ভাষা সৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ২:১৪ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ২, ২০২৫

ভাষা সৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী আজ

Manual6 Ad Code

বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা, ০২ নভেম্বর ২০২৫ : আজ মহান ভাষা সৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী।

Manual4 Ad Code

বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনি এক অনন্য ও অবিস্মরণীয় নাম— ভাষা আন্দোলনের সূচনাকারী, মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নদ্রষ্টা এবং স্বাধীনতার অগ্রদূত।

ভারতবর্ষে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হিসেবে তাঁর রাজনীতির সূচনা। পরবর্তীতে পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নেতৃত্ব দেন তিনি। জীবনের প্রতিটি পর্বে নিজের আদর্শ ও বিশ্বাসের জন্যে তিনি মূল্য দিয়েছেন— সর্বোচ্চ মূল্য দিয়েছেন ১৯৭১ সালের মার্চে, যখন তিনি কুমিল্লার নিজ বাড়িতে নিজের হাতে উত্তোলন করেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

কিন্তু সেই স্বপ্নের পতাকা ওড়ানোর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয় বাংলাদেশের মাটি। ১৯৭১ সালের ২৯ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা তাঁর ছোট ছেলে দিলীপকুমার দত্তসহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে কুমিল্লার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের কুমিল্লা সেনানিবাসে নিয়ে নৃশংস নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। তবে হত্যার সঠিক দিনটি আজও অজানা থেকে গেছে।

Manual8 Ad Code

১৮৮৬ সালের ২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার রামরাইল গ্রামে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জগবন্ধু দত্ত ছিলেন কসবা ও নবীনগর মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার।

দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তানে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষায় তিনি ছিলেন প্রথম কণ্ঠস্বর। ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে তিনি উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবি তুলেছিলেন।
সেই বক্তৃতাই পাকিস্তানে ভাষা আন্দোলনের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘটায়।

অধিবেশনে পূর্ব বাংলার কংগ্রেস দলীয় সদস্য হিসেবে তিনি বলেন—
“বাংলা একটি প্রাদেশিক ভাষা হলেও সমগ্র পাকিস্তানের মোট ৬ কোটি ৯০ লাখ লোকের মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লাখই বাংলা ভাষায় কথা বলে। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী বাঙালি। অথচ ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার যে ভূমিকা পালন করেছে তা মোটেই সমর্থনযোগ্য নয়।”

পরবর্তীতে প্রখ্যাত সাহিত্যিক রশীদ হায়দার তাঁর এক প্রবন্ধে লিখেছেন—
“আমরা নিঃসংশয়ে বলতে পারি, ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির সেই দুঃসাহসিক ভূমিকা পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কোনোদিন ভুলে যায়নি। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের সেই সাহসিক উচ্চারণই পাকিস্তান বিভাজনের বীজ বপন করেছিল, যা ইতিহাস পরবর্তীকালে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করেছে।”

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত যে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তার করুণ বিবরণ পাওয়া যায় প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যে। কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের নাপিত রমণীমোহন শীল এক সাক্ষাৎকারে জানান—
“ধীরেন বাবু স্কুলঘরের বারান্দায় অতি কষ্টে হামাগুড়ি দিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোথায় প্রস্রাব করবেন। আমি ইশারায় জায়গা দেখিয়ে দিই। তখন তিনি হাতে এক পা ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠানে নামেন। আমি তখন এক জল্লাদের দাড়ি কাটছিলাম। বারবার বাবুর দিকে তাকানোয় জল্লাদ উর্দুতে বলেছিল, ‘এটা দেখার জিনিস নয়—নিজের কাজ কর।’ এরপর আর তাকানোর সাহস পাইনি। বাবুর ক্ষতবিক্ষত দেহ, মাথায় ব্যান্ডেজ, চোখ ও হাত বাঁধা অবস্থায় কয়েকদিন ধরে তাঁকে ব্রিগেড অফিসে আনতে নিতে দেখেছি।”
(সূত্র: শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৩০২)

সেই নির্মম ঘটনার সাক্ষ্য আজও ইতিহাসের বিবেককে নাড়া দেয়।

শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজ-এর সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন—
“ভাষা সৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত শুধু বাংলার ভাষা আন্দোলনের পথিকৃৎ নন, তিনি ছিলেন জাতির আত্মমর্যাদার প্রতীক। তাঁর ত্যাগ ও আদর্শ নতুন প্রজন্মকে চিরদিন অনুপ্রেরণা জোগাবে।”

আজ তাঁর জন্মদিনে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে মহান এই ভাষা সৈনিক ও শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে।

Manual2 Ad Code

 

Manual8 Ad Code

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ