সিলেট ২৬শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৩ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ১:১২ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৬, ২০২৬
বই বিষয়ক প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৬ এপ্রিল ২০২৬ : বই মানুষের জ্ঞানের প্রধান ভান্ডার—এ কথা নতুন নয়, কিন্তু এর গুরুত্ব আজও অনস্বীকার্য। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ তার চিন্তা, অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান সংরক্ষণ করেছে বইয়ের মাধ্যমে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেলেও বইয়ের বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি। কারণ বই শুধু তথ্য দেয় না, চিন্তার গভীরতা, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং মানবিক বোধ গড়ে তোলে।
বইয়ের মাধ্যমে পৃথিবীর প্রায় সব ধরনের জ্ঞান অর্জন করা সম্ভব। বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, সাহিত্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই বই মানুষের চিন্তার জগতকে প্রসারিত করে। একটি ভালো বই পাঠককে শুধু তথ্য দেয় না, বরং তাকে চিন্তা করতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায় এবং নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সহায়তা করে। এভাবেই বই একজন মানুষকে আলোকিত ও সচেতন নাগরিকে পরিণত করে।
একটি জাতির উন্নয়নে শিক্ষিত ও সচেতন মানুষের ভূমিকা অপরিসীম। আর সেই সচেতনতা তৈরির অন্যতম মাধ্যম হলো বই। সুন্দর চেতনার মানুষই পারে একটি সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। তাই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির জন্য নয়, বরং জাতীয় উন্নয়নের জন্যও জরুরি।
তবে বাস্তবতা হলো, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ কিছুটা কমে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ অনেককে বই থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বইকে নতুনভাবে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়া সময়ের দাবি।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে Rareboi.org-এর মতো উদ্যোগগুলো অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এই প্ল্যাটফর্মটি এমন একটি উদ্যোগ, যেখানে বইপ্রেমীরা বিনামূল্যে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ার সুযোগ পাচ্ছেন। বিশেষ করে এমন সব দুর্লভ বই, যা সাধারণত সহজে কোথাও পাওয়া যায় না—সেগুলো এখানে সংরক্ষণ ও পাঠের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে পাঠকরা ঘরে বসেই জ্ঞানের বিশাল ভান্ডারে প্রবেশ করতে পারছেন।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বই পড়ার এই উদ্যোগ পাঠাভ্যাসকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। শুধু একটি রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে পাঠকরা তাদের পছন্দের বই পড়তে পারছেন, যা জ্ঞান অর্জনকে আরও সহজ ও সুলভ করে তুলেছে।
পরিশেষে বলা যায়, বই আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে বইয়ের ভূমিকা অপরিসীম। তাই বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং বইকে সহজলভ্য করার উদ্যোগকে উৎসাহিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
বই মানে শুধু কাগজে লেখা কিছু শব্দ নয়,
বই মানে অন্ধকার ভেদ করা আলোর পরিচয়।
বই মানে ইতিহাস, বই মানে সময়ের স্রোত,
মানুষের অন্তরজগৎ খুঁজে পাওয়ার এক নৌকো।
বই মানে মাটির গন্ধ, প্রাচীন কালের ছাপ,
কাদামাটির ফলকে লেখা প্রথম স্বপ্নের চাপ।
প্যাপিরাসের বুকে জেগে ওঠা সভ্যতার গান,
চামড়ার পাতায় লেখা মানুষের প্রথম জ্ঞান।
ডান থেকে বাঁয়ে লেখা, কিংবা বাঁ থেকে ডান,
অক্ষরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনবোধের টান।
কেউ লিখেছে নিচ থেকে ওপরে ওঠার গল্প,
কেউ লিখেছে আকাশ ছোঁয়ার গভীর নীরব কলরোল।
গুটেনবার্গের ছাপে বই পেল নতুন রূপ,
মুদ্রণের শব্দে বদলালো পৃথিবীর প্রতিরূপ।
শত শত বছরের পথ পেরিয়ে আজকের এই দিন,
বই হয়ে উঠেছে মানুষের চেতনার মূলধন।
কিন্তু বই কি শুধুই লেখক, পাঠক আর মলাট?
বইয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে শ্রমিকের ঘাম-রক্ত।
সূত্রাপুরের গলি ধরে, শ্যামবাজারের পথ,
ফরাশগঞ্জের আঁধার ঘরে জন্ম নেয় অগণিত গ্রন্থ।
বদ্ধ ঘরের ভেতর আলোহীন স্যাঁতসেঁতে দিন,
কাগজের গন্ধে ভরা শ্রমিকের ক্লান্ত জীবনচিন।
সুঁই-সুতো হাতে তারা গড়ে তোলে পৃষ্ঠা,
ভুল যেন না হয় কোথাও—এই তাদের দৃঢ় দৃষ্টি।
ভাঁজ করা কাগজে তারা সাজায় স্বপ্নের রেখা,
একটি বইয়ের জন্য কত হাতের অদেখা দেখা।
মলাটের আড়ালে থাকে কত নির্ঘুম রাত,
পাঠকের হাসির পেছনে তাদের নীরব প্রভাত।
শিশুদের হাতেও সুঁই, বই নয়, কাজের ভার,
স্কুলের পথে না গিয়ে তারা বাঁধে অক্ষরের ধার।
দুই হাজার টাকার বিনিময়ে হারায় শৈশবকাল,
কোথাও নেই উৎসব, নেই ছুটির অবকাশকাল।
শ্রমের বিনিময়ে মেলে সামান্য কিছু রুটি,
তবু সেই বই নিয়েই শহরে চলে জ্ঞানের যাত্রাপথটি।
আমরা বই হাতে নিয়ে বলি—জ্ঞানই শক্তি,
কিন্তু সেই শক্তির পেছনে কারা—থাকে না তার উক্তি।
বই আমাদের শেখায় মানুষ হতে, ভাবতে,
সহানুভূতির আলো নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়াতে।
একটি উপন্যাস শেষ করে যে মানুষ ফিরে আসে,
সে আর আগের মানুষ থাকে না কোনো ভাবেই ভাসে।
মস্তিষ্কের ভেতরে জ্বলে নতুন সংযোগের দীপ,
নিউরনের জালে গড়ে ওঠে চিন্তার অনুপম রূপ।
শব্দভাণ্ডার বাড়ে, ভাষা পায় নতুন ডানা,
বই পড়া মানুষ তাই নিজেকেই খুঁজে পায় আবার না।
কল্পকাহিনি শেখায় অন্যের চোখে দেখা,
অচেনা জীবনের গল্পে নিজেকে খুঁজে পাওয়া শেখা।
সহানুভূতির নদী বইয়ে দেয় অন্তরে ধারা,
মানুষকে মানুষ করে এই বইয়েরই কারা।
শিশুর হাতে বই দিলে বদলে যায় ভবিষ্যৎ,
মায়ের কণ্ঠে গল্প শুনে গড়ে ওঠে নতুন অস্তিত্ব।
বইয়ের পাতায় লুকিয়ে থাকে সম্পর্কের উষ্ণতা,
শব্দের ভেতর জন্ম নেয় ভালোবাসার ব্যাকরণটা।
বয়স বাড়লেও বই থাকে জীবনের সাথী,
নিঃসঙ্গতার রাতে সে একমাত্র নির্ভরশীল বাতি।
অলঝেইমারের অন্ধকারে সে আলো জ্বালায়,
মনকে ব্যস্ত রেখে নতুন জীবন উপহার দেয়।
কিন্তু বইয়ের জগতেও আছে এক অদ্ভুত টান,
কেউ পড়ে বই, কেউ শুধু কিনে রাখে অবিরাম।
সুন্ডোকুর স্তূপে জমে থাকে অপ্রকাশিত স্বপ্ন,
আর পাঠহীন জীবনে শুকিয়ে যায় জ্ঞানের বর্ণমালা সম্পূর্ণ।
তবু কোথাও কেউ পুরোনো বইয়ের গন্ধে মাতে,
বিবলিওস্মিয়ার নেশায় হারায় পাতারই প্রান্তে।
সেই গন্ধে থাকে সময়ের জমাট স্মৃতি,
হাজার বছরের ইতিহাস যেন নিঃশব্দে বাঁচে তাতে।
বই বদলেছে সমাজ, বই বদলেছে ধারা,
মার্ক্স, অরওয়েল, হকিং—চিন্তার নতুন সাড়া।
কখনো বিপ্লব, কখনো বিজ্ঞান, কখনো মানবতা,
সবকিছুরই কেন্দ্রে থাকে বইয়ের গভীর ব্যঞ্জনা।
ডিজিটালের যুগে বই কি হারাবে তার স্থান?
স্ক্রিনের আলো কি ছাপিয়ে যাবে কাগজের সম্মান?
তবু মানুষ এখনো হাতে তুলে নেয় ছাপা পৃষ্ঠা,
কারণ বইয়ের স্পর্শেই জাগে আত্মার দৃষ্টি।
একটি গাছের মৃত্যুতে জন্ম নেয় পঞ্চাশ বই,
এই হিসাবের ভেতরেও প্রশ্ন জেগে রয়।
জ্ঞান আর প্রকৃতির মাঝে কেমন এই সমীকরণ?
মানুষ কি খুঁজে পাবে এর সঠিক সমাধান?
বিশ্ব বই দিবসে তাই শুধু উৎসব নয়,
প্রশ্নও তুলি—কারা গড়ে এই জ্ঞানের পরিচয়?
লেখক, পাঠক, প্রকাশক—সবাই এক সূত্রে বাঁধা,
তবু শ্রমিকের গল্প কেন থাকে অজানা, অবাধা?
আলোকিত মানুষ গড়ার যে স্বপ্ন বহমান,
তার ভিতে আছে বই, আছে জ্ঞানের সম্মান।
কিন্তু সেই আলোর পথে যেন না থাকে অন্ধকার,
শ্রমিকের জীবনও পাক ন্যায্যতার অধিকার।
বই পড়ি, বই বুঝি, বইয়ের ভেতর ডুবি,
শুধু জ্ঞান নয়, মানবতার বীজটিও রোপি।
কারণ বইয়ের শেষ কথা শুধু তথ্য নয়,
মানুষ হয়ে ওঠার এক অনন্ত পরিচয়।
—(বই, —সৈয়দ আমিরুজ্জামান)

সম্পাদক : সৈয়দ আমিরুজ্জামান
ইমেইল : rpnewsbd@gmail.com
মোবাইল +8801716599589
৩১/এফ, তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০।
© RP News 24.com 2013-2020
Design and developed by ওয়েব নেষ্ট বিডি