৫৩ বছর আমার বাবার হত্যার বিচার পাইনি, জনগণের আদালতে বিচার চাই

প্রকাশিত: ১২:৫৩ পূর্বাহ্ণ, মার্চ ১০, ২০২৬

৫৩ বছর আমার বাবার হত্যার বিচার পাইনি, জনগণের আদালতে বিচার চাই

Manual8 Ad Code

সুতপা বেদজ্ঞ |

আমার বাবা ছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জের হেমায়েত বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্যের ডেপুটি কমান্ডার। এই বাহিনীর দুঃসাহসী অধিকাংশ অভিযান এবং ২০টিরও বেশি সম্মুখযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে আমার বাবার নেতৃত্বে।

ছোট বেলা থেকেই বাবা ছিলেন দুরন্ত ও প্রচন্ড সাহসী, মেধাবি ও জেদি। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে দাদুর সাথে রাগারাগি করে বাবা ইন্ডিয়ায় চলে যান, ইন্ডিয়ান নেভিতে এক বছর চাকরি করেন। পরে দেশে ফিরে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিএসসি পাশ করেন। বাবা ছাত্র ইউনিয়ন করেছেন, কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন, ন্যাপের মধ্যে থেকে কাজ করতেন, জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন।

স্বাধীনতার পরে আমার বাবাকে গোপালগঞ্জের টুংগীপাড়া-কোটালীপাড়ার মানুষ ব্যাপকভাবে সংবর্ধিত করতে থাকে। এই এলাকায় ওয়ালিউর রহমান লেবু ও আমার বাবার নেতৃত্বে কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে ওঠে।

বাবা ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী হিসেবে কুড়েঘর মার্কায় নির্বাচন করে সামান্য ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন।

নির্বাচনের মাত্র তিনদিন পরে ১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ হেমায়েত ও তার গুন্ডাবাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে আমার বাবাসহ জননেতা কমরেড ওয়ালিউর রহমান লেবু, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিষ্ণু ও মানিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। গুরুতর আহত হন লুৎফর রহমান গঞ্জর। এর মধ্যে ওয়ালিউর রহমান লেবু ছিলেন ৮ নং সেক্টরে মেজর মঞ্জুরের পলিটিক্যাল এ্যাটাচি, সম্মুখ যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছেন। বিষ্ণু ও মানিকও মুক্তিযুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ গ্রহণ করেছেন।

‘মৃত্যুকালীন জবানবন্দী’তে লুৎফর রহমান গঞ্জর এই হত্যাকাণ্ডের বিবরণ দিয়েছেন।

Manual8 Ad Code

৫৩ বছর হয়ে গেল রাষ্ট্রের কাছে আমার বাবার হত্যার বিচার পাইনি।

কয়েকটি কারণে আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল-

১. কমরেড ওয়ালিউর রহমান লেবু ও কমলেশ বেদজ্ঞ গোপালগঞ্জ অঞ্চলে শক্তিশালী বাম সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। স্বভাবতই শাসক শ্রেণি তাদের উপর সন্তুষ্ট ছিলো না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে তাঁদের ওপর চাপ ছিলো।

২. এই হত্যাকাণ্ডের কারণ খুঁজতে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, কমলেশ বেদজ্ঞের ডায়েরিতে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনার বর্ণনা ছিল এবং যুদ্ধকালীন রাজাকার ক্যাম্পের পতন ঘটিয়ে প্রাপ্ত সম্পদের তালিকা ছিল। এই সম্পদ হেমায়েতের কাছে রাখা হয়েছিলো। মুক্তিযুদ্ধের পরে যাদের সম্পদ তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য কমলেশ বেদজ্ঞ বারবার হেমায়েতকে অনুরোধ করেছেন। হেমায়েত রাজি হয়নি। কমলেশ বেদজ্ঞ সম্পদ জনগনের কাছে ফিরিয়ে না দিলে প্রাপ্ত সম্পদের তালিকা জনগনের কাছে প্রকাশ করার চ্যালেঞ্জ প্রদান করেন।

৩. যুদ্ধকালীন সময়ে জনগণ ও কয়েক হাজার সহমুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের এমনই গুণমুগ্ধ হয়ে পড়ে। বিজয়ের পর জনগণ ও সহমুক্তিযোদ্ধারা অনেকক্ষেত্রেই হেমায়েতের চেয়ে কমলেশ বেদজ্ঞকেই বেশি গুরুত্ব দিতে থাকে। এ বিষয় হেমায়েতকে প্রচণ্ড হিংসাপরায়ণ করে তোলে। হেমায়েত এই বিষয়টি তখন গোপন রাখেনি।

৪. এই হত্যাকাণ্ডের কারণ খুঁজতে অন্য একটি বিষয়ের ওপরও নজর দিতে হবে, মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কমলেশ বেদজ্ঞ রাজাকারদের প্রতি ছিলেন ক্ষমাহীন। সাধারণ ক্ষমার সুযোগে রাজাকার ও শাস্তিপ্রাপ্ত রাজাকার পরিবারের সদস্যরা কমলেশ বেদজ্ঞের ওপর প্রতিশোধ নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের পরে এদের সাথে হেমায়েতের সখ্যতা কোনো অজানা বিষয় নয়।

Manual8 Ad Code

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশ্বাস দেয়ার মাত্র আট মাস পর চারজন বীর কমিউনিস্ট মুক্তিযোদ্ধাকে নির্মম নিষ্ঠুরতায় হত্যার আত্মস্বীকৃত খুনী হেমায়েতকে পুরস্কার স্বরূপ রাষ্ট্রীয় পদবী বীরবিক্রম প্রদান করে সসম্মানে ছেড়ে দেয়া হয়।

Manual5 Ad Code

Manual2 Ad Code

খুনিচক্র গত ৫৩ বছরে ছয়বার হাইকোর্টে মামলাটি স্থগিত করিয়েছে। ২০১৩ সালে মহামান্য হাইকোর্ট মামলাটি বিরতিহীনভাবে স্পেশাল ট্রাইবুনালে পরিচালনা করার নির্দেশ প্রদান করেন। মামলার কার্যক্রম শুরু হওয়ার একমাসের মধ্যে খুনিচক্র সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট ২০২১ সালে খুনীদের আবেদন খারিজ করে দেন। কিন্তু ২০২৬ সালেও নথি নিম্ন আদালতে পৌঁছেনি। ২৩ জন আসামীর মধ্যে হেমায়েতসহ ২০ জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে।

২৬ এর নির্বাচনে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ সময়ে চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যামামলার ৩ নম্বর আসামী আবুল কালাম দাড়িয়াকে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নবগঠিত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে।

অথচ বীর মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞ এর নাম সরকারি মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় নেই।

৫৩ বছরে আমার বাবার হত্যার বিচার এ রাষ্ট্র করেনি।

আমার দাদু- ঠাকুমা তাদের সন্তান হত্যার বিচার দেখে যেতে পারেননি। কমরেড ওয়ালিউর রহমান লেবুর মা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁর সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে গেছেন। আমার মা স্বামী হত্যার বিচারের অপেক্ষা করে করে ২০১২ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। আমিও হয়ত আমার জীবদ্দশায় এই বিচার দেখে যেতে পারবো না।

তাই জনগণের আদালতে বিচার রেখে গেলাম।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ