সিলেট ১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ৫:২১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৮, ২০২৬
এক-১
পয়লা ফেব্রুয়ারি। ভাষার মাসের শুরু। এই দিনই চতুর্থবারের মতো কলম তুলে নিলাম। নিজের জীবন সম্পর্কে কিছু লেখার জন্য। তিনবার শুরু করে যে শেষ করতে পারিনি সে দোষ আমার নয়। যাদের ওপর ভরসা করেছিলাম, তারা নিজেরাই মাঝপথে হারিয়ে যায়। ইতোমধ্যে জীবনে নতুন নতুন অধ্যায় যুক্ত হয়েছে। তৃতীয়বার শেষ করতে পারিনি একেবারে নিজের কারণে। ভেবেছিলাম দাদা (বড় ভাই সাদেক খান) তাঁর জীবনের কথা লেখার পর আমার নিজের কথা লিখব। কারণ তাঁর যাপিত জীবন, তাঁর কর্মময়তার মধ্যে আমাদের কথা, আমাদের পরিবারের কথা, দেশের রাজনীতি-অর্থনীতিতে মধ্যবিত্তের ক্রম-উত্থান ও বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের কথা লুকিয়ে আছে। দাদা, কুট্টি ভাই (ওবায়দুল্লাহ খান), ছোড়দা (এনায়েতুল্লাহ খান)-এই তিন বড় ভাই আমার জীবনের যাত্রাপথ এমনভাবে প্রভাবিত করেছিলেন যে তাঁদের কথার মধ্যেই আমার জীবনের অনেক কথা খুঁজে পাওয়া যেত। দাদাকে দিয়ে লেখানোও শুরু করিয়েছিলাম। আমার এ লেখার সহযোগী মানোয়ার হোসেনকে লাগিয়ে দিয়েছিলাম দাদার বইয়ের শ্রুতলিখনের কাজে। দাদা বলে যেতেন। ও লিখে নিত। এভাবে বেশ কিছুদূর এগিয়েছিল। আমার লেখার উপাদানও তার মাঝ থেকে পাচ্ছিলাম। বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব বাংলার (পরে পূর্ব পাকিস্তান) কমিউনিস্ট আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, সেই সময়ের যুবমানস, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল সম্পর্কে অনেক অজানা কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম তাঁর নিজের জীবনকথার মধ্যে।
আর ভাষা আন্দোলন তো আমাদের উঠতি বয়সের মানস নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। মাতৃভাষা বাংলা, বাঙালি সংস্কৃতি, সাহিত্য, শিক্ষা-এসবই ছিল আমাদের বেড়ে ওঠার সময়ের অনুসন্ধিৎসা আর অনুসরণের বিষয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্তের জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনই ছিল কেন্দ্রবিন্দুতে। আবার একই সঙ্গে পাকিস্তানি তাহজিব-তমুদ্দন শেখানো, এমনকি ভাষার পরিবর্তন ঘটানো স্কুলজীবনের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। যেমন, ‘বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল-/ পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান॥’ গানটিতে ‘হে ভগবান’-এর জায়গায় ‘হে রহমান’ করে আমাদের শেখানো হতো। সেভাবে আবৃত্তি করতে বলা হতো। এই প্রেক্ষাপটেই আমার শৈশবের দিনগুলো অতিবাহিত হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, পাকিস্তানের স্বাধীনতার সেই সূচনালগ্নে, যতই আমাদের ওপর মুসলমানিত্ব, পাকিস্তানি তাহজিব-তমুদ্দন চাপিয়ে দেওয়া হোক, বাড়ি, স্কুল, কর্মক্ষেত্রে প্রতিদিনকার জীবনযাত্রায় বাঙালি সংস্কৃতি (ওদের ভাষায় হিন্দু সংস্কৃতি) এ দেশের মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল। যেমন আমার আব্বা ছিলেন একজন পরহেজগার মুসলিম। আরবিতে অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্ট ক্লাস। নামাজ, অজিফা পড়ে দিন শুরু করতেন। কিন্তু তাঁর পরিবারেও বাঙালিয়ানার সুস্পষ্ট ছাপ ছিল, সুস্পষ্ট অনুসরণ ছিল। সে কথা পরে বিস্তারিত বলা যাবে। এখানে এককথায় বলি, আমার শৈশবের দিনগুলো অতিবাহিত হচ্ছিল বাংলা, বাঙালি আর পাকিস্তানি ভাষা বিশেষ করে উর্দু, পাকিস্তানি তাহজিব-তমুদ্দনের সংঘাতের মধ্য দিয়ে। একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল এই সংঘাত-সংঘর্ষের সর্বোচ্চ প্রকাশ। একুশের প্রভাবের কথাও যথাসময়ে বলব।
আমার জন্ম ১৮ মে ১৯৪৩। তখন ব্রিটিশ শাসন ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়েছে। যুদ্ধে ভারতের জনগণকে সম্পৃক্ত করতে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে ব্রিটিশরা কীভাবে যাবে, কবে যাবে, তা স্থির করা হয়নি। ইতোমধ্যে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে পাকিস্তান-ভারত এই ভিত্তিতে ভারতভাগের কথা সামনে এসেছে। ১৯৪০ সালে লাহোরে মুসলিম লীগের সম্মেলনে ভারতে মুসলমানদের নতুন আবাসভূমি হিসেবে ‘পাকিস্তান’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব গৃহীত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভারত বিশেষ করে বাংলার জনগণের জীবনে যেমন নিয়ে এসেছিল এক নতুন দুর্দশা, তেমনি সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারতের বিভক্তি, বিশেষ করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দাবি দেশের রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধি করেছিল। এই সময় কমিউনিস্টদের ভূমিকা ছিল কার্যত মধ্যস্থতার। একদিকে দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ত্রাণ বিতরণকাজকে প্রাধান্য দিয়ে জনগণকে সংগঠিত করার চেষ্টা করা, অন্যদিকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমনে তৎকালীন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
এসবই আমার শিশুকালের কথা। তেতাল্লিশে জন্ম নেওয়ার চার বছরের মাথায় ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। শিশু অবস্থায় এসব আমার বোধগম্যতার বাইরে ছিল। আর তখনকার রাজনীতি ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক। সেখান থেকে বহুদূরে পূর্ব বাংলার মফস্বল শহর ফরিদপুরে সে রাজনীতি খুব একটা নাড়া দিত না। তবে ক’বছরের মাথায় যখন আমার বয়স ছয়, আব্বা-আম্মার সঙ্গে ঢাকায় এসে সাম্প্রদায়িক রায়টের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আব্বা সম্ভবত চাকরির বদলির কারণে ঢাকায় চাচার বাসায় আমাদের কিছুদিনের জন্য রাখতে এসেছিলেন। ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশনে নেমে ঘোড়ার গাড়ি করে যখন চাচার বাসা লক্ষ্মীবাজারে পৌঁছালাম, ততক্ষণে দাঙ্গা শুরু হয়েছে। পাশের কয়েকটি বাসা থেকে হিন্দু পরিবারের নারীরা চাচার বাসায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন। দাঙ্গা বা রায়ট কী, কেন হয় তা বোঝার সময় তখনো হয়নি। বিশেষ করে সুদূর মফস্বল শহরে জন্ম নেওয়া, বেড়ে ওঠা একজন বালকের পক্ষে এসবের তাৎপর্য বুঝে ওঠা খুব একটা সম্ভব ছিল না।
চলবে,,,
#
রাশেদ খান মেনন।
সভাপতি
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি।
#
কমরেড মেননের আত্মজীবনী ‘এক জীবন: স্বাধীনতার সূর্যোদয়’
আত্মজীবনী লিখেছেন প্রবীণ রাজনীতিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি কমরেড রাশেদ খান মেনন; যেটির প্রথম পর্ব বাজারে এসেছিলো ২০২১ সালের জুন মাসে।
‘এক জীবন: স্বাধীনতার সূর্যোদয়’ শিরোনামের বইটি প্রকাশ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘর। এর আগে এ প্রকাশনী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন তিনি।
বইটি প্রকাশ করে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বাতিঘর—
এই বিষয়ে চুক্তিতে সই করেন রাশেদ খান মেনন ও বাতিঘরের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাফর আহমদ রাশেদ।
নিজের আত্মজীবনী সম্পর্কে কমরেড মেনন বলেন, বইয়ের প্রথম পর্বে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত ঘটনা লেখা রয়েছে জানিয়ে বাম রাজনৈতিক দলের এই নেতা বলেন, “বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলেন ১০ জানুয়ারি। ১১ জানুয়ারি তার সঙ্গে আমার দেখা হয়। এ পর্যন্ত প্রথম পর্ব।
“এর পরে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দ্বিতীয় পর্ব এবং তার পরবর্তী সময় তৃতীয় পর্বে লেখা থাকবে।”
এক প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, “বহুবার আমি আত্মজীবনী লেখার কাজে হাত দিয়েছি। সেটা শেষ করতে পারিনি। করোনাভাইরাসের কারণে বাইরের কাজে কম বের হওয়ায় বইয়ের কাজটা করতে পেরেছি।”
বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল।

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি