সিলেট ৪ঠা জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২১শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৬, ২০২৬
স্বাধীনতা দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয়; এটি আত্মপরিচয়, ইতিহাস-স্মরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বোধ পুনর্নবায়নের এক অনন্য উপলক্ষ। এ প্রেক্ষাপটে শ্রীমঙ্গলের উত্তরণ পাঠাগারে অনুষ্ঠিত এক প্রাণবন্ত আলাপচারিতা যেন সেই দায়বোধকেই নতুন করে জাগ্রত করল। অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন পাঠাগারটির উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান, ‘৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, একসময়ের তুখোড় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম সারথি, অধ্যাপক সাইয়্যিদ মুজীবুর রহমান।

দীর্ঘ সময় ধরে পাঠাগারের পাঠকদের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কথোপকথন ছিল যেন জীবন্ত ইতিহাসের পাঠশালা। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, স্থানীয় ইতিহাস এবং জাতীয় প্রেক্ষাপট—সবকিছু মিলিয়ে তাঁর বক্তব্য হয়ে উঠেছিল এক মূল্যবান দলিল, যা শুধু স্মৃতিচারণ নয়, বরং গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারে।
শ্রীমঙ্গলের বিদ্বৎসমাজে অধ্যাপক মুজীবুর রহমান সুপরিচিত নাম হলেও, নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচয় ততটা উজ্জ্বল নয়—এ বাস্তবতা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। অথচ তিনি এমন এক সময়ের সাক্ষী, যখন একটি জাতি অস্তিত্বের প্রশ্নে লড়াই করেছে। তাঁর স্মৃতিচারণে উঠে আসে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস—যা এ অঞ্চলের শিক্ষা বিস্তারের এক মাইলফলক। একইসঙ্গে উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধকালীন শ্রীমঙ্গলের ভয়াবহ পরিস্থিতি, পাকবাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ এবং স্থানীয় প্রতিরোধের নানা দিক।
তিনি উল্লেখ করেন কলেজের শিক্ষার্থী মলয় নাথের সাহসিকতার কথা, যিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। নিজেও ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন অধ্যাপক মুজীবুর রহমান। তবে লক্ষণীয় বিষয়, তিনি কখনো নিজের নামের সঙ্গে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা’ উপাধি যুক্ত করেননি—যা তাঁর ব্যক্তিত্বের বিনয়ী ও আদর্শিক দিকটিকেই উন্মোচিত করে।
আলাপচারিতায় উঠে আসে মুক্তিযুদ্ধের একটি জটিল ও সংবেদনশীল অধ্যায়—পিস কমিটির ভূমিকা। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন শ্রীমঙ্গলে কিছু নিরপরাধ বিহারীর হত্যার ঘটনা, যা ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক দিক। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু বীরত্বগাথা নয়, এর মধ্যে রয়েছে মানবিক সংকট, ভুল এবং ট্র্যাজেডির গল্পও। এই বহুমাত্রিক সত্যকে স্বীকার করেই ইতিহাসকে বুঝতে হবে।
পাকবাহিনীর স্থানীয় দোসর হিসেবে পরিচিত ‘বাচ্চু’র দুষ্কর্মের কথাও তিনি তুলে ধরেন, যা স্থানীয় ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এসব তথ্য কেবল মৌখিক স্মৃতিচারণ নয়—বরং ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও অধ্যাপক মুজীবুর রহমানের হৃদয়ের টান রয়ে গেছে জন্মভূমিতে। সময় পেলেই তিনি ছুটে আসেন স্বদেশ ও স্বজনদের কাছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন যেন আমাদের জন্য এক সুযোগ—ইতিহাসকে সরাসরি শোনার, বোঝার এবং সংরক্ষণ করার।
অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে উত্তরণ পাঠাগারের পক্ষ থেকে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয় পাঠাগারের সাময়িকী ‘প্রতীতি’ এবং একটি বই উপহার হিসেবে। উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি প্রফেসর রফি আহমদ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রউফ তালুকদারসহ এলাকার বিশিষ্টজনেরা।
এ ধরনের আয়োজন শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি প্রজন্মান্তরের সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। আজকের তরুণদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ অনেক সময়ই পাঠ্যবইয়ের সীমাবদ্ধ তথ্য। কিন্তু এমন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষের মুখে ইতিহাস শোনা তাদের চেতনায় গভীর ছাপ ফেলতে পারে।
অতএব, প্রয়োজন এ ধরনের আয়োজনকে আরও বিস্তৃত করা—স্কুল, কলেজ ও সামাজিক সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত সাক্ষীদের সঙ্গে তরুণদের সংযোগ ঘটানো। কারণ, ইতিহাসকে শুধু সংরক্ষণ করলেই হবে না; তা জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং ধারণ করতে হবে।
স্বাধীনতার ৫০ বছরের বেশি সময় পর দাঁড়িয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—এই ইতিহাসকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে সত্যরূপে তুলে ধরা। অধ্যাপক সাইয়্যিদ মুজীবুর রহমানের মতো মানুষরা সেই সত্যের নির্ভরযোগ্য বাহক।

তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোই যথেষ্ট নয়; তাঁদের অভিজ্ঞতাকে লিপিবদ্ধ করা, সংরক্ষণ করা এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়াই আমাদের প্রকৃত দায়িত্ব।
#
মো. সাইফুল ইসলাম
প্রভাষক, বাংলা বিভাগ
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি