সিলেট ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১২:১৪ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ : আজ সাংবাদিক, কবি ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী কমরেড সৌমিত্র দেব টিটু’র প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর প্রয়াণের এক বছর পেরিয়ে গেলেও সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং প্রগতিশীল রাজনীতির অঙ্গনে তাঁর শূন্যতা এখনো গভীরভাবে অনুভূত হচ্ছে। নানা আঙ্গিকে তাঁর কর্মময় জীবন, চিন্তা ও সংগ্রামের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষজন।
২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল রাজধানীর খিলক্ষেতের লেকসিটিস্থ বাসায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এজমা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। সকাল ১০টার দিকে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর স্ত্রী পলা দেব দ্রুত তাঁকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৫৪ বছর। তিনি স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, তিন বোনসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
তাঁর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়লে ঢাকাসহ মৌলভীবাজার জুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর মরদেহ মৌলভীবাজার শহীদ মিনারে নিয়ে আসা হলে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সমবেত হন। তাঁর প্রতি মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত শ্রদ্ধা তাঁর জীবনব্যাপী সংগ্রাম ও মানবিকতারই প্রতিফলন।
কমরেড সৌমিত্র দেব টিটু ১৯৭০ সালের ২৭ জুলাই মৌলভীবাজার শহরে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে নিজ জেলাতেই। তিনি মৌলভীবাজার সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, মৌলভীবাজার সরকারি মহাবিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমাও অর্জন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন একাধারে সাংবাদিক, সম্পাদক ও সংগঠক। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলোতে কাজ করার পর তিনি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকায় সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে অনলাইন সংবাদমাধ্যম রেডটাইমস প্রতিষ্ঠা করে প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এটিকে একটি প্রগতিশীল মতাদর্শভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তোলেন।
সাহিত্যাঙ্গনেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা ও সম্পাদনাসহ নানা ধারায় তিনি কাজ করেছেন। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় প্রায় ৪০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত। তাঁর লেখায় সমাজচেতনা, মানবমুক্তির আকাঙ্ক্ষা এবং প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
রাজনৈতিকভাবেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি রাজনীতিতে যুক্ত হন এবং ২০১৩ সালে মৌলভীবাজার পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুতেও তাঁকে রাজপথে সরব ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে।
ঢাকায় জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সাংবাদিকদের অধিকার, পেশাগত উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক সংহতি জোরদারে তাঁর অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা সভা, স্মরণানুষ্ঠান ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করেছে। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন, “সৌমিত্র দেব টিটু ছিলেন একাধারে সংগ্রামী মানুষ, মুক্ত চিন্তার মানুষ এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নিবেদিত কর্মী। তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাঁর আদর্শ ও সংগ্রামের পথ আমাদের অনুপ্রাণিত করবে।”
তিনি আরও বলেন, “সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন নিয়ে যিনি আজীবন লড়েছেন, তাঁর স্মৃতি শুধু শোকের নয়—এটি আমাদের জন্য দায়বদ্ধতারও প্রতীক।”
সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের মতে, কমরেড সৌমিত্র দেব টিটু ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি ব্যক্তিজীবন ও পেশাজীবন উভয় ক্ষেত্রেই সততা, সাহস এবং মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে জাতি।
আজও ঢাকার আকাশ জুড়ে নেমে আসে স্তব্ধতা,
এপ্রিলের এই দিনে হঠাৎ থমকে থাকে ব্যস্ততা,
শব্দহীন এক শোক নামে রাস্তাঘাটের ভিড়ে,
একটি নাম উচ্চারিত হয় নীরবতার নীড়ে।
স্মৃতির ভেতর জেগে ওঠে সংগ্রামী এক মুখ,
যে মানুষটি লিখে গেছেন জীবনেরই সুখ-দুঃখ,
কলম ছিল তার অস্ত্র, কণ্ঠ ছিল আগুন,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়াতেন অবিচল অনুগুণ।
সৌমিত্র দেব—নামটি যেন প্রতিবাদের গান,
টিটু নামে ডাকত সবাই, হৃদয়ে ছিল টান,
মৌলভীবাজারের মাটি যার প্রথম চেনা ঘর,
সেই মাটির গন্ধ মেখে বেড়ে ওঠা নির্ভীক এক অন্তর।
সত্তরের সেই জুলাই দিনে জন্ম নিলেন তিনি,
স্বপ্নগুলো ছোটবেলা থেকেই ছিল রঙিনিনি,
বিদ্যালয়ের বেঞ্চে বসে গড়েছেন চিন্তার দিগন্ত,
শিক্ষার পথে এগিয়ে গেছেন দৃঢ়তায় অনন্ত।
কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়—জ্ঞান অন্বেষণের পথ,
সাংবাদিকতার আলোয় গড়েছেন নিজের রথ,
প্রেস ইনস্টিটিউটের পাঠে শানিত হলো দৃষ্টি,
সত্য বলার সাহস পেলেন—এটাই ছিল সৃষ্টি।
দৈনিকের পাতায় পাতায় লিখেছেন সময়ের কথা,
প্রথম আলো, মানবজমিন—জেগেছে তার ব্যথা,
সংবাদে খুঁজেছেন তিনি মানুষেরই মুখ,
অন্ধকারে আলো জ্বালাই ছিল তার সুখ।
শুধু কি তিনি সাংবাদিক? না, তিনি কবিও,
শব্দ দিয়ে গড়েছেন তিনি প্রতিবাদের নদীও,
চল্লিশটি বই—একেকটি সময়ের দলিল,
প্রতিটি লাইনে লুকিয়ে আছে মানুষেরই কোলাহল।
রাজনীতির পথেও ছিলেন নির্ভীক সহযাত্রী,
ওয়ার্কার্স পার্টির পতাকায় ছিলেন তিনি যাত্রী,
মেয়র প্রার্থী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মানুষের পাশে,
স্বপ্ন দেখতেন শহর গড়ার ন্যায়েরই বিশ্বাসে।
পাঁচ আগস্টের উত্তাল দিনে রাস্তায় ছিলেন তিনি,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তুলেছেন অগ্নিবাণী,
শাসনের ভয় তাকে কখনো করেনি স্তব্ধ,
সত্য বলার শক্তি ছিল—অটুট, অদম্য, দৃঢ়।
রেডটাইমসের সম্পাদক—কণ্ঠস্বর ছিল জাগ্রত,
অবহেলিত মানুষের কথা করতেন বারবার উচ্চারিত,
সংবাদ নয়, তিনি লিখতেন সময়ের ইতিহাস,
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তার নিঃশ্বাস।
ঢাকার জালালাবাদ সাংবাদিক সংগঠনের প্রাণ,
প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই ছিলেন নেতৃত্বের স্থান,
সহযোদ্ধারা আজও স্মরণ করে তার সেই দিন,
যেখানে নেতৃত্ব মানে ছিল ভালোবাসার ঋণ।
কিন্তু হঠাৎ একদিন থেমে গেল সব গান,
এজমার কষ্টে নিঃশ্বাস হলো অচেনা অবসান,
খিলক্ষেতের সেই সকাল—নীরবতা ভাঙেনি আর,
হাসপাতালের দরজায় শেষ হলো জীবনের আহ্বান তার।
স্ত্রী পলা দেবের চোখে তখন অবিরাম জল,
একটি পরিবার হারালো আশ্রয়ের সম্বল,
একটি সন্তান, তিন বোন, অগণিত আপনজন,
শূন্যতায় ডুবে গেল তাদের প্রতিটি ক্ষণ।
মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ল শহর থেকে গ্রামে,
ঢাকা কাঁদল, মৌলভীবাজার কাঁদল একই নামে,
শহীদ মিনারের সামনে মানুষের ঢল নামে,
শ্রদ্ধার ফুলে ঢেকে যায় স্মৃতির প্রতিটি থামে।
সংস্কৃতি, সাহিত্য, রাজনীতি—সবাই হলো এক,
তার চলে যাওয়ায় নেমে এলো গভীর শোকের রেখ,
যে মানুষটি ছিলেন সবার, সবারই এক সাথি,
তার অনুপস্থিতিতে আজ শূন্যতারই গাথা লিখি।
তিনি ছিলেন বুদ্ধির মুক্তির আন্দোলনের এক দীপ,
অন্ধকারে আলো জ্বালাই ছিল তার অনুপম নীতি,
চিন্তার স্বাধীনতা ছিল তার চূড়ান্ত দাবি,
মানুষ যেন মানুষ থাকে—এই ছিল তার ভাবি।
সচেতনতার এক সৈনিক ছিলেন তিনি নিরন্তর,
সময়ের অন্যায় দেখে থাকেননি কখনো নিস্তর,
কলম দিয়ে লিখেছেন তিনি প্রতিবাদের ইতিহাস,
জীবনের প্রতিটি ধাপে রেখেছেন সংগ্রামের আভাস।
আজ প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী—সময় যেন থামে,
তার স্মৃতি ভেসে আসে প্রতিটি মানুষের নামে,
তিনি নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার অমর পথ,
প্রতিটি পদচারণায় জেগে ওঠে তারই রথ।
যে মানুষটি শিখিয়েছেন দাঁড়াতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে,
যে মানুষটি পথ দেখিয়েছেন অন্ধকারের নিভৃতে,
তার জীবন আজ আমাদের কাছে এক আলোকবর্তিকা,
তার আদর্শেই গড়ে উঠুক আগামী দিনের দিশা।
কমরেড, তুমি আছো আজও প্রতিটি উচ্চারণে,
প্রতিটি প্রতিবাদে, প্রতিটি জাগ্রত কণ্ঠধ্বনিতে,
তোমার লেখা, তোমার স্বপ্ন, তোমার অমর গান,
সময়ের বুক চিরে বয়ে যাবে অবিরাম।
শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় তোমায় করি স্মরণ,
তোমার সংগ্রাম হোক আমাদের চির প্রেরণ,
তুমি নেই—এই কথাটি মেনে নেয় না মন,
কারণ তুমি বেঁচে আছো প্রতিটি মানুষের জীবন।
আজও যখন কলম ধরি, মনে পড়ে তোমার কথা,
সত্য বলার সাহস যেন না হারায় কোনো ব্যথা,
তোমার পথেই হাঁটতে চাই আমরা নির্ভীক হয়ে,
মানুষের পাশে দাঁড়াবো—তোমার স্বপ্ন বয়ে।
কমরেড সৌমিত্র দেব টিটু—একটি নাম নয়,
একটি ইতিহাস, একটি সংগ্রাম, এক অমর জয়,
তোমার প্রতি আমাদের অশেষ শ্রদ্ধার নিবেদন—
তুমি বেঁচে থাকবে যতদিন থাকবে মানুষের জীবন।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি