বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৯০তম জন্মবার্ষিকী কাল

প্রকাশিত: ১:৩০ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০২৬

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৯০তম জন্মবার্ষিকী কাল

Manual7 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক, নড়াইল, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ : মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখের ৯০তম জন্মবার্ষিকী কাল।

১৯৩৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি নড়াইল সদর উপজেলার চন্ডিবরপুর ইউনিয়নের মহিষখোলা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

তার বাবা মোহাম্মদ আমানত শেখ এবং মা জেন্নাতুন্নেছা (মতান্তরে জেন্নাতা খানম)। শৈশবেই তিনি পিতা-মাতাকে হারান। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশোনা শেষে জীবিকার তাগিদে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। তার দুই স্ত্রীর কেউই বেঁচে নেই। বর্তমানে এক ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে।

১৯৫৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর)—বর্তমান বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)—যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে দায়িত্ব পালনের পর ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই যশোর সেক্টরে বদলি হন এবং ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮ নম্বর সেক্টরে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ সেক্টরের দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী এবং সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর এস এ মঞ্জুর। যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার নেতৃত্বে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়ে অসামান্য সাহসিকতার পরিচয় দেন নূর মোহাম্মদ শেখ।

১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর যশোর জেলার গোয়ালহাটি ও ছুটিপুর এলাকায় পাকবাহিনীর সঙ্গে তীব্র সম্মুখযুদ্ধে তিনি শহীদ হন। ওইদিন পাকবাহিনীর গুলিতে তার সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুরুতর আহত হলে নূর মোহাম্মদ শেখ হাতে এলএমজি নিয়ে এবং আহত সহযোদ্ধাকে কাঁধে তুলে শত্রুর দিকে গুলি ছুড়তে থাকেন। এক পর্যায়ে মর্টারের আঘাতে তার হাঁটু ভেঙে যায়। তবুও তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। শেষ পর্যন্ত তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করেন। পরে তাকে যশোরের শার্শা উপজেলার কাশিপুর গ্রামে সমাহিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অতুলনীয় সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাকে দেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়।

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর আত্মদান ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান। তিনি বলেন, “বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ কেবল একজন বীর সেনানী নন, তিনি বাঙালির অদম্য সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাঁর আত্মদান চিরকাল আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে। নতুন প্রজন্মকে তাঁর বীরত্বগাথা জানাতে এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করতে আমাদের আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।”

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে নড়াইল ও যশোরসহ বিভিন্ন স্থানে তার সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, দোয়া মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখকে উৎসর্গ করে লেখা কবিতা—

Manual5 Ad Code

বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ
—সৈয়দ আমিরুজ্জামান

মহিষখোলার মাটির ঘরে জন্ম নিল এক শিশু,
নির্জন ভোরে বাংলার বুকে উঠল নতুন নিশু।
চণ্ডিবরপুরের সবুজ মাঠে রৌদ্রছায়ার খেলা,
দারিদ্র্যেরই কঠিন পাঠে শৈশব গেল ভেলা।

Manual7 Ad Code

পিতামাতার স্নেহছায়া হারাল অকালবেলায়,
তবু জীবন থামেনি তার দুঃখেরই ঢেউখেলায়।
সপ্তম শ্রেণির বইখাতা একদিন গেল ছুটে,
জীবনযুদ্ধে নামল সে অন্নের তরে রুটে।

কোমল হাতে কাস্তে ধরা, কঠিন দিনের ডাকে,
স্বপ্নগুলো লুকিয়ে রাখে নীরব হৃদয় ফাঁকে।
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার আকাশ নীল,
তারই মাঝে গড়ে ওঠে এক অদম্য কণ্ঠস্বর শীল।

Manual5 Ad Code

উনিশশো ঊনষাটের সেই ফেব্রুয়ারির দিন,
রাইফেলসের শপথবুকে জাগল অগ্নিবীণ।
সীমান্তরেখা পাহারা দেয় দিনাজপুরের প্রান্তে,
দেশরক্ষার দায় বুকে তার অটল প্রতিজ্ঞান্তে।

দায়িত্ব তার নিঃশব্দ কঠোর, সীমান্তজুড়ে রাত,
ঝড়বৃষ্টি আর রৌদ্রদাহে অবিচল প্রহরী সাথ।
যশোর সেক্টর ডাক দিল যখন অশনি-সঙ্কেতে,
ল্যান্স নায়েক দৃপ্ত পদে দাঁড়াল অগ্নিক্ষেতে।

একাত্তরের রক্তঝরা সেই কালো মার্চ মাস,
বাংলার বুকে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল শ্বাস।
অগ্নিস্রোতে ভেসে গেল ঘর, পুড়ল স্বপ্নগাঁথা,
মানুষ তখন মুক্তির তরে মৃত্যুকেও চায় সাথে।

যশোরের সেই বয়রা প্রান্ত, কাশিপুরের ধুলা,
সেখানে সে দাঁড়ায় অটল, মৃত্যুর মুখে ভুলা।
ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদার সাথে সম্মুখযুদ্ধ ক্ষণ,
পাক হানাদার কাঁপে শুনে তার রণহুঙ্কার ধ্বনন।

গোয়ালহাটি, ছুটিপুরে আগুনঝরা দিন,
বারুদেরই গন্ধ মেখে লাল হয় আকাশবীন।
সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া রক্তাক্ত মাটির ‘পরে,
বিপদ তখন ঘনিয়ে আসে শত্রুর গুলিবর্ষণে ঘোরে।

কাঁধে তুলে আহত সাথী, হাতে এলএমজি,
একাই যেন বজ্রনাদে জাগে অগ্নিপুঞ্জী।
হাঁটু ভাঙা মর্টার আঘাত রক্তে ভিজে ক্ষণ,
তবু থামে না ট্রিগার টানা, থামে না রণধ্বনন।

Manual6 Ad Code

ক্ষতবিক্ষত শরীর তার তবু অবিচল মন,
স্বাধীনতার পতাকা যেন বুকেরই স্পন্দন।
শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও রাখে শপথ জাগ্রত,
বাংলার মাটি মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত নয় বিরত।

পাঁচই সেপ্টেম্বর সেই দিন সূর্য ডুবল রক্তে,
শহীদেরই অমর খেতাব লিখল ইতিহাসপটে।
কাশিপুরের নিভৃত মাটিতে ঘুমায় বীরের দেহ,
কিন্তু তারই আত্মত্যাগে জাগে স্বাধীন গেহ।

বীরশ্রেষ্ঠ—এই শব্দখানি শুধু কি সম্মান?
এ যে জাতির চিরঋণ, এ যে শপথগান।
নূর মোহাম্মদ শেখ নামটি উচ্চারিলে আজ,
বাংলার বুকে সাহস জাগে, জাগে নতুন সাজ।

দারিদ্র্য ছিল সাথী তার, ছিল না ভয়ের রেশ,
মৃত্যুকে সে তুচ্ছ করেছে দেশের প্রেমের শেষ।
দুই সহধর্মিণী পাড়ি দিল অনন্তেরই পথে,
রয়ে গেছে সন্তান তার স্মৃতির আলোকরথে।

নব্বই বছরের জন্মদিনে নত হয় সব শির,
যে প্রাণ দিল স্বাধীনতাকে, সে আমাদের নক্ষত্র ধীর।
নড়াইল-যশোর পুষ্পস্তবক অর্পে শ্রদ্ধাভরে,
দোয়ার সুরে ভেসে আসে নামটি অন্তরে।

কেবল কি এক গ্রামবাংলা তার গৌরবগাথা কয়?
সমগ্র জাতি উচ্চারণে তার বীরত্বময় জয়।
পাঠ্যবইয়ের অক্ষরে নয়, হৃদয়েরই পাতায়,
তারই কাহন জ্বলুক সদা প্রজন্মের প্রভাতায়।

যে কাঁধে ছিল আহত সাথী, হাতে জ্বলন্ত গান,
সেই কাঁধে আজ ভর করে দাঁড়ায় স্বাধীন প্রাণ।
যে হাঁটু ভাঙা শরীর নিয়ে লড়েছে অন্তিম ক্ষণ,
সেই দৃঢ়তা শিখিয়ে যায় অটল থাকার মন।

হে বীর, তোমার রক্তরেখা সীমান্তজুড়ে রয়,
তোমার ত্যাগে লাল সবুজে জাগে স্বাধীনময়।
বাংলার শিশু জেনে যাক তোমার অগ্নিনাম,
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় হোক আলোকিত ধাম।

যতদিন এই পদ্মা-মেঘনা বহে অনন্ত স্রোত,
যতদিন এই শস্যখেতে দোলে সোনালি রোত,
ততদিন তোমার বীরগাথা ধ্বনিবে অবিরাম,
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ—বাংলার চিরধাম।

নব্বইয়ের এই প্রভাতেতে শপথ করি আজ,
অন্যায়-অবিচার দেখলে নেব প্রতিবাদের সাজ।
স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় হব অবিচল,
তোমার মতো সাহসী হব, হৃদয় রাখব উজ্জ্বল।

তুমি কেবল ইতিহাস নও, নও স্মৃতির ছবি,
তুমি আমাদের রক্তে লেখা অগ্নিশিখার কবি।
বাংলার প্রতিটি প্রহরে, প্রতিটি বিজয়গানে,
বেঁচে থাকবে তোমার নাম অনন্ত সম্মানে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ