মুক্তচিন্তার বাতিঘর সৈয়দ আবুল মকসুদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশিত: ১২:৩০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬

মুক্তচিন্তার বাতিঘর সৈয়দ আবুল মকসুদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : প্রগতিশীল মুক্তচিন্তার অন্যতম পথিকৃৎ, খ্যাতিমান কলামিস্ট, গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সামাজিক-পরিবেশ আন্দোলনের পুরোধা সৈয়দ আবুল মকসুদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। তার প্রয়াণে দেশের সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়।

মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীলতার অগ্রদূত

সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রগতিশীল চিন্তার এক দৃঢ় কণ্ঠস্বর। রাজনীতি, সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তার বিশ্লেষণী লেখনী ছিল তীক্ষ্ণ, যুক্তিনিষ্ঠ ও মানবিক বোধে উজ্জ্বল। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি নির্ভীক সমালোচনা, ইতিহাস-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গি এবং গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও পরিবেশের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান তাকে আলাদা মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশের অধিক। গবেষণা, প্রবন্ধ, কলাম, জীবনী এবং কবিতা—বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার মধ্য দিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব অবস্থান নির্মাণ করেন। সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন।

Manual3 Ad Code

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তার পিতা সৈয়দ আবুল মাহমুদ ও মাতা সালেহা বেগম। শৈশব থেকেই দেশি-বিদেশি নানা পত্রিকা পাঠের সুযোগ তাকে চিন্তার বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। কৈশোরেই তিনি সাহিত্য ও সমাজমনস্ক চিন্তায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

Manual3 Ad Code

সাংবাদিকতা জীবনের সূচনা

১৯৬৪ সালে এম আনিসুজ্জামান সম্পাদিত সাপ্তাহিক নবযুগ পত্রিকায় সাংবাদিকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা। পত্রিকাটি ছিল পাকিস্তান সোশ্যালিস্ট পার্টির মুখপত্র। পরে তিনি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি সমর্থিত সাপ্তাহিক জনতায় কাজ করেন। ১৯৭১ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ বার্তা সংস্থায় (বাসস)। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় তিনি বাসসের সম্পাদকীয় বিভাগে কাটান এবং ২০০৮ সালের ২ মার্চ চাকরি থেকে অবসর নেন।

পরবর্তীতে তিনি দৈনিক প্রথম আলো’র নিয়মিত কলামিস্ট হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। ‘সহজিয়া কড়চা’ ও ‘বাঘা তেঁতুল’ শিরোনামের কলামগুলোতে তিনি সমাজ, রাজনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও সমকালীন ইস্যু নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী লেখা প্রকাশ করতেন। তার লেখায় ইতিহাসচেতনা ও সমকালীন বাস্তবতার সমন্বয় পাঠকমহলে বিশেষ সমাদৃত হয়।

সাহিত্য ও গবেষণায় অবদান

সৈয়দ আবুল মকসুদ কেবল প্রাবন্ধিকই নন, একজন শক্তিমান কবিও ছিলেন। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ বিকেলবেলা। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ দারা শিকোহ ও অন্যান্য কবিতা। মানবাধিকার, পরিবেশ, প্রেম ও সমাজ-বাস্তবতা তার কবিতার প্রধান উপজীব্য বিষয়।

গবেষণামূলক রচনায় তিনি বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, মহাত্মা গান্ধী এবং মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন ও কর্ম নিয়ে তার গবেষণা বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত।

ভাসানীকে নিয়ে রচিত মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর জীবন, কর্মকাণ্ড, রাজনীতি ও দর্শন (১৯৮৬) এবং ভাসানী কাহিনী (২০১৩) গ্রন্থে তিনি ভাসানীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবন ও দর্শন বিশ্লেষণ করেছেন। একইভাবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য (২০১১) এবং স্মৃতিতে ওয়ালীউল্লাহ (২০১৪) গ্রন্থে তিনি ওয়ালীউল্লাহর সাহিত্যকর্ম ও জীবনদর্শনকে সমকালীন প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করেছেন। এসব গ্রন্থে সংশ্লিষ্ট সময়ের সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে গভীর অনুসন্ধিৎসায়।

সামাজিক ও পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা

লেখালেখির পাশাপাশি সৈয়দ আবুল মকসুদ বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। নগরায়ণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, নদী রক্ষা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নে তিনি সরব ছিলেন। নাগরিক সমাজের বিভিন্ন উদ্যোগে তার অংশগ্রহণ তাকে একজন সচেতন জনবুদ্ধিজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেয়।

শ্রদ্ধা ও স্মরণ

তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। বিশিষ্টজনেরা তার কর্ম ও চিন্তাধারার প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে বক্তব্য রাখছেন।

Manual5 Ad Code

বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, সাপ্তাহিক নতুন কথা’র বিশেষ প্রতিনিধি, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, “সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভীক কলমসৈনিক। তার লেখনী আমাদের মুক্তচিন্তা ও মানবিক মূল্যবোধের পথে অনুপ্রাণিত করবে।” তিনি মরহুমের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

Manual1 Ad Code

উত্তরাধিকার

সৈয়দ আবুল মকসুদের চিন্তা, গবেষণা ও লেখনী আজও প্রাসঙ্গিক। অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, মানবিক মূল্যবোধ ও প্রগতিশীল সমাজ নির্মাণে তার দৃষ্টিভঙ্গি নতুন প্রজন্মের জন্য পথনির্দেশক হয়ে থাকবে। মুক্তচিন্তার যে আলোকবর্তিকা তিনি প্রজ্বলিত করেছিলেন, তা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

তার পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই প্রজ্ঞাবান লেখক ও মননশীল চিন্তাবিদকে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ