মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়

প্রকাশিত: ২:৩০ পূর্বাহ্ণ, মে ২৪, ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দৈনিক জনকণ্ঠের সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়

Manual8 Ad Code

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা, ২৪ মে ২০২৬ : দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র দৈনিক জনকণ্ঠে ‘মব কালচার’ ও দখলদারিত্বমূলক পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে চলমান প্রশাসনিক অস্থিরতা, সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিরোধ, অনিয়ম, আর্থিক ক্ষতি এবং কর্মপরিবেশের অবনতির প্রেক্ষাপটে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ একটি বিস্তৃত পুনর্গঠন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।

রবিবার (২৪ মে ২০২৬) প্রকাশিত এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামো নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণমানুষের পক্ষে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অঙ্গীকার নিয়ে দৈনিক জনকণ্ঠ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের সংবাদমাধ্যম অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নানা প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেও প্রতিষ্ঠানটি তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সংবাদপত্রটি বহুমাত্রিক সংকটের মুখে পড়ে।

‘মব কালচার’ ও দখলদারিত্বমূলক পরিস্থিতির অভিযোগ

Manual1 Ad Code

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর দেশে যে অস্থির ও দখলদারিত্বমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে দৈনিক জনকণ্ঠের ওপর। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, এ সময় সংবাদপত্রটির ওপর বিভিন্ন ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ, ভাঙচুর, হামলা, সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ দখলের চেষ্টা এবং জোরপূর্বক মালিকানা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

একই সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, অননুমোদিতভাবে প্রশাসনিক ও সম্পাদকীয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং প্রয়োজনীয় পেশাগত যোগ্যতা ছাড়াই বিভিন্ন ব্যক্তিকে সাংবাদিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম, পেশাগত পরিবেশ এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগ

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, শৃঙ্খলাভঙ্গ, দায়িত্বে অবহেলা, অনুমোদনবিহীন কার্যক্রম এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা লঙ্ঘনের মতো একাধিক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়। একই সঙ্গে কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে অফিসে অনিয়মিত উপস্থিতি, পূর্ব অনুমতি ছাড়াই কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে বাধা প্রদান, প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও সুনামগত ক্ষতি করার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, দীর্ঘ সময় ধরে এসব কার্যক্রম চলতে থাকায় প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানকে উল্লেখযোগ্য আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তরণে একাধিকবার আলোচনার উদ্যোগ গ্রহণ, প্রশাসনিক পুনর্গঠন এবং বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের চেষ্টা চালানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়নি বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।

পুনর্গঠন কার্যক্রম ও কর্মচারীদের অব্যাহতি

এই প্রেক্ষাপটে জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ একটি পূর্ণাঙ্গ পুনর্বিন্যাস বা পুনর্গঠন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে বলে জানানো হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার কাঠামোর আওতায় আনতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এর অংশ হিসেবে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন, বোনাস এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পরিশোধের কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে। পাশাপাশি নির্দিষ্টসংখ্যক কর্মচারীকে ‘টার্মিনেশন বেনিফিট’ প্রদান সাপেক্ষে প্রতিষ্ঠান থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের পর্যায়ক্রমে আনুষ্ঠানিক অব্যাহতি পত্র প্রদান করা হবে এবং প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী তাদের বৈধ পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হবে বলে জানানো হয়।

এছাড়া যেসব কর্মচারীর বিরুদ্ধে অনিয়মিত উপস্থিতি, বিনা নোটিশে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক অভিযোগ রয়েছে, তাদের কাছে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

Manual7 Ad Code

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব বিষয়ে যথাযথ তদন্ত, নথিপত্র পর্যালোচনা এবং আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তদন্ত ও আলোচনার প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়।

‘অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয়’ হিসেবে উল্লেখ

Manual4 Ad Code

বিবৃতিতে জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, পুনর্গঠন কার্যক্রমটি সম্পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক, সাংগঠনিক ও আর্থিক বাস্তবতার আলোকে পরিচালিত হচ্ছে। সংবাদপত্রটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ এবং পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করার স্বার্থেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, ভবিষ্যতেও দৈনিক জনকণ্ঠ দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, সত্যনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন এবং জাতীয় স্বার্থে কাজ করার অঙ্গীকার অব্যাহত রাখবে।

গণমাধ্যম অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু

Manual4 Ad Code

দৈনিক জনকণ্ঠে চলমান এই পুনর্গঠন কার্যক্রম ইতোমধ্যে দেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রশাসনিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ঘটনা ঘটলেও জনকণ্ঠের মতো দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত একটি সংবাদপত্রে এমন পুনর্বিন্যাস তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট মহলের ধারণা, পুনর্গঠন কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা জনকণ্ঠের ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে সম্পাদকীয় স্বাধীনতা, পেশাদার কর্মপরিবেশ এবং সংবাদপত্রটির ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

অন্যদিকে, অব্যাহতি, শোকজ এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে ও সাংবাদিক মহলে নানা প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলেও জানা গেছে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত মন্তব্য করতে সংশ্লিষ্ট অনেকেই অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সাংবাদিকতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রত্যয়

দৈনিক জনকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ তাদের বিবৃতিতে পুনরায় উল্লেখ করেছে যে, সংবাদপত্রটি দেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ, অসাম্প্রদায়িকতা এবং গণমানুষের পক্ষে সাংবাদিকতার যে অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে ধারণ করে এসেছে, ভবিষ্যতেও সেই অবস্থান বজায় থাকবে।

কর্তৃপক্ষের দাবি, চলমান পুনর্গঠন কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি আরও কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও পেশাদার সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান হিসেবে জনকণ্ঠকে নতুনভাবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ