আর r হলো তাদের মধ্যে দূরত্ব।
এই সূত্র জানায়, দূরত্ব যত বাড়বে, আকর্ষণ তত কমবে। আর ভর যত বেশি, আকর্ষণ তত শক্তিশালী হবে।
আইনস্টাইনের দৃষ্টিতে মহাকর্ষ
নিউটনের ব্যাখ্যা বলেছিল—মহাকর্ষ একটি আকর্ষণ শক্তি। কিন্তু আলবার্ট আইনস্টাইন এর ব্যাখ্যা আরও গভীর ও বিপ্লবাত্মক। ১৯১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর General Theory of Relativity বলেছিল—মহাকর্ষ কোনো “বল” নয়, বরং ভর ও শক্তির কারণে স্থান-কাল (Space-Time) বাঁক নেয়।
একটি বিশাল ভরের বস্তু, যেমন—সূর্য, তার চারপাশের স্থান-কালকে বেঁকিয়ে দেয়, আর গ্রহগুলো সেই বেঁকা পথে (geodesic) চলতে থাকে। তাই পৃথিবী সূর্যের চারপাশে ঘুরে বেড়ায়, যেন সূর্যের টানে নয়, বরং স্থান-কাল এর বাঁক ধরে চলছে।
মহাকর্ষ ছাড়া কেমন হতো মহাবিশ্ব
ভাবা যায়, যদি মহাকর্ষ না থাকত—
× কোনো গ্রহ গঠিত হতো না
× নক্ষত্র বা গ্যালাক্সি জন্ম নিত না
× পৃথিবীর কোনো কক্ষপথ থাকত না
× আমাদের শ্বাস নেওয়ার জন্য কোনো বায়ুমণ্ডলও থাকত না
মহাকর্ষই গ্রহগুলোকে কক্ষপথে রাখে, নক্ষত্রগুলোকে গ্যাসের বিস্ফোরণ থেকে স্থিত রাখে, এমনকি আমাদের শরীরকে পৃথিবীর মাটিতে স্থির রাখে। এটি মহাবিশ্বের কাঠামো গঠনের মূল কারিগর।
দৈনন্দিন জীবনে মহাকর্ষের উপস্থিতি
আমরা যখন হাঁটি, কিছু ফেলে দিই, বা বল ছুড়ি—সব ক্ষেত্রেই মহাকর্ষ কাজ করছে। কোনো কিছু পড়ে গেলে আমরা বলি “নিচে পড়েছে”, কিন্তু আসলে তা পৃথিবীর ভরের দিকে আকৃষ্ট হয়েছে। এই সহজ বিষয়টিই একসময় নিউটনের কৌতূহল জাগিয়েছিল এক পড়ন্ত আপেলের মাধ্যমে।
বিজ্ঞান ও দর্শনের মেলবন্ধন
মহাকর্ষ শুধু বিজ্ঞান নয়, এটি দর্শনও। এটি শেখায়, দৃশ্যমান না হয়েও কিভাবে একটি শক্তি পুরো সৃষ্টিজগতকে একত্রে ধরে রাখে।
যেভাবে মানবসম্পর্ক, নীতি ও ভালোবাসা সমাজকে একত্রে রাখে—তেমনি মহাকর্ষ মহাবিশ্বকে একত্রে ধরে রাখে এক অদৃশ্য বন্ধনে।
উপসংহার
আজ আমরা ব্ল্যাক হোল, মহাকাশযান, ও কসমিক বিকিরণের যুগে প্রবেশ করেছি। কিন্তু এখনো মহাকর্ষ আমাদের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। এটি একদিকে সহজ—একটি আপেল পড়ার মতো সাধারণ ঘটনা; অন্যদিকে গভীর—একটি গ্যালাক্সির গতিপথ নির্ধারণের মতো জটিল সমীকরণ।
মহাকর্ষই সেই নীরব শক্তি, যা সৃষ্টি করেছে আমাদের বাস্তবতাকে, দিয়েছে স্থায়িত্ব, দিয়েছে জীবন।
নিউটনের আপেল থেকে আইনস্টাইনের স্থান-কাল পর্যন্ত—মহাকর্ষ আমাদের শিখিয়েছে, মহাবিশ্বের প্রতিটি ঘটনা একে অপরের সঙ্গে অদৃশ্যভাবে যুক্ত।
#
লেখক :
সৈয়দা হাজেরা সুলতানা (শানজিদা)
শিক্ষার্থী
পদার্থবিজ্ঞান (সম্মান) ১ম বর্ষ
মুরারিচাঁদ কলেজ
সিলেট।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি