জাতীয় পতাকার প্রথম রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশ স্মরণে

প্রকাশিত: ১২:১০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২৬

জাতীয় পতাকার প্রথম রূপকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশ স্মরণে

Manual4 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৬ : স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত জাতীয় পতাকার প্রথম রূপকার, বীর মুক্তিযোদ্ধা শিব নারায়ণ দাশের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আজ।

২০২৪ সালের ১৯ এপ্রিল তিনি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে জাতি হারিয়েছে এক মহান দেশপ্রেমিক, যিনি স্বাধীনতার স্বপ্নকে প্রথমবার দৃশ্যমান করেছিলেন পতাকার রূপে।

শিব নারায়ণ দাশ, সবার কাছে প্রিয় ‘শিবু’দা’, ১৯৭০ সালের ৬ জুন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) একটি কক্ষে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকার নকশা সম্পন্ন করেন। এই পতাকাই পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় প্রথমবারের মতো উত্তোলিত হয় এবং স্বাধীনতার আন্দোলনে এক অনন্য প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

জীবনের শেষ সময় ও দানশীলতা

জীবনের শেষ দিকে তিনি ঢাকার মনিপুরী পাড়ায় বসবাস করছিলেন। অসুস্থ হয়ে প্রথমে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

মৃত্যুর পরও মানবতার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার অটুট ছিল—তিনি নিজের কর্নিয়া দান করেন সন্ধানীতে এবং মরদেহ চিকিৎসা শিক্ষার জন্য দান করা হয়। তাঁর এই মহৎ উদ্যোগ সমাজে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পতাকা সৃষ্টির পেছনের ইতিহাস

১৯৭০ সালের জুন মাসে ঢাকার পল্টন ময়দানে ছাত্রদের সামরিক কুচকাওয়াজ উপলক্ষে একটি পতাকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক বৈঠকে সবুজ জমিনের ওপর লাল বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত পতাকার ধারণা চূড়ান্ত হয়।

কামরুল আলম খান (খসরু) সবুজ কাপড় ও লাল বৃত্ত প্রস্তুত করেন, আর শিব নারায়ণ দাশ নিপুণ হাতে সেই লাল বৃত্তের মাঝে আঁকেন বাংলার মানচিত্র। এই পতাকাই ‘জয়বাংলা বাহিনী’ বা ‘ফেব্রুয়ারি ১৫ বাহিনী’র প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং পরে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকার স্বীকৃতি পায়।

Manual3 Ad Code

১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে এই পতাকা উত্তোলন করা হয়, যা ছিল স্বাধীনতার প্রত্যয়ের এক সাহসী ঘোষণা।

স্বাধীনতার পর পতাকার রূপান্তর

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে সরকার পতাকার নকশায় কিছু পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। পটূয়া কামরুল হাসান পতাকার মানচিত্র বাদ দিয়ে বর্তমান রূপটি চূড়ান্ত করেন। তবে মূল ধারণা ও চেতনার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শিব নারায়ণ দাশই।

সংগ্রামী জীবন

১৯৪৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন শিব নারায়ণ দাশ। তাঁর পিতা সতীশ চন্দ্র দাশ ছিলেন একজন আয়ুর্বেদ চিকিৎসক, যাকে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী হত্যা করে। শিব নারায়ণ দাশ ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলনে অংশ নিয়ে কারাবরণ করেন। ভাষা আন্দোলনের অগ্রনায়ক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের হাত ধরে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়।

শ্রদ্ধা ও স্মরণ

শিব নারায়ণ দাশের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছে। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন,
“শিব নারায়ণ দাশ শুধু একটি পতাকা আঁকেননি, তিনি এ দেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে দৃশ্যমান রূপ দিয়েছেন।”

Manual2 Ad Code

জাতির কাছে তাঁর গুরুত্ব

শিব নারায়ণ দাশের অবদান কেবল একটি নকশায় সীমাবদ্ধ নয়; তিনি স্বাধীনতার ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম। তাঁর আঁকা পতাকা বাঙালির আত্মপরিচয়, সংগ্রাম ও মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে।

আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে এই নিরহংকার দেশপ্রেমিককে—যার তুলির আঁচড়ে জন্ম নিয়েছিল একটি জাতির স্বপ্নের প্রতীক, লাল-সবুজের পতাকা।

“জাতীয় পতাকার রূপকার শিবু’দা”

রক্তমাখা ভোরের আগে, ইতিহাসের আঁধার রাতে
জেগে ওঠে এক তরুণের দীপ্ত চোখের নীরব ডাকে,
কোনো রাষ্ট্র নয় তখনও, কোনো মানচিত্র নয় আঁকা—
তবু বুকের ভেতর জ্বলে স্বাধীনতার অগ্নিশিখা।

ঢাকা শহর, হলের ঘরে, নিভু নিভু আলো জ্বলে,
ইকবাল হল—সেই কক্ষে ভবিষ্যতের রূপরেখা চলে।
টেবিল জুড়ে কাগজ, কলম, স্বপ্নগুলো ছড়িয়ে আছে,
একটি পতাকা জন্ম নেবে—এই বিশ্বাস বুকের মাঝে।

সবুজ যেন শ্যামল মাটি, ধানের গন্ধ, নদীর ঢেউ,
লাল যেন রক্তজবা, শহীদেরই চির অগ্নিলেউ,
তারই মাঝে সোনার রেখায় আঁকা বাংলার মানচিত্র—
এই তো হবে জাতির মুখ, এই তো হবে স্বাধীন চরিত্র।

শিবু’দা তখন নীরব শিল্পী, ইতিহাসের অগ্রদূত,
তারই হাতে জন্ম নিলো এক পতাকার প্রথম সূত্র।
রাতের ভেতর আঁকা হলো দেশের রূপ, জনতার প্রাণ,
একটি জাতির আত্মপরিচয় পেলো নতুন মহিমান।

পল্টন ময়দান ডাকে তখন, কুচকাওয়াজে উত্তাল ঢেউ,
বঙ্গবন্ধুর চোখে পড়ে সেই পতাকার দীপ্তি লেউ,
হাজার কণ্ঠে ধ্বনি উঠে—”জয় বাংলা”র অগ্নি গান,
পতাকা যেন একাত্ম হলো মানুষেরই রক্ত-প্রাণ।

তারপর এল মার্চের দিন—বটতলায় সেই উত্তাল ক্ষণ,
যেখানে এক পতাকার তলে জেগে ওঠে সমগ্র জন,
দমে না আর দুঃশাসনের শৃঙ্খল, ভয়, অন্ধকার—
পতাকাটি তখন হয়ে ওঠে বিদ্রোহী এক অগ্নিধার।

Manual8 Ad Code

তেইশে মার্চ—অন্যরকম দিনটি তখন পূর্ব বাংলায়,
পাকিস্তানের পতাকা নামে, নতুন পতাকা উঠে যায়,
প্রতিটি ঘরে, পথে-প্রান্তে, জনতারই হাতে হাতে—
শিবু’দার সেই স্বপ্ন তখন বাস্তব রূপ পায় প্রাতে।

যুদ্ধ এলো—রক্ত এলো, আগুন জ্বলে গ্রাম থেকে গ্রাম,
মুক্তিযোদ্ধা শিবু’দা তখন লড়েন বুকের সমস্ত দাম,
পতাকা শুধু কাপড় নয়—এ এক শপথ, এ এক প্রাণ,
দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত প্রতিটি মানবসন্তান।

স্বাধীনতা এলো শেষে, রক্তের ঋণ শোধ হলো না,
তবু একটি পতাকা তখন বিশ্বমাঝে মাথা তোলে নাড়া,
মানচিত্রটি সরল পরে—রূপ বদলায় নতুন করে,
তবু তারই শেকড় গাঁথা সেই রাতের আঁকা স্বপ্নঘরে।

কামরুল হাসানের তুলিতে পেলো পতাকা নতুন ভাষা,
তবু প্রথম সেই রেখাচিত্র ইতিহাসে অমর আশা,
কারণ তারই ভিতর লুকায় একটি জাতির জন্মকথা—
শিবু’দার সেই নিঃশব্দে গড়া মহাকাব্যের প্রথম ব্যাখ্যা।

জন্ম তার কুমিল্লার মাটি, শিকড় তার বাংলার প্রাণ,
পিতার রক্ত শহীদের মতো জুড়ে আছে ইতিহাসে টান,
রাজনীতিতে পথচলা তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়,
ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা সংগ্রাম—সবখানেই তিনি রয়।

Manual1 Ad Code

শেষ জীবনে নীরব মানুষ, তবু ভেতর আগুন জ্বলে,
দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা অটুট ছিল অন্তরজ্বলে,
চোখের কর্নিয়া দান করে গেলেন মৃত্যুর পরেও—
আলো দিয়ে গেলেন তিনি অন্ধকারের পথিকদের ঢেউ।

আজকে যখন পতাকা ওড়ে নীল আকাশের বুকের মাঝে,
লাল-সবুজে দোলে যখন স্বাধীনতার চিরসাজে,
মনে পড়ে সেই মানুষটি—নামটি যার ইতিহাস জুড়ে,
শিব নারায়ণ দাশ—যিনি বেঁচে আছেন পতাকারই রূপ ধরে।

দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই আজ,
যে পতাকায় গাঁথা রয়েছে এক জাতির সকল লাজ,
যে পতাকায় লেখা আছে রক্ত, বেদনা, ভালোবাসা—
সেই পতাকার প্রথম শিল্পী—শিবু’দা, তুমি অনন্ত ভাষা।

তুমি আছো প্রতিটি ভোরে, পতাকা ওঠার সেই ক্ষণে,
তুমি আছো প্রতিটি প্রাণে, মুক্ত বাতাসের স্পন্দনে,
তুমি আছো ইতিহাসজুড়ে, ভবিষ্যতের প্রতিটি পথে—
বাংলাদেশের হৃদয়জুড়ে, অমর হয়ে রইলে তুমি রক্তে।
—(জাতীয় পতাকার রূপকার শিবু’দা,—সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ