সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:৩৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০২৬
আজ থেকে অনেক বছর আগে মাও জেদং সাম্রাজ্যবাদকে কাগুজে বাঘ হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি আরো বলেছিলেন, পৃথিবীর প্রতিটি বস্তু যেমন দ্বৈত চরিত্রবিশিষ্ট (একেই বলে বিপরীতের সমন্বয়ের ধর্ম), তেমনি সাম্রাজ্যবাদ এবং প্রতিক্রিয়াশীলদেরও দ্বৈত চরিত্র রয়েছে। তারা প্রকৃত বাঘ এবং একই সময়ে তারা কাগুজে বাঘ। এই বিষয়ে আজ থেকে ৫৭ বছর আগে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক হায়দার আকবর খান রনো তাঁর ‘সাম্রাজ্যবাদের রূপরেখা’ বইয়ে বলেন, ‘অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদকে পরাভূত করা সম্ভব, যেহেতু সে কাগুজে বাঘ মাত্র।
আবার অন্যদিকে তাকে বধ করার জন্য লড়াই করতে হবে, কারণ সে হিংস্র বাঘ।’
সাম্রাজ্যবাদ যে কাগুজে বাঘ, আবার একই সঙ্গে হিংস্র বাঘ, তা আবারও প্রমাণিত হচ্ছে ইরান যুদ্ধে। অনেক হম্বিতম্বি করে ইরান আক্রমণ করে, ইরানকে গুঁড়িয়ে দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার যে স্বপ্ন ট্রাম্প প্রশাসন দেখেছিল, তা এরই মধ্যে ব্যর্থ হয়েছে। এতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কার্যত কাগুজে বাঘ।
মনে রাখতে হবে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ হলো ব্রিটেন, ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি, ইতালি, স্পেনসহ সব সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল। এই মোড়ল এখন নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। তাইতো এই যুদ্ধে সে অন্যান্য মিত্রকেও টেনে আনার চেষ্টা করছে। সেই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধেরও একটি অজুহাত খুঁজছে।
ইরান যুদ্ধ : বদলে যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩৫ বছর ধরে এই দুনিয়ায় দাপিয়ে বেড়িয়েছে, যা ইচ্ছা তা-ই করেছে। কখনো ইরাক দখল করেছে, কখনো আফগানিস্তান, লিবিয়া, সিরিয়া, গ্রানাডা ইত্যাদি দেশ। সর্বশেষ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে ওই দেশটির তেল দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে। পাঁয়তারা করছে প্রতিবেশী দেশ কানাডা ও গ্রিনল্যান্ড দখলের। এই দখলপ্রক্রিয়ার মধ্যে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিনা উসকানিতে মধ্যপ্রাচ্যের বিষফোড়া মানবতাবিরোধী জায়নবাদী ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে ইরান আক্রমণ করেছে।
হত্যা করেছে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ অসংখ্য মানুষকে। এমনকি বোমা মেরে স্কুল উড়িয়ে দিয়ে স্কুলের নিষ্পাপ শিশুদেরও হত্যা করেছে এবং এই হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত আছে।
যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল, হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে ইরান আত্মসমর্পণ করবে। আর ওরা ইরাক, লিবিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো তেল দখল করে বিজয় নিশান ওড়াবে। সেই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহত্তর ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন পূরণ করবে, যা এরই মধ্যে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি এ বিষয়ে একটি মানচিত্রও প্রদর্শন করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের উত্খাতের চেষ্টা করেন, যা তাঁরা অনেকাংশে সফল হয়েছেন। তারপর গত বছর ইরানে হামলা করে ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেন। ১২ দিনের নিরন্তর প্রচেষ্টার পরও ব্যর্থ হয় মার্কিন-ইসরায়েলি প্রচেষ্টা। সেই ব্যর্থতাকে ঢেকে দিয়ে ইরানের ধ্বংস ও মধ্যপ্রাচ্যের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে এবার মরিয়া হয়ে উঠেছেন। কিন্তু ১০ দিনব্যাপী যুদ্ধে ইরান যেভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলে পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করেছে, তাতে স্পষ্ট হয়ে গেছে, যত গর্জে, তত বর্ষে না। প্রমাণিত হয়ে গেছে যে সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র নিজেই কাগুজে বাঘ। তবে তা হিংস্রও বটে। আর তাইতো ইরানকে কৌশল করে সাহসের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে।
এই লড়াইয়ে ইরানের রণনীতি ও রণকৌশল ঠিক থাকলে সাম্রাজ্যবাদের পরাজয় নিশ্চিত। আর তা যদি হয়, তাহলে দুই দিন আগে হোক, পরে হোক, মধ্যপ্রাচ্য থেকে পাততাড়ি গোটাতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে। ঠিক যেভাবে ফ্রান্সকে আফ্রিকা থেকে পাততাড়ি গোটাতে হয়েছে। সেই সঙ্গে বৃহত্তর ইসরায়েল গঠন আর গাজা উপত্যকার ট্রাম্পের সাধের রিসোর্ট পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার স্বপ্নও ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। আর মুসলিম বিশ্ব লজ্জায় মুখ ঢাকবে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা আর সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনের জন্য। এরই মধ্যে সৌদি নেতাদের মধ্যে উপলব্ধি হচ্ছে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের রক্ষার চেয়ে ইসরায়েলকে রক্ষা করাটাই মুখ্য মনে করে। এর প্রমাণ মিলেছে সৌদিসহ আরববিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায়। ইরান নির্বিঘ্নে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাতে হামলা করেছে। অথচ বহির্বিশ্বের হামলা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের দেশে ঘাঁটি করতে দিয়েছে। দিয়েছে বিপুল অর্থ ও সম্পদ। সেই সঙ্গে নিজেদের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাকে ধুলায় লুণ্ঠিত করেছে। যা হোক, শেষ পর্যন্ত যদি আরব দেশগুলোর বোধোদয় হয়, তাহলে ভালো। না হলেও ভালো। কারণ এতে ওদের মুখোশ পুরোপুরি খসে পড়বে।
যা বলছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের হম্বিতম্বিতে এবার কাজ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবার সত্যি বিপদে পড়ে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে নিজেদের জনগণকে কিভাবে সামাল দেবে, তা বলা কঠিন। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদেরও অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাচ্ছে। যেই সেনাদল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালায়, আর যে সেনারা যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে ভয় পায়, যেতে অস্বীকার করে, সেই সেনাদল দিয়ে আর যা-ই হোক, যুদ্ধ জেতা যায় না। যেমন জেতা যায়নি ভিয়েতনামে, আফগানিস্তানে (দ্বিতীয় দফায়)। যেমন যুক্তরাষ্ট্র জিততে পারেনি কোরীয় যুদ্ধে।
তবে এটিও ঠিক যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ খুব সহজে হার মানবে না। আঘাতে আঘাতে শেষ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাম্রাজ্যবাদ বাইরে যত হিংস্রই হোক না কেন, ভেতরে ভেতরে সে দুর্বল। তাই ইরান যদি এই যুদ্ধকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারে কোরীয় যুদ্ধের মতো, ভিয়েতনাম যুদ্ধের মতো, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় নিশ্চিত। আর যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় মানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর পরাজয়, আর সারা দুনিয়ার মেহনতি লড়াকু মানুষের জয়। জয় মজলুমের। আর এই জয় নিশ্চিতভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনকে এগিয়ে নেবে। সেই সঙ্গে ভেনেজুয়েলা, কিউবা, কলম্বিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের যে শকুনি দৃষ্টি রয়েছে, তা থেকে দেশগুলো আপাতত রক্ষা পাবে; যা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক।
#
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি